২০১৭ সালে এলসি খোলায় বাংলাদেশের বিশ্বরেকর্ড

শেখ আবু তালেব: পণ্য আমদানিতে ব্যাংকের মাধ্যমে লেটার অব ক্রেডিট বা এলসি খুলতে হয়। ২০১৭ সালে এলসি খোলায় বিশ্বরেকর্ড করেছে বাংলাদেশ। বিশ্বে আমদানির বিপরীতে সবচেয়ে বেশিসংখ্যক এলসি খুলেছে বাংলাদেশ। ব্যবসায়ীদের আন্তর্জাতিক সংগঠন ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্সের (আইসিসি) সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
আইসিসির তথ্য অনুযায়ী ২০১৭ সালে বিশ্বে ৪২ লাখ ৪৭ হাজার ১৮৫টি এলসি খোলা হয়েছে। গড়ে প্রতি মাসে খোলা হয়েছে তিন লাখ ৫৩ হাজার ৯৩২টি। অথচ ওই বছরে বিশ্ব বাণিজ্যের পরিমাণ ২০১৬ সালের তুলনায় দুই দশমিক ৩৫ শতাংশ কমেছে। ২০১৫ সালের তুলনায় ২০১৬ সালেও মোট বাণিজ্যের চার দশমিক ৭২ শতাংশ কমেছিল।
এর মধ্যে গত বছর বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে বেশিসংখ্যক এলসি খুলে শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশ। আর এলসিগ্রহীতা দেশের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে চীন। অর্থাৎ আমদানিতে এলসি খোলার দিক দিয়ে শীর্ষে ছিল বাংলাদেশ আর রফতানিতে চীন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, ২০১৭ সালের ওই সময় এলসির মাধ্যমে বাংলাদেশ চার হাজার ৭৭৮ কোটি ১৯ লাখ ডলারের পণ্য আমদানি করে, যা ২০১৬ সালে ছিল চার হাজার ১২৬ কোটি ৬৬ লাখ ডলার। এক বছরের ব্যবধানে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৫ দশমিক ৭৯ শতাংশ বা ৬৫১ কোটি ৫৩ লাখ ডলার। বিশ্বব্যাপী যেখানে আমদানি কমেছে, সেখানে উল্টো বাংলাদেশের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।
এলসি বৃদ্ধির এই চিত্র সম্পর্কে জানে না সরকার, বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) বা কাস্টমস কর্তৃপক্ষ। বিষয়টিকে অস্বাভাবিক উল্লেখ করে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ শেয়ার বিজকে বলেন, মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি দেশের অর্থনীতির জন্য ভালো; কিন্তু সম্প্রতি আমদানি যে পরিমাণে বেড়েছে, অর্থনীতিতে তার কোনো প্রভাব দেখা যাচ্ছে না। কর্মসংস্থান ও পণ্য উৎপাদন বৃদ্ধি পাওয়ার কথা। রফতানিতেও তার প্রভাব সেভাবে পড়েনি। এজন্যই প্রশ্ন ওঠে আমদানির চিত্র নিয়ে।
২০১৭-১৮ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে চার হাজার ৯০১ কোটি ডলারের পণ্য আনা হয়েছে। এ সময় নতুন এলসি খোলা হয়েছে চার হাজার ৫৩৪ কোটি ৬০ লাখ ডারের। ২০১৬-১৭ অর্থবছরের তুলনায় যা ২৫ শতাংশ বেশি। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে আমদানিতে প্রবৃদ্ধি ছিল ১০ শতাংশ।
এত পরিমাণ এলসি খোলাকে অস্বাভাবিক বলে আসছেন অর্থনীতিবিদরা। কারণ ছাড়া অস্বাভাবিক আমদানি বৃদ্ধি পাওয়ায় ব্যাংকিং চ্যানেলেই অর্থ পাচার হচ্ছে বলে পর্যবেক্ষণ দিচ্ছেন তারা। আমদানিনির্ভর দেশ হওয়ায় অস্বাভাবিক আমদানিতে বাণিজ্য ঘাটতি বাড়ছে প্রতিবছর। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী ২০১৭-১৮ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাস শেষে বাংলাদেশের চলতি হিসাবে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৮৫১ কোটি ডলার ঋণাত্মক। ফলে সার্বিক বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৫৩৩ কোটি ৫০ লাখ ডলার।
কমতে শুরু করেছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। এ প্রবণতা চলতে থাকলে বৈদেশিক মুদ্রার জন্য শিগগিরই বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) শরণাপন্ন হতে হবে বলে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্মকর্তারা।
