প্রচ্ছদ প্রথম পাতা

১৩ প্রকল্পে লাখ কোটি টাকা ঋণ সহায়তা খুঁজছে রেলওয়ে

ইসমাইল আলী: রেলের উন্নয়নে পৃথক মন্ত্রণালয় গঠিত হয় সাত বছর আগে। এ সময়ে রেলওয়ের উন্নয়নে প্রায় ২৩ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হয়। এরই মধ্যে কয়েকটি প্রকল্প শেষ হয়েছে, আর চলমান রয়েছে ৪৮টি প্রকল্প। এর বাইরে পাইপলাইনে রয়েছে রেলের বেশকিছু মেগাপ্রকল্প। এসব প্রকল্পে প্রচুর বিনিয়োগ দরকার। এজন্য বড় ধরনের ঋণ সহায়তা খুঁজছে রেলওয়ে।
তথ্যমতে, রেলওয়ের পাইপলাইনে থাকা মেগাপ্রকল্পগুলোর মধ্যে ঢাকা-চট্টগ্রাম হাইস্পিড রেলপথ চালু, ভাঙ্গা-বরিশাল-পায়রা রেলপথ নির্মাণ, আখাউড়া-সিলেট ডুয়েলগেজ ডাবল লাইন নির্মাণ, ঢাকা শহরের চারপাশে বৃত্তাকার রেলপথ নির্মাণ ও ঢাকা-টঙ্গী আন্ডারগ্রাউন্ড (মাটির নিচ দিয়ে) রেলপথ নির্মাণ উল্লেখযোগ্য। এ পাঁচটি ছাড়া আরও আট প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে রেলওয়ে। এজন্য প্রায় এক লাখ কোটি টাকা ঋণ সহায়তা খোঁজা হচ্ছে।
রেলওয়ের সম্প্রতি প্রণীত এক তালিকায় এ তথ্য উঠে এসেছে। এতে দেখা যায়, ১৩ প্রকল্প বাস্তবায়নে সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে এক হাজার ৪২৭ কোটি ৮২ লাখ ডলার বা এক লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে সম্ভাব্য বিদেশি সহায়তা দরকার এক হাজার ১৪২ কোটি ২৬ লাখ ডলার, বা ৯৫ হাজার ৯৫০ কোটি টাকা। বাকি অর্থ সরকারি তহবিল থেকে সরবরাহ করতে হবে।
প্রকল্পগুলোতে ঋণ সহায়তার ক্ষেত্রে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে দুটি খাত। তুলনামূলকভাবে ছোট প্রকল্পগুলোতে দাতা সংস্থা বিশেষত জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা), এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংক (এআইআইবি), ইউরোপীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ইআইবি) ও দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনৈতিক উন্নয়ন তহবিলের (ইডিসিএফ) ঋণ খোঁজা হচ্ছে। আর বড় প্রকল্পগুলোয় জিটুজি ভিত্তিতে চীন ও ভারতের ঋণ সহায়তা নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।
সূত্রমতে, প্রস্তাবিত তালিকায় রেলওয়ের সবচেয়ে ব্যয়বহুল প্রকল্প ঢাকা-চট্টগ্রাম হাইস্পিড রেলপথ নির্মাণ। ঢাকা থেকে নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা ও লাকসাম হয়ে চট্টগ্রাম পর্যন্ত প্রায় ২৩০ কিলোমিটার এ রেলপথ নির্মাণে সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৪০০ কোটি ডলার, বা ৩৩ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে বৈদেশিক ঋণ লাগবে ৩২০ কোটি ডলার বা ২৬ হাজার ৮৮০ কোটি টাকা।
তালিকায় দ্বিতীয় ব্যয়বহুল প্রকল্প ভাঙ্গা থেকে বরিশাল হয়ে পায়রা বন্দর পর্যন্ত ডাবল লাইন রেলপথ নির্মাণ। ১৮৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এ রেলপথ নির্মাণে সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৩৭ কোটি ৫০ লাখ ডলার, বা ২৮ হাজার ৩৫০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ২২ হাজার ৬৮০ কোটি টাকা বা ২৭০ কোটি ডলার বিদেশি ঋণ লাগবে।
