১১০০ কোটি টাকার মূসক ফাঁকি উদ্ঘাটন করেছি

এনবিআরের হিসাবে ৯৩ শতাংশ মূসক নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান রিটার্ন দেয় না। তাই মূসক সচেতনতা বাড়ানো ও ফাঁকিবাজদের ধরতে নানামুখী কার্যক্রম পরিচালনা করছে মূসক নিরীক্ষা গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতর। এসব নিয়ে সম্প্রতি শেয়ার বিজের সঙ্গে
কথা বলেছেন অধিদফতরের মহাপরিচালক এএফএম আবদুল্লাহ খান। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন রহমত রহমান

শেয়ার বিজ: মূসক গোয়েন্দা সফলতার মুখ দেখছে কি না?

আবদুল্লাহ খান: বর্তমানে মূসক নিরীক্ষা গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতর অত্যন্ত সক্রিয়, যদিও জনবলের সংকট রয়েছে। এ স্বল্পসংখ্যক জনবল দিয়েই আমরা কাজ চালিয়ে যাচ্ছি। তবুও চলতি অর্থবছরে বিগত যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি সফলতা এসেছে। কোনো প্রতিষ্ঠানের মূসক ফাঁকির অভিযোগ পেলে যাচাই শেষে নিরীক্ষা করি। মূসক ফাঁকি নিরুৎসাহিত করতে রাতে সড়কে টহল কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। চলতি অর্থবছরে মার্চ পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ৫০০ প্রতিষ্ঠানের নিরীক্ষা ও তদন্ত শেষে প্রায় এক হাজার ১০০ কোটি টাকার মূসক ফাঁকি উদ্ঘাটন করেছি। এর মধ্যে নগদ প্রায় ৫০ কোটি টাকার রাজস্ব আদায় হয়েছে। গত অর্থবছরে মার্চ পর্যন্ত এ দফতর প্রায় ৩০০ প্রতিষ্ঠানের নিরীক্ষা ও তদন্ত করে সাড়ে ৫০০ কোটি টাকার মূসক ফাঁকি উদ্ঘাটন করেছে। এ হিসেবে গত অর্থবছরের চেয়ে এবার দ্বিগুণ মামলা ও মূসক ফাঁকি উদ্ঘাটিত হয়েছে।

শেয়ার বিজ: কোন ধরনের প্রতিষ্ঠানের কাছে বেশি ফাঁকি পেয়েছেন?

আবদুল্লাহ খান: ব্যাংক, বিমা, বড় ম্যানুফ্যাকচারার্স প্রতিষ্ঠান, রাসায়নিক দ্রব্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ও ইলেট্রনিক পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের মূসক ফাঁকি বেশি। ৫০টি ব্যাংক আমরা নিরীক্ষা করব। ইতোমধ্যে ১০টি সম্পন্ন হয়েছে। বিমা কোম্পানি ৭০টির মধ্যে আটটি শেষ হয়েছে, উৎপাদনকারী ১৬০টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১২টি সম্পন্ন হয়েছে। চট্টগ্রামের ১৮টি অফডগের মধ্যে দুটি সম্পন্ন হয়েছে। ঢাকা শহরের অভিজাত কয়েকটি ক্লাবের নিরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে। এসব ক্লাব যে অ্যালকোহল বিক্রি করে তার ওপর উচ্চহারে সম্পূরক শুল্ক ও মূসক রয়েছে। এসব ক্লাব যথাযথভাবে সম্পূরক শুল্ক ও মূসক পরিশোধ করেনি। ইতোমধ্যে চারটি ক্লাবের নিরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে, যা থেকে প্রায় ২১৫ কোটি টাকার মূসক ফাঁকি উদ্ঘাটিত হয়েছে। পাঁচটি সিরামিক কোম্পানির মধ্যে দুটির নিরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে। এছাড়া বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সেবা পর্যায়ের নয়টি প্রতিষ্ঠানকে নিরীক্ষার আওতায় আনা হয়েছে। যেসব প্রতিষ্ঠানের মাসে কোটি কোটি টাকা বিক্রি হয়, কিন্তু প্রতিষ্ঠান প্যাকেজ ভ্যাট বা নামমাত্র ভ্যাট দেয়, এমন ট্রেড ভ্যাটের পর্যায়ের বড় ১৫টি প্রতিষ্ঠানকে নিরীক্ষার আওতায় আনা হয়েছে, যা থেকে প্রায় ৩০ কোটি টাকার ফাঁকি উদ্ঘাটিত হয়েছে।

শেয়ার বিজ: বন্ডেড প্রতিষ্ঠান নিরীক্ষা করেছেন?

