হাসান ট্রেডিংয়ের ৫৫ কোটি টাকার ভ্যাট ফাঁকি

রহমত রহমান: রাজধানীর বিসিসি রোডের হাসান ট্রেডিং কোম্পানির নামে প্রায় ৫৫ কোটি টাকার বেশি ভ্যাট ফাঁকির সন্ধান পেয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। প্যাকেজ ভ্যাটের আড়ালে এ ভ্যাট ফাঁকি দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। এনবিআরের আওতাধীন মূসক নিরীক্ষা গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতর এ ফাঁকি উদ্ঘাটন করে সম্প্রতি প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে ভ্যাট ফাঁকির মামলা করে।
জানা যায়, ঢাকা পূর্ব কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটে ভ্যাট নিবন্ধনধারী প্রতিষ্ঠান হাসান ট্রেডিং কোম্পানি। সম্প্রতি প্রতিষ্ঠানটিকে প্রাথমিক দাবিনামা জারি ও কারণ দর্শানোর নোটিস দিয়েছে ঢাকা পূর্ব ভ্যাট কমিশনারেট।
সূত্র জানায়, হাসান ট্রেডিং কোম্পানি টু ও থ্রি হুইলার, বিয়ারিং, স্পেয়ার পার্টস আমদানিকারক এবং সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটি দুবাই, সিঙ্গাপুর, ভারত, জাপান, ইতালি, চীন থেকে এসব আমদানি করে। ঢাকা, চট্টগ্রাম, বগুড়া, সিলেট, নোয়াখালী, কুমিল্লা, চাঁদপুর, রংপুর, কক্সবাজার, লক্ষ্মীপুর, ফেনীসহ সারা দেশে প্রতিষ্ঠানটির প্রায় দুই শতাধিক আউটলেট রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির আউটলেট থাকলে আলাদা ভ্যাট নিবন্ধন নেই। পণ্য বিক্রির বিপরীতে সঠিকভাবে মূসক চালান না দেওয়া ও বিক্রির তথ্য গোপনের মাধ্যমে রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ পায় এনবিআর।
তদন্তকারী দফতর সূত্রে জানা যায়, এছাড়া প্রতিষ্ঠানটি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ন্যায় প্যাকেজ ভ্যাট দিয়ে আসছে। কিন্তু বার্ষিক টার্নওভার অনুযায়ী প্যাকেজ ভ্যাটের সুবিধা পাওয়ার কথা নয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে এনবিআরের নির্দেশে মূসক নিরীক্ষা গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতর বিসিসি রোডে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান কার্যালয় ও ওয়ারী এলাকায় গুদামে অভিযান চালায়। কিন্তু গুদামে কর্মকর্তাদের ঢুকতে দেওয়া হয়নি। প্রধান কার্যালয়ে অভিযান চালানো হলেও প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে। পরে অভিযান চালিয়ে কিছু কাগজপত্র জব্দ করা হয়। কাগজপত্র পর্যালোচনা করে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটি বিক্রি অনুযায়ী ব্যবসায়ী পর্যায়ে মূসক প্রদান করে না। প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী কর্মকর্তা মো. এ রশিদ জানান, প্রতিষ্ঠানটি প্রতি বছর ব্যবসায়ী পর্যায়ে প্যাকেজ ভ্যাট পরিশোধ করে আসছে। কিন্তু মূসক পরিশোধের কোনো চালান বা প্রমাণ দেখাতে পারেনি।
এ বিষয়ে হাসান ট্রেডিং কোম্পানির ব্যবস্থাপক (ভ্যাট) ফিরোজ হোসেন শেয়ার বিজকে বলেন, সম্পূর্ণ মিথ্যা তথ্যের ভিত্তিতে মামলা হয়েছে। আমরা কাগজপত্র দিয়েছি। মামলাটি এখন বিচারাধীন রয়েছে। প্যাকেজ ভ্যাটের আড়ালে ফাঁকি, আউটলেট বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, বেশি কিছু বলা যাবে না।
প্রতিষ্ঠান হতে জব্দ করা ডেলিভারি চালানের তথ্য পর্যালাচনা করে দেখা যায়, মূসক চালান ব্যবহার না করে ব্যক্তিগত চালানের মাধ্যমে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে পণ্য বিক্রয় করা হয়েছে। ২০১৬ সালের ২৪ মে থেকে ২৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৮১ কোটি ৩৬ লাখ টাকার পণ্য বিক্রয় করা হয়েছে। টালিখাতা, রেজিস্টার হতে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটি ২০১৫ সালের এপ্রিল হতে ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ২৩৩ কোটি ৫৫ লাখ টাকার পণ্য বিক্রি করেছে। কম্পিউটার থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী প্রতিষ্ঠানটি ২০১৬ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১৬৩ কোটি ৮৯ লাখ টাকার পণ্য বিক্রি করেছে। বিক্রি তথ্যের গরমিলে বোঝা যায় প্রতিষ্ঠানটি বিক্রি তথ্য গোপনের মাধ্যমে রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে আসছে।
কম্পিউটার থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী ২০১১ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিক্রি তথ্য বিবেচনা করে ব্যবসায়ী পর্যায়ে মূসক নিরূপণ করা হয়। এতে দেখা যায়, এ সময়ে প্রতিষ্ঠানটি ৮৩৬ কোটি ১৭ লাখ টাকার পণ্য বিক্রি করেছে। ব্যবসায়ী পর্যায়ে চার শতাংশ হারে ২৯ কোটি ৯০ লাখ টাকা মূসক প্রযোজ্য। এর মধ্যে প্রতিষ্ঠানটি প্যাকেজ ভ্যাট হিসেবে ৪৭ লাখ ৮২০ টাকা পরিশোধ করেছে। বাকি প্রায় ২৯ কোটি ৮৯ লাখ টাকা পরিশোধ না করে ফাঁকি দিয়েছে। এ সময়ে প্রতিষ্ঠানটি ভ্যাট পরিশোধ না করায় সুদ দুই শতাংশ অনুযায়ী মোট সুদের পরিমাণ প্রায় ২৫ কোটি ৪০ লাখ। সুদসহ প্রতিষ্ঠানটি ২০১১ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত ছয় বছরে প্রায় ৫৫ কোটি ৩০ লাখ টাকার ভ্যাট ফাঁকি দিয়েছে। বিষয়টি খতিয়ে দেখছে এনবিআর।
এ বিষয়ে ঢাকা পূর্ব কমিশনারেটের একজন কর্মকর্তা শেয়ার বিজকে বলেন, প্রতিষ্ঠানটির বিপুল পরিমাণ লেনদেন। কিন্তু প্যাকেজ ভ্যাট কীভাবে দেয় তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটিকে দাবিনামা জারি করা ও কারণ দর্শানোর নোটিস দেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে কিছু জবাব দিয়েছে। মামলার কিছু তথ্য খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে কিছু আপত্তি করা হয়েছে। আউটলেট থাকলে অবশ্যই ভ্যাট নিবন্ধন নিতে হয়। আউটলেট থেকে কীভাবে ভ্যাট দেয় তা আমরা খতিয়ে দেখছি।