‘২০১৯ সালে ব্যাংক খাতে হুমকি হবে চলতি হিসাবে ঘাটতি’

মো. মেহমুদ হোসেন এনআরবি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা। ২০১৬ সালের আগস্ট থেকে তিনি এ দায়িত্বে আছেন। সম্প্রতি শেয়ার বিজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এনআরবি ব্যাংকের সাফল্য ও চ্যালেঞ্জ নিয়ে কথা বলেছেন। একই সঙ্গে ব্যাংক খাতের সমসাময়িক নানা বিষয়ে মতপ্রকাশ করেছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন তানিয়া আফরোজ

শেয়ার বিজ: ১৯৮৪ সালে ন্যাশনাল ব্যাংকে আপনার ব্যাংকিং ক্যারিয়ার শুরু। বর্তমানে চতুর্থ প্রজন্মের ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী। ৩৫ বছরের ক্যারিয়ারে নিজের নেতৃত্বদানের কৌশলকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

মেহমুদ হোসেন: আমি প্রতিষ্ঠানের সবাইকে নিয়ে একযোগে কাজ করায় বিশ্বাসী। তবে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার অবস্থান থেকে এটি করা কঠিন। এজন্য কতগুলো ধাপ আছে। সেই ধাপে ধাপে পুরো দল নিয়ে কাজ করার চেষ্টা করি। নিজের নেতৃত্বের দক্ষতাটা সবার মধ্যে সঞ্চালন করি এমনভাবে যাতে আমার সামর্থ্য সম্পর্কে দলের মধ্যে ধারণা জš§ায়। একই সঙ্গে স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতার প্রমাণ রাখতে সচেষ্ট থাকি যেন আমার নেতৃত্বে সবার আস্থা জš§ায়। এর মাধ্যমেই দলের সদস্যদের কাছাকাছি পৌঁছানো যায়। আস্থা অর্জনই প্রথম ধাপ। তারপর যোগাযোগের বিশেষ বিশেষ কৌশলের মধ্যমে সবার কাছ থেকে সর্বোচ্চ কর্মদক্ষতা বের করে আনতে চেষ্টা করি। আর এ সবকিছুর সঙ্গে সততার প্রশ্নে অবশ্যই দৃঢ় থাকতে হয়।

শেয়ার বিজ: এই দৃঢ়তার কারণে পর্ষদের সঙ্গে কি সংঘাত হয়?

মেহমুদ হোসেন: একদম হবে না, তা তো নয়। হওয়াটাই স্বাভাবিক। তবে পর্ষদ জেনে-বুঝেই একজন প্রধান নির্বাহীকে তার প্রতিষ্ঠানের জন্য নির্বাচন করে থাকে। ফলে তার স্বাতন্ত্র্যকে মূল্যায়ন করার মানসিকতাও পর্ষদের থাকে। তবে আমি মনে করি, এ ব্যাংকের পর্ষদ যথেষ্ট বিচক্ষণ। কয়েকজন প্রবাসী বাঙালির সমন্বয়ে পর্ষদ গঠিত। তারা ব্যাংকে সুশাসনের সংস্কৃতি বজায় রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

শেয়ার বিজ: ২০১৩ সালে এনআরবি ব্যাংকের প্রতিষ্ঠা। বর্তমানে এর ৩৭টি শাখা। গত পাঁচ বছরে ব্যাংকের সামগ্রিক পারফরম্যান্সকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