আমদানি বেড়ে যাওয়ায় টাকার বিপরীতে ডলারের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে ডলারের বিপরীতে টাকার মান ছিল ৭৮ টাকা ৫১ পয়সা। ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে ৭৯ টাকা ১০ পয়সা ও ডিসেম্বরে হয়েছে ৮২ টাকা ৭০ পয়সা। গত জুন শেষে তা দাঁড়িয়েছে ৮৩ টাকা ৭০ পয়সা। আড়াই বছরের ব্যবধানে ডলারের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে পাঁচ টাকা ১৯ পয়সা। যা সাড়ে ছয় শতাংশের বেশি। ফলে আমদানি করা পণ্যমূল্যও বৃদ্ধি পেয়েছে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ শেয়ার বিজকে বলেন, আমদানি বৃদ্ধির অস্বাভাবিক প্রবণতা আগে কখনও দেখা যায়নি। দুবছর ধরে আমদানি বৃদ্ধি পেয়েছে। আমাদের পর্যবেক্ষণ বলছে, আমদানি এলসির বিপরীতে যে পরিমাণ পণ্য আসার কথা, তা আসছে না। কিছু ক্ষেত্রে নামকাওয়াস্তে পণ্য আসছে। যে পণ্য বা মেশিনারিজ আসছে, তার মূল্য তত নয়। এভাবেই টাকা পাচার হয়ে যাচ্ছে দেশ থেকে।
তিনি আরও বলেন, বড় এলসির বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংককে খোঁজ নিয়ে দেখতে হবে। এজন্য বাংলাদেশ ব্যাংক, কাস্টমস, এনবিআর ও আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিটকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। তারাই প্রমাণ বের করতে পারবে।
এ বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান শেয়ার বিজকে বলেন, আমদানি পণ্যে মিথ্যা তথ্য দেওয়া হচ্ছে কিনা, তা দেখতে হবে বাংলাদেশ ব্যাংক, এনবিআর ও কাস্টমস কর্তৃপক্ষকে। ঘোষিত পণ্যই দেশে আসছে কিনা, তা দেখতে হবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে। তাহলে প্রমাণ বেরিয়ে আসবে অর্থপাচার হচ্ছে কি-না।
আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী একটি দেশকে তিন মাসের আমদানি ব্যয় পরিশোধ করার মতো অর্থ রাখতে হয়। গত মার্চ মাসে এ অর্থ পরিশোধ করতে হয়েছে। আবার জুন শেষে অর্থ পরিশোধ করতে হবে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে আমদানি বাবদ পরিশোধ করতে হয়েছে ৯ হাজার ৪৩৫ কোটি ৬৮ লাখ ডলার। প্রতি মাসে গড়ে ৯৪৩ কোটি ৫৬ লাখ ডলার ব্যয় হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাংলাদেশ ব্যাংকের কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, বাংলাদেশ এলডিসি দেশের তালিকা থেকে বের হচ্ছে। তখন আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী ছয় মাসের রফতানি ব্যয় পরিশোধের সমান বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থাকতে হবে। বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে তা সম্ভব নয়। এতে বাধ্য হয়ে আইএমএফের শরণাপন্ন হতে হবে বাংলাদেশকে।
কারণ হিসেবে তারা বলছেন, বর্তমানে বাংলাদেশের রেমিট্যান্সের প্রবৃদ্ধি ১৭ শতাংশ। রফতানি প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ছয় শতাংশ। অপরদিকে ব্যয়ের খাতে আমদানি প্রবৃদ্ধি ২৫ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। ফলে প্রতি মাসেই ঘাটতি থেকে যাচ্ছে দুই শতাংশীয় পয়েন্ট, যার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়বে অর্থনীতিতে।
এ বিষয়ে মন্তব্য গ্রহণে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র দেবাশীস চক্রবর্ত্তীর সঙ্গে শেয়ার বিজের পক্ষ থেকে এ প্রতিবেদক যোগাযোগ করেন। তবে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি তিনি।