১৮ ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ডে নিয়মবহির্ভূত উচ্চসুদ

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা উপেক্ষিত

শেখ আবু তালেব: সহজে বহনযোগ্য ও তুলনামূলক নিরাপদ হওয়ায় বাংলাদেশে প্লাস্টিক মানি বলে খ্যাত ক্রেডিট কার্ডে আগ্রহ বাড়ছে মানুষের। ফলে দিন দিন ক্রেডিট কার্ডের গ্রাহকের সংখ্যাও বাড়ছে। এ সুযোগে ব্যাংকগুলোও বাগিয়ে নিচ্ছে বাড়তি সুদ। এক্ষেত্রে ১৮টি ব্যাংক ক্রেডিট কার্ডের বিপরীতে গ্রাহকদের কাছ থেকে উচ্চসুদ নিচ্ছে। এ সুদ আদায়ে তারা বরাবরই উপেক্ষা করে চলেছে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা। একাধিক উদ্যোগ নিয়েও কোনো ফল না পাওয়া ক্রেডিট কার্ডে উচ্চসুদ আদায়ের বিষয়ে ব্যাংকগুলোর কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
জানা যায়, বেশ কিছুদিন আগে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো ক্রেডিট কার্ডের ঋণের বিপরীতে উচ্চ সুদ আদায়ের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক তদন্ত করে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পর্যবেক্ষণে বেরিয়ে আসে ৫৭টি ব্যাংকের মধ্যে এখনও ১৮টি ব্যাংক ক্রেডিট কার্ডের বিপরীতে গ্রাহকদের কাছ থেকে নিয়মবহির্ভূতভাবে উচ্চসুদ আদায় করছে। যার অনেকটা গ্রাহক পর্যন্ত জানে না। গ্রাহকদের অজান্তেই বেশি সুদ আদায় করছে তারা।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সূত্র মতে, ক্রেডিট কার্ড গ্রাহকদের প্রায় ৭০ শতাংশই নির্দিষ্ট সময়ে অর্থ পরিশোধ করে দেয়। ফলে মাত্র ৩০ শতাংশ গ্রাহকের কাছ থেকে উচ্চসুদ আদায় করতে পারে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্র জানিয়েছে, ক্রেডিট কার্ডে উচ্চসুদ নিয়ন্ত্রণে ২০১৭ সালের আগস্টে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক, যা গত জানুয়ারি মাস থেকে কার্যকর করা হয়েছে। কিন্তু নির্দেশনা অনুযায়ী সুদহার কার্যকর করেনি এসব ব্যাংক।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা না মানলে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে, সে বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. সিরাজুল ইসলাম শেয়ার বিজকে বলেন, ‘সব বাণিজ্যিক ব্যাংককেই বাংলাদেশ ব্যাংক একটি গাইডলাইনের আওতায় পরিচালিত করে। কোনো ব্যাংক না মানলে তার বিরুদ্ধে বিধিবদ্ধ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক কোনো ছাড় দেবে না।’
নির্দেশনা অনুযায়ী, ব্যাংক কর্তৃক ঘোষিত ঋণের সুদহারের মধ্যে যে হার সর্বোচ্চ, সেই সুদহারের সঙ্গে পাঁচ শতাংশের বেশি চার্জ নিতে পারবে না। কিন্তু ব্যাংকগুলো এই পার্থক্য সর্বোচ্চ ১৬ শতাংশ পর্যন্ত করেছে।
এর মধ্যে শীর্ষে অবস্থান করছে বেসরকারি খাতের এনসিসি ব্যাংক লিমিটেড। গত জুন শেষে ব্যাংকটির সাধারণ ঋণের সর্বোচ্চ সুদহার ছিল ১৪ শতাংশ। কিন্তু ক্রেডিট কার্ডের বিপরীতে গ্রাহকদের কাছ থেকে নেওয়া হচ্ছে ৩০ শতাংশ হারে সুদ। সর্বোচ্চ সুদহারের সঙ্গে পার্থক্য দাঁড়িয়েছে ১৬ শতাংশ। অথচ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী ক্রেডিট কার্ডের বিপরীতে সুদ নেওয়ার কথা ১৯ শতাংশ। এক্ষেত্রে গ্রাহকের কাছ থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশিত মাত্রার চেয়ে ১১ শতাংশীয় পয়েন্ট বেশি হারে সুদ বেশি নিচ্ছে ব্যাংকটি।
