১৬ অক্টোবর: বিশ্ব খাদ্য দিবস

খাদ্যে পুষ্টি আমাদের কাক্সিক্ষত তুষ্টি

বাঁচার জন্য আমরা খাই। এর মধ্যে আছে সস্তা, বাজে ও পুষ্টিসম্মত সুষম খাবার। বেশি ভালো পুষ্টিসম্মত সুষম খাবার। অনেকে মনে করেন, পুষ্টিসম্মত সুষম খাবার খেতে হলে খরচ বেশি পড়বে। কথাটা কিন্তু মোটেই ঠিক নয়। বুদ্ধি, জ্ঞান, দক্ষতা আর অভিজ্ঞতা দিয়ে বিবেচনা ও ভেবেচিন্তে তালিকা করলে কম দামেই প্রয়োজনীয় সুষম পুষ্টিসমৃদ্ধ খাবারের জোগান দেওয়া যায়। খাবারের প্রতি আমাদের যেমন অতি রসনাবিলাস ও আগ্রহ আছে, পুষ্টির প্রতি তেমনটি নেই। সে কারণেই পুষ্টি নিয়ে সমস্যায় পড়তে হয় অহরহ। আমাদের দেশে অপুষ্টিতে যেমন মানুষ ভুগছেন, আবার অতিপুষ্টিতেও ভুগছেন অনেকে। শুধু পুষ্টিজ্ঞানের অভাবেই এমনটি হয়। একটু পরিকল্পনা ও মেধা খাটালে আমরা নিয়মিত পরিমিত পুষ্টিসমৃদ্ধ খাবার খেয়ে ভালোভাবে সুস্থ-সবল হয়ে বেঁচে থাকতে পারি, হাজারো অসুখ-বিসুখ ও রোগবালাই থেকে নিজেদের মুক্ত রাখতে পারি। আসলে দৈহিক, মানসিক আর বুদ্ধিবৃত্তিক সুস্থতার জন্য খাদ্য প্রয়োজন।

বাংলাদেশ খাদ্য উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করলেও শিশু ও মাতৃপুষ্টি নিশ্চিতকরণ এবং ব্যক্তিগত ও পারিবারিক পর্যায়ে বৈচিত্র্যপূর্ণ খাদ্যের সমন্বয়ে পরিপূর্ণ পুষ্টিসমৃদ্ধ খাদ্য গ্রহণ এখনও বিরাট চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে শিশুপুষ্টির জন্য মায়ের দুধ পান ও পরিপূরক খাবার খাওয়ার হার এখনও অপ্রতুল। ব্যক্তির খাবারে খাদ্য উপাদান যথাযথ পরিমাণে না থাকা বা অতিরিক্ত থাকা অপুষ্টি ও দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত হওয়ার প্রধান কারণ। সুষম খাদ্য নির্বাচন ও গ্রহণের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি রোগগুলো সহজেই প্রতিরোধ করা সম্ভব। খাদ্যের সঙ্গে সুস্বাস্থ্যের সম্পর্ককে সঠিকভাবে প্রকাশ করার জন্য গবেষণার প্রয়োজন। বাংলাদেশের জনগোষ্ঠী বর্তমানে দুই রকমের অপুষ্টির শিকার। খাদ্যের অভাবজনিত পুষ্টিহীনতা ও খাদ্যসংক্রান্ত দীর্ঘমেয়াদি অসংক্রামক রোগগুলো। খাদ্যের অভাবজনিত কারণে পুষ্টিহীনতার জন্য মানুষ খর্বাকৃতি, নিম্নওজনবিশিষ্ট ও কৃশকায় হয়।

খাদ্যসংক্রান্ত দীর্ঘমেয়াদি অসংক্রামক

রোগগুলো হলো স্থূলতা, উচ্চরক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, স্ট্রোক, ক্যানসার ও বেশি বয়সে হাড় নরম হয়ে যাওয়া।

খাদ্য গ্রহণের সঙ্গে জড়িত অপুষ্টি ও খাদ্যসংক্রান্ত দীর্ঘমেয়াদি রোগের হার কমানোর লক্ষ্যে বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় নিজস্ব খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে মিল রেখে সব দেশে খাদ্য গ্রহণের জন্য নির্দেশিকা থাকা প্রয়োজন। জাতীয় খাদ্য ও পুষ্টিনীতি এবং বাংলাদেশ জাতীয় পুষ্টি পরিকল্পনা ১৯৯৭-এর অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল খাদ্য গ্রহণ ও নির্দেশিকা প্রকাশ। এজন্য বাংলাদেশ জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা, কৃষি ও পুষ্টিসংক্রান্ত বিনিয়োগ পরিকল্পনায় (২০১১-২০১৫) এবং জাতীয় পুষ্টিনীতি ২০১৫-তে জাতীয় খাদ্য গ্রহণ নির্দেশিকা প্রকাশকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। এছাড়া জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রতিটি জাতিকে নিজস্ব খাদ্য গ্রহণ নির্দেশিকায় বিশেষ কতগুলো তথ্য যুক্ত করার পরামর্শ দেয়। সাম্প্রতিক খাদ্যের অভাবজনিত অপুষ্টির চিত্র, খাদ্যসংক্রান্ত দীর্ঘমেয়াদি রোগের হার, সাম্প্রতিক খাদ্য গ্রহণের ধরনসহ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রকাশিত বিভিন্ন বয়সের খাদ্য উপাদানের চাহিদা ও মৌসুমি খাবার অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে বর্তমান খাদ্য নির্দেশনা করা হয়েছে। গবেষণালব্ধ জ্ঞানের ভিত্তিতে প্রণীত খাদ্য গ্রহণ নির্দেশনা উন্নত পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণে সাহায্য করবে।

