২০২১ সালের রফতানি লক্ষ্য অর্জনে পূর্ণ সহায়তা দিতে সক্ষম চট্টগ্রাম বন্দর

কমোডর জুলফিকার আজিজ ১৯৮৪ সালে বাংলাদেশ নৌবাহিনীতে কর্মজীবন শুরু করেন। পেশাগত জীবনে নৌ-সদর দফতর, বিভিন্ন জাহাজ, ডকইয়ার্ড, খুলনা শিপইয়ার্ড, ডিজিডিপিসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করেন। অর্জন করেছেন অসংখ্য পেশাগত ডিগ্রি। দু’মাস আগে কাজ শুরু করেছেন চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান হিসেবে। দায়িত্ব নেওয়ার পরই তিনি বন্দরের সার্বিক পরিস্থিতি উন্নয়নে নিয়েছেন বেশ কিছু উদ্যোগ। বন্দর পরিচালনা, বর্তমান অবস্থা, সার্বিক কাজে গতিসঞ্চার ও আগামীর পরিকল্পনা নিয়ে সম্প্রতি কথা বলেছেন দৈনিক শেয়ার বিজের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সাইফুল আলম

শেয়ার বিজ: বন্দর পরিচালনায় আপনি কোন বিষয়গুলোয় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে জোর দিচ্ছেন?

জুলফিকার আজিজ: প্রথমত আমি পরিচালনগত কাজে গতি আনার ওপর জোর দিচ্ছি। দ্বিতীয়ত, নিরাপত্তা ব্যবস্থা আধুনিক করে পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। তৃতীয়ত, বন্দরের সব বিভাগকে তথ্যপ্রযুক্তির আওতায় আনা। এ তিনটি বিষয় নিশ্চিত করতে পারলে চট্টগ্রাম বন্দর দ্রুত সেবা নিশ্চিত করতে পারবে। আর দেশের অপ্রতিরোধ্য অর্থনৈতিক উন্নয়নে বন্দরের অংশগ্রহণও অপ্রতিরোধ্য হবে। এর জন্য প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুসরণ এবং বন্দর-সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সঠিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কাজ করছি। এতে চট্টগ্রাম বন্দর আরও বেশি ব্যবসাবান্ধব সেবা সুবিধা নিশ্চিত করবে বলে বিশ্বাস করি।

শেয়ার বিজ: প্রতি বছর বন্দরে বাড়ছে কনটেইনার, কার্গো জাহাজ হ্যান্ডলিং কিন্তু ১০ বছরেও বাড়েনি অবকাঠামোগত সক্ষমতা নিয়ে কী ভাবছেন?

জুলফিকার আজিজ: বন্দরের প্রবৃদ্ধি সামাল দিতে স্বল্পমেয়াদে তো আর জেটি-টার্মিনাল নির্মাণের সুযোগ নেই। এক্ষেত্রে বিদ্যমান জেটি বা টার্মিনাল দিয়েই ধারাবাহিক ক্রমবর্ধমান কাজের চাপ সামাল দিতে হবে। এ জন্য স্বল্পমেয়াদি পদক্ষেপ হিসেবে পরিচালন ব্যবস্থা দ্রুত করাকে অগ্রাধিকার দিয়েছি। তবে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় ২০টি নতুন জেটি, পিপিপির মাধ্যমে পাঁচটি নতুন টার্মিনাল নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এক্ষেত্রে লালদিয়ায় চারটি, বে-টার্মিনালে ১৩টি জেটিসহ মোট ২০টি জেটি হবে। প্রতি দুবছর অন্তর দুটি করে জেটি নির্মাণ করা হবে। আর পিপিপির আওতায় পাঁচটি টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্পের এখন আরএফপি ডকুমেন্ট তৈরির কাজ চলছে। এতে পাঁচটি বিদেশি কোম্পানির জন্য প্রস্তাবনা চূড়ান্ত হচ্ছে। যা চলতি এপ্রিলে দেওয়া হবে। আর পরবর্তী সময়ে যাচাই-বাচাইয়ের মাধ্যমে চূড়ান্ত করা হবে।

শেয়ার বিজ: কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বন্দরে জাহাজের গড় অবস্থানকাল বেড়ে যাওয়ায় লোকসানের শিকার হচ্ছেন আমদানিকারকরা থেকে উত্তরণের উপায় কী?