এদিকে সিলেট-আখাউড়া বিদ্যমান রেলপথের পাশে ২৩৯ কিলোমিটার ডুয়েলগেজ দ্বিতীয় লাইন নির্মাণে ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে প্রায় ১৮০ কোটি ডলার বা ১৫ হাজার ১২০ কোটি টাকা। আর এ প্রকল্পে বিদেশি ঋণ লাগবে ১২ হাজার ৬২ কোটি টাকা।
রাজধানীর যানজট কমাতে শহরের চারদিকে প্রায় ৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ বৃত্তাকার রেলপথ নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে রেলওয়ের। এজন্য সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ১৬৫ কোটি ডলার বা ১৩ হাজার ৮৬০ কোটি টাকা। আর বিদেশি ঋণ সহায়তার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১১ হাজার ৮৮ কোটি টাকা, বা ১৬৫ কোটি ডলার। রেলপথটি ঢাকার বাইরে দিয়ে টঙ্গী থেকে তুরাগ, আদাবর, আমিনবাজার, কেরানীগঞ্জ, তারাব, হাজারীবাগ, লালবাগ, যাত্রাবাড়ী, ডেমরা, ইস্টার্ন বাইপাস রোড, পূর্বাঞ্চল হয়ে আবার টঙ্গীতে সংযুক্ত হবে।
এদিকে শহরের ভেতর যানজট কমাতে ঢাকা থেকে টঙ্গী পর্যন্ত প্রায় ২৩ কিলোমিটার রেলপথ মাটির নিচ দিয়ে নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়েছে রেলওয়ে। এতে সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ১০০ কোটি ডলার বা আট হাজার ৪০০ কোটি টাকা। এ প্রকল্পে বিদেশি ঋণের সম্ভাব্য পরিমাণ ধরা হয়েছে ছয় হাজার ৪০০ কোটি টাকা।
উল্লিখিত মেগাপ্রকল্পগুলোর বাইরে আরও আটটি প্রকল্পের জন্য বৈদেশিক সহায়তা খোঁজা হচ্ছে। এগুলো হলোÑভৈরববাজার-ময়মনসিংহে বিদ্যমান মিটারগেজ রেলপথকে ডুয়েলগেজে রূপান্তর ও ডাবল লাইন নির্মাণ, মুন্সীগঞ্জ থেকে সাতক্ষীরা পর্যন্ত নতুন ব্রডগেজ লাইন নির্মাণ, যশোর-বেনাপোলে বিদ্যমান রেলপথের পাশে দ্বিতীয় লাইন নির্মাণ, নাভারণ-সাতক্ষীরা নতুন ব্রডগেজ লাইন নির্মাণ, দর্শনা থেকে মুজিবনগর পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণ, নারায়ণগঞ্জ থেকে ঢাকা হয়ে জয়দেবপুর পর্যন্ত ইলেকট্রিক ট্র্যাকশন (বৈদ্যুতিক রেলপথ) চালু এবং লালমনিরহাট থেকে কাউনিয়া ও বগুড়া হয়ে সান্তাহার পর্যন্ত ২৪টি স্টেশনে কম্পিউটারাইজড সিগন্যালিং ব্যবস্থা চালু করা।
এ আট প্রকল্পের সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ১৯৩ কোটি ৪৯ লাখ ডলার, বা ১৬ হাজার ২৫৩ কোটি ১৬ লাখ টাকা। প্রকল্পগুলোতে বিদেশি সহায়তার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১৫৪ কোটি ৭৯ লাখ ডলার, বা প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা।
প্রকল্পগুলোর বিষয়ে রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা শেয়ার বিজকে বলেন, ১৩টি প্রকল্পের সম্ভাব্য ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে, তবে এটি চূড়ান্ত নয়। বিদেশি সহায়তা খোঁজার পাশাপাশি প্রকল্পগুলোর সম্ভাব্যতা যাচাই চলছে। সেগুলো চূড়ান্ত হলে ব্যয় সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা পাওয়া যাবে। তবে চূড়ান্ত পর্যায়ে প্রকল্পগুলোর ব্যয় আরও বাড়বে। ঋণ সহায়তা খোঁজার ক্ষেত্রে এ বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা হয়েছে।

সর্বশেষ..