মেহমুদ হোসেন: পারফরম্যান্সকে যদি মুনাফার প্যারামিটারে দেখেন, তাহলে এক কথায় আশাব্যঞ্জক। এর অন্যতম কারণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠার শুরু থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত দেশের রাজনৈতিক অর্থনীতি অনুকূলে ছিল না। সে সময় ধীরগতিতে ব্যবসা প্রসারের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল ব্যাংক পর্ষদ। নতুনভাবে ২০১৭তে আমরা ব্যাংকের পূর্নগঠনের পাশাপাশি ব্যবসা প্রসারে মনোনিবেশ করি । এ বছর আমরা উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি লাভ করি।
শুরুতে এ ব্যাংকের মডেল ছিল পুরোপুরি ‘সেন্ট্রালাইজ’ অর্থাৎ কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রণাধীন। ২০১৭তে মিক্সড মডেল নির্বাচনের সিদ্ধান্ত নিই। অর্থাৎ কার্যক্রম নিয়ন্ত্রিত হবে কেন্দ্রীয়ভাবে। কিন্তু ব্যবসায়িক সম্পর্ক বজায় রাখা হবে শাখা ও প্রধান কার্যালয়ের রিলেশন টিমের মাধ্যমে। ২০১৭ সালে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ঢেলে সাজানোর কার্যক্রম শুরু হয়। ২০১৬’র শেষার্ধে এবং ২০১৭তে ২০টি শাখা খোলার খরচসহ বর্ধিত মানবসম্পদ ও অবকাঠামোর খরচ পুষিয়ে সীমিত মুনাফার দিকে এগোই আমরা। এর মধ্যে শেয়ারধারীকে মোটামুটি লভ্যাংশ দিতে পেরেই সন্তুষ্ট।

শেয়ার বিজ: বর্তমানে কয়েকটি ব্যাংক কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণাধীন (সেন্ট্রালাইজ সিস্টেম) পদ্ধতিতে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। অনেকেই বলেন, এ পদ্ধতি অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যাংকিং সেবার ক্ষেত্রে বিশেষভাবে কার্যকরী নয়। আপনি কি মনে করেন?

মেহমুদ হোসেন: না, কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণাধীন পদ্ধতি কোনোভাবেই আর্থিক অন্তর্ভুক্তির জন্য প্রতিবন্ধক নয়। কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণাধীন মানে সব ব্যবসা ঢাকা বা প্রধান কার্যালয়ে নিয়ে আসা নয়। প্রধান কার্যালয়ে থাকবে নিয়ন্ত্রণ। লেনদেন হবে শাখার মাধ্যমে। আমানত ও গ্রাহক সংগ্রহ এবং লোন মার্কেটিং হবে শাখা ও এজেন্ট আউটলেটের মাধ্যমে। ব্যাংকিং কার্যক্রমে কমপ্লায়ান্স বজায় রাখতে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণাধীন ব্যবস্থা খুবই কার্যকরী এবং কম ব্যয়সাপেক্ষ।
তবে এ পদ্ধতিতে চ্যালেঞ্জ আছে নিঃসন্দেহে। বিশেষ করে পুরোনো ব্যাংকগুলোর জন্য এটি বড় চ্যালেঞ্জ। এতে প্রথম দিকে ব্যবসায় ক্ষতি হতে পারে। পুরোনো ব্যাংকগুলোর অনেক বছরের বিশাল পোর্টফোলিও, বিরাট গ্রাহকসংখ্যা, অনেক শাখা। এসব শাখায় তারা একক ব্যাংকিং করে এসেছে। পুরোনো শাখাগুলোর শক্তি খর্ব হোক, এটা বড় শাখার ব্যবস্থাপকরা মেনে নিতে পারেন না। একটা মনস্তাত্ত্বিক সমস্যা হয়। এখানে চ্যালেঞ্জটা হচ্ছে, ধারণামূলক কাঠামো অনুযায়ী বাস্তবায়নটা যথার্থ হয়েছে কিনা। পুরোনো অথবা নতুন ব্যাংকে, যে যত ভালোভাবে বাস্তবায়ন করতে পেরেছে, কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণাধীন পদ্ধতিতে তারা তত ভালো ফল পেয়েছে।

শেয়ার বিজ: আমরা জানি, বৈদেশিক বাণিজ্যের নেটওয়ার্ক তৈরিতে দেশের অনেক ব্যাংকই স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। এ ক্ষেত্রে নতুন ব্যাংকগুলোর চ্যালেঞ্জ আরও বেশি। গত পাঁচ বছরে এনআরবি ব্যাংকের সফলতা কতটুকু?