আঞ্চলিক খাদ্যাভাসের সঙ্গে খাদ্যবৈচিত্র্যকে প্রাধান্য দেওয়া দরকার। মৌলিক খাদ্যগুলো অর্থাৎ ভাত, রুটি, মাছ, মাংস, দুধ, ডিম, ডাল, শাকসবজি ও ফলমূল সঠিক পরিমাণে খেতে হবে। খাদ্য বিনিময় ও পরিবেশনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। সুস্বাস্থ্য বজায় রাখার জন্য পরিমিত পরিমাণে খাদ্য গ্রহণকে প্রাধান্য দেওয়া উচিত। পুষ্টিসম্মত খাদ্য গ্রহণের লক্ষ্যগুলো হলো বাংলাদেশের জনগণের পুষ্টিগত অবস্থার উন্নয়ন ও পুষ্টি উপাদানের অভাবজনিত রোগগুলো প্রতিরোধ করা। গর্ভবতী ও স্তন্যদাত্রী মায়েদের যথাযথ পুষ্টিগত অবস্থা বজায় রাখা। শিশুদের সঠিকভাবে মায়ের দুধ ও পরিপূরক খাবার খাওয়ানো নিশ্চিত করা। খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে সম্পর্কিত দীর্ঘমেয়াদি রোগগুলো প্রতিরোধ এবং নিয়ন্ত্রণ করা। বয়স্কদের সুস্বাস্থ্যের সঙ্গে আয়ুষ্কাল বাড়ানো। বাংলাদেশের জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশের বেশি শিশু প্রোটিন ও ক্যালরিজনিত পুষ্টিহীনতায় ভোগে। এর মধ্যে খর্বাকৃতি ৩৬ শতাংশ, কৃষকায় ১৪ শতাংশ ও নিম্ন ওজনে রয়েছে ৩৩ শতাংশ। গড়ে এক-চতুর্থাংশ মহিলা দীর্ঘস্থায়ী ক্যালরিজনিত অপুষ্টিতে ভোগে, যাদের অধিকাংশের দেহে একইসঙ্গে জিংক, আয়রন ও আয়োডিনের স্বল্পতা রয়েছে। এসব বিষয়ে আমাদের সর্তকতার সঙ্গে লক্ষ রাখতে হবে।

আদর্শ খাদ্য গ্রহণ

জনগণের সুস্বাস্থ্য বজায় রাখার জন্য খাদ্য গ্রহণে ১০টি নির্দেশাবলি ও পুষ্টিবার্তা আছে, যা সাধারণ মানুষের জন্য সহজবোধ্য। যেমন প্রতিদিন সুষম ও বৈচিত্র্যপূর্ণ খাদ্য গ্রহণ; পরিমিত পরিমাণে তেল ও চর্বিজাতীয় খাদ্য গ্রহণ; প্রতিদিন সীমিত পরিমাণে আয়োডিনযুক্ত লবণ গ্রহণ; মিষ্টিজাতীয় খাদ্য সীমিত পরিমাণে গ্রহণ; প্রতিদিন পর্যাপ্ত পরিমাণে নিরাপদ পানি ও পানীয় পান; নিরাপদ খাদ্য গ্রহণ; সুষম খাদ্য গ্রহণের পাশাপাশি নিয়মিত শারীরিক শ্রমের মাধ্যমে আদর্শ ওজন বজায় রাখা; সঠিক পদ্ধতিতে রান্না, সঠিক খাদ্যাভ্যাস এবং সুস্থ জীবনযাপনে নিজেকে অভ্যস্তকরণ; গর্ভাবস্থায় এবং স্তন্যদানকালে চাহিদা অনুযায়ী বাড়তি খাদ্য গ্রহণ; শিশুকে ছয় মাস বয়স পর্যন্ত শুধু মায়ের দুধ এবং ছয় মাস পর বাড়তি খাদ্য প্রদান।