আবদুল্লাহ খান: মূসক গোয়েন্দা প্রথমবারের মতো বন্ডেড প্রতিষ্ঠান নিরীক্ষা করেছে। অনেকের ধারণা আমি বন্ডেড প্রতিষ্ঠান রফতানি করি, আমার কেন আবার মূসক হবে? কিন্তু বন্ডেড প্রতিষ্ঠান কিছু কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে, যার ওপর মূসক হয়। বন্ডেড প্রতিষ্ঠানকে কিছু সেবা গ্রহণ করতে হয়। এ সেবার বিলের ওপর উৎসে মূসক রয়েছে। এ উৎসে মূসক প্রতিষ্ঠান পরিশোধ করেনি। এ রকম ৮৫টি বন্ডেড প্রতিষ্ঠানকে আমরা নিরীক্ষার আওতায় এনেছি। এর মধ্যে ২০টি প্রতিষ্ঠানের নিরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে, যাতে প্রায় ৬০ কোটি টাকার বেশি মূসক ফাঁকি উদ্ঘাটিত হয়েছে। মূসক ফাঁকি হওয়ায় ভ্যাট কমিশনারেটে এসব মামলা করা হয়েছে। এসব মূসকের সম্পর্ক উৎপাদনের সঙ্গে রফতানির সঙ্গে এসব মূসকের কোনো সংযোগ নেই। বন্ডেড প্রতিষ্ঠান স্থানীয়ভাবে সেবা গ্রহণ করার সময় উৎসে মূসক কেটে রাখার কথা, কিন্তু কেটে রাখা হয়নি।

শেয়ার বিজ: জনবল সংকটে এ দফতরের কার্যক্রম বিঘ্নিত হচ্ছে কি না?

আবদুল্লাহ খান: আমাদের বর্তমানে যেসব কর্মকর্তা রয়েছেন সবাই সৎ, কর্মঠ ও পরিশ্রমী। তারা অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে কাজ করছেন। আমরা আশা করছি, প্রয়োজনীয় সংখ্যক কর্মকর্তা পেলে ভবিষ্যতে এ দফতর মূসক ফাঁকি দেওয়ার মানসিকতা দূরীভূত করতে সক্ষম হবে। মূসক গোয়েন্দার অধিক্ষেত্র সারা দেশ। এখানে জনবল পেলে মূসক ফাঁকি উদ্ঘাটনে আমরা অনেক বেশি অবদান রাখতে সক্ষম হবো। যারা মনে করছেন ভ্যাট না দিয়ে পার পাওয়া যাবে, আসলে তারা পার পাবেন না। সরকারের যে রাজস্ব আসে সেখানে এ মূসক থেকে বিশাল অংশ জোগান দেওয়া সম্ভব। মূসক গোয়েন্দার প্রতি নজর দিলে ভবিষ্যতে এ দফতর মূসক আহরণের বড় সম্ভাবনাময় খাত হতে পারে। বর্তমানে ৫০টি সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তার পদ রয়েছে, যার মধ্যে ২৩ জন কর্মরত রয়েছে। অরগানোগ্রাম অনুযায়ী এ অধিদফতরে মঞ্জুর করা পদের সংখ্যা রয়েছে ১৩২টি। এক হাজার ৩৬০ জন জনবলের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রথম শ্রেণির পদ ২৩২টি, ৫২০টি দ্বিতীয় শ্রেণি, ৫১৪টি তৃতীয় শ্রেণি ও ৯৪টি চতুর্থ শ্রেণির পদ রয়েছে। ইতোমধ্যে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির ১২টি পদের সরাসরি নিয়োগে অনুমোদন পাওয়া গেছে।

শেয়ার বিজ: ঢাকার বাইরে মূসক গোয়েন্দার কার্যক্রম শুরু করা হবে কি না?

আবদুল্লাহ খান: ঢাকায় অফিস থাকার কারণে প্রতিষ্ঠানগুলোর ফাঁকি যেভাবে উদ্ঘাটন করতে পারছি, ঢাকার বাইরের প্রতিষ্ঠানকে সেভাবে পারছি না। ঢাকার বাইরে অন্তত বিভাগীয় শহরে অফিস স্থাপনে আমরা এনবিআরকে চিঠি দিয়েছি। এনবিআর উদ্যোগ নিচ্ছ ভবিষ্যতে সারা দেশে মূসক গোয়েন্দার অফিস হবে।

শেয়ার বিজ: মূসক ফাঁকি উদ্ঘাটনে এ দফতরের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা রয়েছে কি না?

আবদুল্লাহ খান: আমরা অ্যাসাইকুডার সংযোগ নিয়েছি। ফলে কোন প্রতিষ্ঠান কী পরিমাণ কাঁচামাল আমদানি করছে তার হিসাব পেয়ে যাচ্ছি। আমরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক ও ভাইভারে মূসক ফাঁকির অভিযোগ পাই। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই শেষে ইতোমধ্যে অভিযানে বেশ কিছু সাফল্যও পেয়েছি। আমাদের এমন কর্মকাণ্ড দেখে আত্মবিশ্বাসী হয়ে অনেকেই উৎসাহিত হয়ে তথ্য দিচ্ছে। প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহারের মাধ্যমে আমরা মূসক ফাঁকি উদ্ঘাটনে সক্ষম হবো।