জুলফিকার আজিজ: বর্তমানে একটি কনটেইনার জাহাজের গড় অবস্থানকাল দুই দশমিক ছয় দিন। জাহাজের এ গড় অবস্থান কমাতে নতুন পদ্ধতি চালু করতে যাচ্ছি। এটি হলে সময় কমে ৩৬ ঘণ্টা বা দেড় দিন লাগবে। এতে বন্দরে আসা একটি জাহাজ খালি হতে ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা, আবার জাহাজ ছেড়ে যেতেও লাগে একই সময়। যদি আমদানি কনটেইনার নির্ধারিত জোনে ও রফতানি কনটেইনার নির্ধারিত জোনে রাখি, তাহলে হাতের নাগালেই সব পাব। ফলে একটি জাহাজ বন্দরে এসে ছেড়ে যেতে ২৪ ঘণ্টা সময় লাগবে। জোয়ারের সঙ্গে হিসাব কষে সেটি আমরা আরও ১২ ঘণ্টা বাড়িয়ে ৩৬ ঘণ্টা নির্ধারণ করেছি। এতে জাহাজ হ্যান্ডলিং তিন হাজার থেকে বেড়ে দ্বিগুণ হতে পারে। এর অর্থ হচ্ছে, জেটি বা টার্মিনালের সংখ্যা না বাড়িয়েই আমরা এখনকার চেয়ে দ্বিগুণ জাহাজ হ্যান্ডলিং করতে পারব।

শেয়ার বিজ: এক বছর ধরে শোনা যাচ্ছে নতুনভাবে কর্ণফুলী ড্রেজিংয়ে প্রকল্প শুরু হবে প্রকল্পটি বর্তমানে কোন অবস্থায় আছে?

জুলফিকার আজিজ: কর্ণফুলীতে ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গেছে। নৌবাহিনীর এ প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য এরই মধ্যে প্রয়োজনীয় পাইপ ও ড্রেজার নিয়ে এসেছে প্রকল্প এলাকা সদরঘাটে। এছাড়া নোটিফিকেশন অ্যাওয়ার্ড দেওয়া হয়েছে। চলতি সপ্তাহে চুক্তি হয়ে গেলে তারা দ্রুত মূল কাজ শুরু করবে বলে আশা করা যায়।

শেয়ার বিজ: বেটার্মিনাল প্রকল্পের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে বলুন

জুলফিকার আজিজ: বে-টার্মিনাল প্রকল্প বাস্তবায়নে জমি অধিগ্রহণ হচ্ছে। আর ইয়ার্ড তৈরির জন্য নকশা করা হচ্ছে। পাশাপাশি পুরো প্রকল্পের নকশা প্রণয়নে সমীক্ষা চলছে। আশা করছি ২০১৯ সালের জুনের মধ্যে হালিশহরের ‘বে-টার্মিনাল’ চালু হবে। এখানে বন্দরের ভেতর কনটেইনার ডেলিভারি, পণ্য কনটেইনারে ভর্তি (স্টাফিং) ও কনটেইনার থেকে নামানো (আনস্টাফিং) প্রক্রিয়াগুলো স্থানান্তর করতে পারব। কারণ বন্দরের ভেতর কনটেইনার ডেলিভারি, স্টাফিং ও আনস্টাফিংÑএ তিনটি কাজের কারণে বন্দরের অপারেশনাল ওয়ার্কের সময় নষ্ট হয়। আর পৃথিবীর কোনো বন্দরেই এ কাজগুলো করা হয় না। এটি বাস্তবায়ন হলে বন্দরের সক্ষমতাও বৃদ্ধি পাবে। কারণ তখন বন্দরের ভেতর প্রচুর খালি জায়গা থাকবে, যেখানে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে পণ্য ওঠানামা করানো যাবে।