মেহমুদ হোসেন: বৈদেশিক বাণিজ্যে বড় আকারের আমদানি ঋণপত্রে অ্যাড কনফারমেশন চায়। আমাদের মতো নতুন ব্যাংকে একটু বড় ঋণপত্র হলে সরবরাহকারীকে অ্যাড কনফারমেশন দিতে হয়। বিদেশে খুব বড় ব্যাংকের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক এখনও গড়ে ওঠেনি। মধ্যপ্রাচ্যের গুটিকয়েক ও দু-একটি ইউরোপিয়ান- আমেরিকান ও ভারতীয় আর্ন্তজাতিক ব্যাংকের সঙ্গে আমাদের ক্রেডিট লাইন আছে। এর মাধ্যমেই এখন আমাদের বৈদেশিক বাণিজ্য চালিয়ে নিচ্ছি। তাছাড়া দেশীয় ব্যাংকগুলোর আর্ন্তজাতিক সাবসিডিয়ারি মাঝে মাঝে আমাদের পক্ষে অ্যাড কনফারমেশন দেয়। তাদের সঙ্গে কমিশন ভাগ করে নিতে হয়।
বৈদেশিক বাণিজ্যের এ সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করতে ব্যবসায়িক কৌশলের মধ্যে বেশকিছু উপায় খুঁজে নিয়েছি আমরা। যেমন, এখন আমরা আমদানি বাণিজ্যের চেয়ে রফতানি বাণিজ্যে গুরুত্ব দেওয়ার চেষ্টা করছি। বর্তমানে ব্যাক টু ব্যাক এলসির মাধ্যমে ৮৫ শতাংশ রফতানিই দেশীয় সাপ্লাই চেইনের মাধ্যমে হয়। এতে অ্যাড কনফারমেশন লাগে না। দেশের ব্যাংকগুলো আমাদের ব্যাংকের ব্যালান্সশিট, রপ্তানীকারক এবং পরিচিতির ভিত্তিতে এনআরবি’র এলসি নিচ্ছে। অন্যদিকে আমদানি বাণিজ্যের সীমা রাখছি সামর্থ্যরে মধ্যে। এ ব্যাংকের বয়স অনুযায়ী খুব বড় আকারের এলসি খোলা সমীচীন হবে না।

শেয়ার বিজ: অর্থনৈতিক অঞ্চলে ব্যবসা প্রসারের পরিকল্পনা রয়েছে কী?

মেহমুদ হোসেন: অর্থনৈতিক অঞ্চলে ব্যবসা প্রসারের পরিকল্পনা এ মুহূর্তে নেই। নতুন ব্যাংক হিসেবে এখনই আমরা এ অনুমোদন নাও পেতে পারি। ভিত্তি শক্ত করাই এখন প্রধান কাজ। তবে আমরা খুব সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছি। আমরা মনে করি আমাদের সেখানে ব্যবসা প্রসারের সুযোগ আছে। আমরা এ সুযোগ থেকে বেশিদিন দূরে থাকতে চাই না।

শেয়ার বিজ: চলতি বছর আমানত ও ঋণের সুদহার যথাক্রমে ৯ ও ছয়ে নামিয়ে আনার নির্দেশনায় ব্যাংক খাতে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়। এ পরিস্থিতিকে কীভাবে দেখেন?

মেহমুদ হোসেন: এ নির্দেশনার উদ্দেশ্য অবশ্যই প্রশংসনীয়। সামর্থ্য অনুযায়ী এ প্রক্রিয়াকে আমরা সহযোগিতা করতে চাই। কিন্তু কথা হচ্ছে, কিছুটা বাজারের ওপরও নির্ভর করা আবশ্যক। চাইলেই রাতারাতি এর প্রয়োগ ঘটানো যায় না। তবে বাস্তবায়নের কাজটা কিন্তু এগিয়ে যাচ্ছে। ব্যাংক খাতে সব আমানতের জš§ একদিনে হয়নি, ফলে এটা পুনর্মূল্যায়িত হচ্ছে ধীরে ধীরে । অন্যদিকে ঋণের সুদহার নেমে যাওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে। আরও একটি বিষয়, নির্বাচনের বছরে কেউ ঝুঁকি নিতে চায় না। ফলে দেখা যাবে বছরের শেষদিকে মূলধন আমদানি ও ট্রেডের চাহিদা আরও একটু কমে যাবে। এতে করে বাজারে তারল্য সুলভ হবে। তখন সুদহার আরও নামবে।