এ বিষয়ে এনসিসি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোসলেহ উদ্দিন আহমেদের সঙ্গে তার মোবাইল ফোনের মাধ্যমে কয়েক বার যোগাযোগ করা হলেও কোনো মন্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
ক্রেডিট কার্ডে উচ্চসুদ নেওয়ার ক্ষেত্রে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে বেসরকারি খাতের এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংক লিমিটেড। ব্যাংকটি সর্বোচ্চ ঋণ সুদহার ১৫ শতাংশ ও ক্রেডিট কার্ডের ক্ষেত্রে ৩০ শতাংশ। সর্বোচ্চ ঋণ সুদহার ও ক্রেডিট কার্ডের ঋণ সুদহারের ব্যবধান পাঁচ শতাংশের বদলে দাঁড়িয়েছে ১৫ শতাংশে।
তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে ওয়ান ব্যাংক লিমিটেড। ক্রেডিট কার্ডের বিপরীতে সুদহার-সংক্রান্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংকটির সর্বোচ্চ ঋণ সুদহার ১৮ শতাংশ ও ক্রেডিট কার্ডের সুদহার ৩১ দশমিক ৫০ শতাংশ। দুই খাতে সুদহারের ব্যবধান দাঁড়িয়েছে ১৩ দশমিক ৫০ শতাংশে। এরপরের অবস্থানে রয়েছে প্রাইম ব্যাংক লিমিটেড। তাদের সাধারণ ঋণ ও ক্রেডিট কার্ডের ঋণের মধ্যে পার্থক্য ১৩ শতাংশ।
ক্রেডিট কার্ডের নিয়মিত সুদহারের বাইরেও রয়েছে ব্যাংকগুলোর নানামুখী চার্জ। বর্তমানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বেঁধে দেওয়া সীমার বাইরে গিয়ে ক্রেডিট কার্ড থেকে অনিয়ন্ত্রিত উচ্চসুদ নিচ্ছে রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংকও। বেসরকারি পর্যায়ে ঢাকা ব্যাংক, ইস্টার্ন, এক্সিম, আইএফআইসি, যমুনা, মিডল্যান্ড, মধুমতি, মিউচুয়াল, ন্যাশনাল, এনসিসি, এনআরবি কমার্শিয়াল, ওয়ান ব্যাংক, স্ট্যান্ডার্ড, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ও কমার্শিয়াল ব্যাংক অব সিলন।
ইস্টার্ন ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ডের বিপরীতে সুদহার-সংক্রান্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংকটির সর্বোচ্চ ঋণ সুদহার ১২ দশমিক ৫০ শতাংশ ও ক্রেডিট কার্ডের সুদহার ২৪ শতাংশ। দুই খাতে সুদহারের ব্যবধান দাঁড়িয়েছে ১১ দশমিক ৫০ শতাংশ।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইস্টার্ন ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলী রেজা ইফতেখার শেয়ার বিজকে বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক ক্রেডিট কার্ডের সুদের যে তালিকা দিয়েছে, আমাদের সুদহারের সঙ্গে তার মিল নেই। আর ওই তালিকাটি আমার কাছে নেই। তাই এ ব্যাপারে এখনই বিস্তারিত মন্তব্য করা সম্ভব নয়।
এদিকে ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ কথা বললেও ব্যাংকটির ক্রেডিট কার্ড বিভাগের কাস্টমার কেয়ার ইউনিটে ফোন করলে তারা ক্রেডিট কার্ডের যে সুদহারের কথা জানিয়েছে, তার সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের তালিকার মিল রয়েছে।