২০১৭ সাল ব্যাংক খাতে কেলেঙ্কারির বছর

জিডিপি প্রবৃদ্ধির গুণগতমান নিয়ে প্রশ্ন সিপিডির

নিজস্ব প্রতিবেদক: আগে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির হার বাড়ানোর বিষয়ে বেশি গুরুত্বারোপ করা হতো। এখন বেশি জোর দিতে হচ্ছে প্রবৃদ্ধির গুণগত মানের বিষয়ে। কারণ প্রবৃদ্ধি বাড়লে সাধারণত সমাজে যেসব বিষয়ে ইতিবাচক পরিবর্তন আসে, গত কয়েক বছর ধরে তা দেখা যাচ্ছে না। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় প্রবৃদ্ধির হার বাড়লেও দারিদ্র্য কমার হার কমেছে। একই সঙ্গে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির হারও কমেছে। অন্যদিকে বেড়েছে আয়-বৈষম্য ও সম্পদ-বৈষম্য। এর বাইরে দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে আর্থিক খাতে চরম বিশৃঙ্খলা পরিলক্ষিত হয়েছে। এছাড়া তুলার আমদানিতে অস্বাভাবিক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। এর মাধ্যমে অর্থ পাচার হয়ে থাকতে পারে।

রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে গতকাল ‘বাংলাদেশ অর্থনীতি ২০১৭-১৮: প্রথম অন্তর্র্বর্তীকালীন পর্যালোচনা’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এ পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে স্বাধীন গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি)। প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুনের সঞ্চালনায় এ সময় উপস্থিত ছিলেন সিপিডির সম্মানীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য ও অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান এবং গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মেয়াজ্জেম। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন রিসার্চ ফেলো তৌফিকুল ইসলাম খান।

ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ২০১৭ সাল ব্যক্তিখাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি নিয়ে শুরু হয়েছিল। কিন্তু বছর শেষে আর সে অবস্থা অব্যাহত থাকেনি। প্রবৃদ্ধি বাড়লেও তার গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। কারণ প্রবৃদ্ধি বাড়লে কর্মসংস্থানও বাড়ার কথা। কিন্তু বর্তমানে প্রবৃদ্ধি হচ্ছে কর্মসংস্থানবিহীন প্রবৃদ্ধি। পাশাপাশি প্রবৃদ্ধি দারিদ্র্য কমাতে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারছে না। একই সঙ্গে বাড়ছে আয় ও সম্পদের বৈষম্য। প্রবৃদ্ধির ‘গুণগত মানের অভাবে’ ধনী-গরিবের সম্পদ বৈষম্য আরও বেড়েছে। কমেছে দারিদ্র্য হ্রাসের হার। প্রবৃদ্ধির হারের সঙ্গে ব্যক্তিখাতের বিনিয়োগ ও রেমিট্যান্স প্রবাহেরও সামঞ্জস্য দেখা যাচ্ছে না।

মূল প্রবন্ধে জানানো হয়, ২০১০ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে মানুষের আয় ও সম্পদের বৈষম্য বেড়েছে। ২০১৬ সালে দেশের মানুষের মোট আয়ের ০.২৩ শতাংশ আসে সবচেয়ে দরিদ্রদের পাঁচ ভাগ থেকে, যা ২০১০ সালে ছিল ০.৭৪ শতাংশ। অন্যদিকে ২০১৬ সালে মোট আয়ে সবচেয়ে ধনী পাঁচ শতাংশের অবদান ২৭ দশমিক ৮৯ শতাংশ, যা ২০১০ সালে ২৪ দশমিক ৬১ শতাংশ ছিল বলে সিপিডির হিসাব। অর্থাৎ ধনীরা ২০১০ সালে যা আয় করতেন, ২০১৬ সালে এসে এর চেয়ে বেশি আয় করছেন, অন্যদিকে আয় কমেছে গরিবদের।

সিপিডির বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০০০ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত দেশে গড় প্রবৃদ্ধি ছিল পাঁচ দশমিক এক শতাংশ। সে সময়ে প্রতিবছর গড়ে এক দশমিক আট শতাংশ হারে দারিদ্র্য কমেছিল। ২০০৫ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত সময়ে দেশে গড় প্রবৃদ্ধি ছিল ছয় দশমিক এক শতাংশ। এ সময়ে প্রবৃদ্ধি বাড়লেও দারিদ্র্য হ্রাস কমে এক দশমিক সাত শতাংশে নেমে আসে। আর ২০১০ থেকে ২০১৬ পর্যন্ত সময়ে গড় প্রবৃদ্ধি ছয় দশমিক পাঁচ শতাংশ। প্রবৃদ্ধি বাড়লেও এ সময়ে দারিদ্র্য হ্রাস ব্যাপক হারে কমে গিয়ে মাত্র এক দশমিক দুই শতাংশে নেমে আসে।