শেয়ার বিজ: নতুন প্রজন্মের ব্যাংককর্মীদের ব্যাপারে আপনার পর্যবেক্ষণ কী?

মেহমুদ হোসেন: আমার পর্যবেক্ষণ এখনকার ছেলেমেয়েরা অতি দ্রুত ক্যারিয়ার নির্মাণ করতে চায়। নির্দিষ্ট কোনো ব্যাংকে দীর্ঘদিন থেকে কাজ শিখে সুগভীর দক্ষতা অর্জনের চেয়ে চাকরি বদলের মাধ্যমে দ্রুত পদোন্নতি অর্জনের প্রবণতা তাদের মধ্যে বেশি। নবীন কর্মীরা যে পদগুলো টপকে অন্য ব্যাংকে যোগদান করছেন, সেখানে থেকে যাচ্ছে অভিজ্ঞতার ঘাটতি। ফলে উচ্চপদস্থ অনেক কর্মীর মধ্যে আমরা দেখতে পাই সমস্যার বহুমুখী সমাধানে দক্ষতার অভাব। ফলে ব্যাংক খাতে সব পর্যায়ে দক্ষ কর্মীর খুব অভাব অনুভূত হচ্ছে।

শেয়ার বিজ: ২০১৯ সালটি দেশের ব্যাংক খাতের জন্য কেমন হবে বলে আশা করছেন?

মেহমুদ হোসেন: প্রথম কথা হচ্ছে ভালো হওয়া উচিত। এ কারণে যে, আমাদের ডিজিপি’র প্রবৃদ্ধি অব্যাহত আছে। মেগা প্রকল্পগুলো পুরোদমে চলছে। আরও কয়েকটি মেগা প্রকল্প ২০১৯ সালে শুরু হবে। ইউরোপ-আমেরিকার অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো হওয়ায় এবং চীনের সাথে আমেরিকার বাণিজ্যযুদ্ধের কারণে তৈরি পোশাক রফতানিতে প্রবৃদ্ধি আসবে বলে আশা করা যায়। আর কমপ্লায়েন্সের কারণে ব্যাংক খাতে যে টানাপড়েন শুরু হয়েছিল, তাও আমরা অতিক্রম করে এসেছি। সুদহারের চলমান অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণে এলে ব্যাংকগুলোও ভালো করবে। মোটের ওপর ২০১৯ সালে দেশের অর্থনীতি ভালো হওয়ার কথা। কিন্তু রাজনৈতিক পরিবেশ স্থিতিশীল থাকলেই এসব সম্ভব।
তবে কিছু জায়গায় দুরবস্থা অনুমান করতে পারি। প্রবাসী আয় এ বছরের মতো সামনের বছরও কম থাকবে। কারণ যেসব দেশ থেকে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ার কথা, সেসব দেশের অভ্যন্তরীন নীতির কারনে রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে যেতে পারে। ২০১৯ সালে ব্যাংক খাতে হুমকি থাকবে চলতি হিসাবের ঘাটতি নিয়ে। এছাড়া ক্রমবর্ধমান মন্দঋন আদায়ে অনুল্লেখযোগ্য অগ্রগতিও বড় চ্যালেঞ্জ। দেখার বিষয় হচ্ছে সংশ্লিষ্ট মহল কীভাবে এ সংকটের সমাধান করে।

শেয়ার বিজ: সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

মেহমুদ হোসেন: আপনাকেও ধন্যবাদ।