প্রতিদিন সুষম বৈচিত্র্যপূর্ণ পুষ্টি গ্রহণ

প্রতিদিন চাহিদা অনুযায়ী ভাত, রুটি বা অন্য শস্যজাতীয় খাদ্য গ্রহণ এবং ভাত ও রুটির সঙ্গে ডাল-মাছ-মাংস-ডিমজাতীয় খাবারের সমন্বয়ে তৈরি খাদ্য গ্রহণ করতে হবে। চাল অতিমাত্রায় না ধুয়ে বসাভাত রান্না ও গ্রহণ। লাল চাল ও লাল আটা হলো প্রোটিন, আঁশ, তেল, খনিজ লবণ ও ভিটামিনের উৎস। সেজন্য পারতপক্ষে এগুলো বেশি করে খেতে হবে। প্রতিদিন মাঝারি আকারের এক থেকে চার টুকরা মাছ-মাংস ও এক থেকে ১/২ কাপ ডাল (৩০ থেকে ৬০ গ্রাম) গ্রহণ; প্রাণিজ প্রোটিনের অনুপস্থিতিতে ভাত ও ডাল অথবা মুড়ি ও ছোলার ওজনের আদর্শ অনুপাত ৩:১ বজায় রাখা; প্রতিদিন কমপক্ষে দুটি মৌসুমি ফল (১০০ গ্রাম) খাওয়া। সুস্থতার জন্য প্রতিদিন কমপক্ষে এক কাপ (১৫০ মিলিলিটার) দুধ বা আধা কাপ দই খাওয়া উচিত।

গর্ভবতী নারীর জন্য

গর্ভাবস্থায় আয়রনসমৃদ্ধ খাদ্য, যেমন মাংস, বুটের ডাল, পাটশাক, কচুশাক ও চিড়া খেতে হবে। এ সময় মৌসুমি ফল বিশেষ করে খাবারের পর খাওয়া। চা ও কফি প্রধান দুই খাবারের মধ্যবর্তী সময়ে খাওয়া। গর্ভাবস্থায় সঠিক ওজন বৃদ্ধি বজায় রাখা ও একবারে খেতে না পারলে বারে বারে খাওয়া উচিত। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরিচর্যা ও চেকআপ করাতে হবে।

 শিশুদের জন্য

শিশু জন্মের পর এক ঘণ্টার মধ্যে শাল দুধ পান করাতে হবে। শিশুর বৃদ্ধির জন্য ছয় মাস বয়স পর্যন্ত শুধু মায়ের দুধ খাওয়ানো উচিত। প্রসূতি মায়ের জন্য পারিবারিকভাবে আন্তরিক সহযোগিতা ও পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিশ্চিত করতে হবে। শিশুর ছয় মাস পূর্ণ হলে মায়ের দুধের পাশাপাশি যথাযথ পরিপূরক খাবার, যেমন আলুসিদ্ধ, ডিমসিদ্ধ, পাকাকলা ও খিচুড়ি দিতে হবে। দুই বছর বয়স পর্যন্ত মায়ের দুধ খাওয়াতে হবে। এক বছর বয়স থেকে শিশু নিজে খাবে। জোর করে খাওয়ানো ঠিক নয়। শিশুকে কোমল ও মিষ্টি পানীয় দেওয়া থেকে বিরত রাখা উচিত। কেননা এগুলো দাঁতের ক্ষতি করে। স্তন্যদাত্রী মাকে ধূমপান, মদ্যপান, তামাক ও ক্ষতিকর ওষুধ সেবন থেকে বিরত রাখতে হবে।

নিরাপদ খাদ্য গ্রহণ

বাসি, পচা ও দূষিত খাদ্য গ্রহণের ফলে মানুষের মারাত্মক অসুস্থতা হতে পারে, এজন্য মৃত্যুও হতে পারে। ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস ও ছত্রাক আক্রমণ খাদ্য ও পানীয়কে বিষাক্ত করে তোলে। ইঁদুর ও বিষাক্ত পোকামাকড় খাদ্যকে অগ্রহণযোগ্য করে তোলে। খাদ্যবাহিত বিভিন্ন রোগ, যেমন টাইফয়েড, ডায়রিয়া ও আমাশয়ে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। এছাড়া খাদ্যে ভেজাল দ্রব্য মিশ্রণ, অনুমোদনবিহীন ও মাত্রাতিরিক্ত ক্ষতিকর রং ও গন্ধের ব্যবহার হয়, এমন খাবার স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।

প্রাপ্তবয়স্কদের খাবার পুষ্টিসম্মত ও পুষ্টিবিদ অনুমোদিত হওয়া দরকার। পুষ্টিবিদরা বলেন, প্রতি বেলায় প্লেটে একজন বয়স্ক মানুষের জন্য খাবারের তালিকায় ৪০০ গ্রাম ভাত (৫৩ শতাংশ), ৫০ গ্রাম মৌসুমি ফল (সাত শতাংশ), ২০০ গ্রাম মিশ্রিত সবজি (১৫ শতাংশ), ২০ গ্রাম ডাল (চার শতাংশ), ৫০ গ্রাম মাছ-মাংস-ডিম (ছয় শতাংশ) ও ১০০ গ্রাম শাক (১৫ শতাংশ) থাকা উচিত। এভাবে হিসাব করে খেলে আমরা পুষ্টিসম্মত খাবার খেয়েছি বলে ধরে নেওয়া হবে এবং আমরা সুস্থ থাকব। অর্থাৎ নিয়ম মেনে পুষ্টিসমৃদ্ধ খাবার খেলে আমরা সুস্থ থাকব।

 

কৃষিবিদ ডক্টর মো. জাহাঙ্গীর আলম

পরিচালক, কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ঢাকা