সিপিডির হিসাবে, প্রবৃদ্ধি বাড়লেও সেটা ঠিকভাবে বণ্টন হচ্ছে না। ফলে আয়-বৈষম্য বাড়ছে। ২০০৫ সালে সবচেয়ে দরিদ্র পাঁচ শতাংশের খানাপ্রতি আয় (হাউজহোল্ড ইনকাম) ছিল ১১০৯ টাকা, যা কমে ২০১৬ সালে ৭৩৩ টাকায় দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে ধনী পাঁচ শতাংশের খানাপ্রতি আয় ৩৮ হাজার ৭৯৫ থেকে দ্বিগুণের বেশি বেড়ে হয়েছে ৮৮ হাজার ৯৪১ টাকা হয়েছে।

সিপিডির রিসার্চ ফেলো তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, ‘পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর কাছে প্রবৃদ্ধির সুফল পৌঁছায়নি। গরিবরা আরও গরিব হচ্ছে, ধনীরা আরও ধনী হচ্ছে।’

মূল প্রবন্ধে উল্লেখ করা হয়, তুলা আমদানিতে ৭৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। কিন্তু সেই অনুপাতে তৈরি পোশাক ও বস্ত্র খাতে তেমন উন্নতি লক্ষ করা যায়নি। এমনকি এর বিপরীতে রফতানিও তেমন বাড়েনি। তাই এমন প্রবৃদ্ধি সন্দেহজনক। তুলা আমদানির আড়ালে অর্থ পাচার হচ্ছে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি (জিএফআই) প্রতিবেদনে দেখা গেছে, প্রতিবছর প্রায় ৮ থেকে ৯ বিলিয়ন ডলার দেশ থেকে পাচার হচ্ছে। এর মধ্যে প্রায় ১০ শতাংশ পাচার হচ্ছে ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে, যা আমদানি রফতানির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। কাজেই তুলা আমদানিতে যে অস্বভাবিক প্রবৃদ্ধি লক্ষ করা যাচ্ছে, তার আড়ালে অর্থ পাচারের সন্দেহ হওয়াটাই স্বাভাবিক। বাংলাদেশ ব্যাংক ও এনবিআরের উচিত এ বিষয়টি খতিয়ে দেখা।

২০১৭ সাল দেশে ব্যাংক কেলেঙ্কারির বছর হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে বলে মনে করেন দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, চলতি বছরও ব্যাংক খাতের ঘটনাগুলোর কোনো নিরসন হবে বলে মনে হচ্ছে না। ব্যাংক খাতের পরিস্থিতি দিয়ে বোঝা যায়, সংস্কারের বিষয়ে সরকারের মনোভাব কী রকম ছিল।

তিনি বলেন, ব্যাংকে অপরিশোধিত ঋণ বেড়েছে, সঞ্চিতির ঘাটতি বেড়েছে, অপরিশোধিত ঋণে গুটি কয়েকের প্রাধান্য তৈরি হয়েছে, জনগণের করের টাকায় রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকে মূলধন ঘাটতি পূরণ করা হয়েছে, বিভিন্ন ব্যক্তিখাতের ব্যাংকে প্রশাসনিক ব্যবস্থার মাধ্যমে মালিকানার বদল হয়েছে, রাজনৈতিক বিবেচনায় দেওয়া নতুন ব্যাংক কার্যকর হতে পারেনি এবং এখন দেখা যাচ্ছে ব্যক্তিখাতের ব্যাংকের মাধ্যমে টাকা পাচারের ঘটনা ঘটছে। তিনি বলেন, এগুলোর ক্ষেত্রে কোনো প্রতিষেধক ব্যবস্থা না নিয়ে সরকার উল্টো ব্যাংকিং আইন সংশোধন করে ব্যাংকে পরিবারের নিয়ন্ত্রণ বাড়াল।

সামগ্রিক এ পরিস্থিতির জন্য দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাকে দায়ী করেন দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, অর্থ মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বমূলক ভূমিকার ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঘাটতি ছিল। এ ঘাটতি তিন জায়গায়। সংস্কারের উদ্যমের অভাব, সমন্বয় করতে না পারা এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতায় দুর্বলতা।

গতকালের পর্যালোচনায় রোহিঙ্গা ও বন্যার বিষয়টি নিয়ে বিশেষ আলোচনা হয়।