শেয়ার বিজ: বন্দরের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি সংগ্রহ সম্পর্কে কিছু বলুন

জুলফিকার আজিজ: আধুনিক যন্ত্রপাতি সংযোজন করে উন্নত ও আধুনিক বন্দরের আদলে দ্রুত পণ্য ওঠানামার ব্যবস্থা করতে এক হাজার ২০০ কোটি টাকার যন্ত্রপাতি সংগ্রহের কার্যক্রম চলছে। চলতি সপ্তাহে চট্টগ্রাম বন্দরের পরিচালন কার্যক্রম পরিচালনায় প্রথমবারের মতো যুক্ত হচ্ছে রেল মাউন্টেড গ্যান্ট্রি ক্রেন (আরএমজি)। আর চলতি ২০১৮ সালের আগস্টের মধ্যেই ছয়টি কী গ্যান্ট্রি ক্রেন যোগ হবে বন্দরের যন্ত্রপাতিবহরে। বাকি চারটি আগামী এপ্রিলে যুক্ত হবে। এছাড়া বিভিন্ন ধরনের যন্ত্রপাতির মধ্যে ৪২টি কেনার জন্য চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে। এর মধ্যে কিছু যন্ত্র চলে এসেছে, আসার পথে আছে আরও বেশ কিছু। এসব যন্ত্রপাতি সংগ্রহ কার্যক্রম শেষ হলে অবশ্যই বন্দরের সক্ষমতা ও সেবা প্রদানের সুযোগ বৃদ্ধি পাবে।

শেয়ার বিজ: বন্দরের আইসিডি নীতিমালায় ২০ কিলোমিটারের মধ্যে অফডক করার কথা বলা হয়েছে অন্যদিকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বলেছে ২০ কিলোমিটারের মধ্যে করতে আইসিডিগুলোকে সরিয়ে নিতে বলা হয়েছে নিয়ে সমন্বয়হীনতা দেখা যাচ্ছে কিন্তু কেন?

জুলফিকার আজিজ: এটা নিয়ে মন্ত্রণালয় পর্যায়ে একটি কমিটি হয়েছে। আশা করি বিষয়টির সমাধান হবে।

শেয়ার বিজ: ২০২১ সালে ৬০ বিলিয়ন ডলার রফতানি আয় লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বন্দর কতটুকু সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে

জুলফিকার আজিজ: ২০২১ সালে ৬০ বিলিয়ন ডলার রফতানি আয় লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বন্দরের বিদ্যমান সক্ষমতায় শতভাগ সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারবে। যদিও বর্তমানে আমাদের জাতীয় রফতানি আয় ৩৪ দশমিক ২০ বিলিয়ন ডলার। অথচ বর্তমানে আমাদের বন্দর থেকে অর্ধেকেরও বেশি খালি কনটেইনার ফেরত যায়। ফলে এসব খালি কনটেইনার ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারলে বিদ্যমান অবকাঠামো দিয়ে এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সফল হবে। এছাড়া বর্তমানের আমাদের যেসব প্রকল্প চলমান, তা সম্পন্ন হলে আমাদের সক্ষমতা কয়েকগুণ বৃদ্ধি পাবে।

শেয়ার বিজ: দেশের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক অঞ্চল মিরসরাইয়ের পাশে সীতাকুণ্ডে নতুন একটি বন্দর নির্মাণের পরিকল্পনা কী আছে?

জুলফিকার আজিজ: দেশের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে মিরসরাইয়ে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল। এর মধ্যে এ অঞ্চল ঘিরে ব্যাপক সম্ভাবনার কারণে আশাবাদও সঞ্চয় হয়েছে। সে সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে সীতাকুণ্ড উপকূলে একটি স্বতন্ত্র বন্দর তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। বর্তমানে এটি স্থাপনের জন্য ডেনমার্কের রামবল ডেনমার্ক নামে একটি প্রতিষ্ঠান ফিজিবিলিটি স্টাডির কাজ করছে। আর ফিজিবিলিটি স্টাডি শেষে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।