২৩ হাজার মেট্রিক টন জ্বালানি তেল বিক্রির হিসাব নেই

বিপিসি ও পদ্মা মেঘনা যমুনার তথ্যে গরমিল

ইসমাইল আলী সাইফুল আলম: দেশের চাহিদা মেটাতে বিভিন্ন দেশ থেকে নিয়মিত জ্বালানি তেল আমদানি করে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। বিপণনকারী তিন কোম্পনির (পদ্মা, মেঘনা, যমুনা) মাধ্যমে এ তেল দেশব্যাপী বিক্রি করা হয়। তবে বিপিসি ও তিন কোম্পানির হিসাবে তৈরি হয়েছে বড় ধরনের গরমিল। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে প্রায় ২৩ হাজার ২৯৫ মেট্রিক টন জ্বালানি তেল বিক্রি কম দেখাচ্ছে বিপিসি। এ তেল বিক্রির কোনো হিসাব নেই। যদিও প্রত্যেক সংস্থাই নিজেদের হিসাব সঠিক বলে দাবি করছে।

এদিকে জ্বালানি তেল বিক্রির এ গরমিলের সুযোগে আয় কম দেখাচ্ছে বিপিসি। এতে সরকারের রাজস্ব আয়ে সংস্থাটির ফাঁকি দেওয়ার সুযোগ রয়েছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তবে এর দায় নিতে রাজি নয় পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত তিন কোম্পানি পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা।

বিপিসির তথ্যমতে, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে দেশে ৫৮ লাখ ৮৮ হাজার ৭৩০ মেট্রিক টন জ্বালানি তেল বিক্রি করা হয়। এর মধ্যে মেঘনা পেট্রোলিয়াম বিক্রি করেছে ২০ লাখ ৭৬ হাজার ১৪৪ মেট্রিক টন। পদ্মা অয়েলের বিক্রি ১৯ লাখ ৮৭ হাজার ৩০ ও যমুনা অয়েলের ১৬ লাখ ৬৭ হাজার ৯৫১ মেট্রিক টন। অর্থাৎ গত অর্থবছর তিন কোম্পানির জ্বালানি তেল বিক্রির পরিমাণ ছিল ৫৭ লাখ ৩১ হাজার ১২৫ মেট্রিক টন। বাকিটা অন্যান্য কোম্পানির মাধ্যমে বিক্রি করা হয়েছে।

যদিও পদ্মা, মেঘনা ও যমুনার আর্থিক প্রতিবেদনের সঙ্গে বিপিসির জ্বালানি তেল বিক্রির হিসাবের কোনো মিল নেই। কোম্পানি তিনটির বার্ষিক প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে পদ্মা অয়েলের জ্বালানি তেল বিক্রির পরিমাণ ছিল ২০ লাখ আট হাজার মেট্রিক টন। মেঘনা পেট্রোলিয়ামের বিক্রির পরিমাণ ২০ লাখ ৭৮ হাজার ও যমুনা অয়েলের ১৬ লাখ ৬৮ হাজার ৩৮৩ মেট্রিক টন। এতে গত অর্থবছর তিন কোম্পানির জ্বালানি তেল বিক্রির পরিমাণ ছিল ৫৭ লাখ ৫৪ হাজার ৪২০ মেট্রিক টন। অর্থাৎ ২৩ হাজার ২৯৫ মেট্রিক টন জ্বালানি তেল বিক্রি কম দেখিয়েছে বিপিসি।

এ বিষয়ে জানতে বিপিসির পরিচালক (বিপণন) মীর আলী রেজা শেয়ার বিজকে বলেন, হিসাবে গরমিল কিংবা লুকোচুরি কোনো বিষয় নেই। উপস্থাপিত তথ্য প্রেরণে কালগত তথ্য গ্যাপের কারণে এ পার্থক্য দেখা দিচ্ছে। যেমন আজ বাঘাবাড়ী কিংবা পার্বতীপুরে তেল বিক্রি হয়েছে, তার হিসাব পাচ্ছি একদিন পর। কিন্তু একদিন আগে তো হিসাবে তা আসেনি। এতে হিসাবে পার্থক্য দেখা দেয়। আর এ মুহূর্তে হিসাবগত সব পরিসংখ্যান আমার কাছে নেই।

বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত অর্থবছরে তিন কোম্পানির মধ্যে হিসাবের সবচেয়ে বেশি পার্থক্য হয় পদ্মা অয়েলের সঙ্গে। কোম্পানির সঙ্গে বিপিসির জ্বালানি তেল বিক্রির পার্থক্য প্রায় ২১ হাজার মেট্রিক টন। এ ছাড়া মেঘনা পেট্রোলিয়ামের সঙ্গে তেল বিক্রির পার্থক্য এক হাজার ৮৯৩ ও যমুনা অয়েলের পার্থক্য ৪৩২ মেট্রিক টন।

পার্থক্যের কারণ জানতে চাইলে পদ্মা অয়েলের কোম্পানি সচিব মহিউদ্দিন আহমেদ শেয়ার বিজকে বলেন, ‘আমাদের হিসাবের সঙ্গে বিপিসির পার্থক্য বেশিÑএটা ঠিক। তবে এ পাথর্ক্যরে কারণে বিপিসি যখন হিসাব চায়, তখন প্রথমে অনুমিত হিসাবটাই দেওয়া হয়। পরে নিরীক্ষিত হিসাবটা দেওয়া হয়। এ অনুমিত হিসাবের কারণ মূলত পার্থক্যটা দেখা যায়।

শুধু গত অর্থবছরই নয়, এর আগেও জ্বালানি তেল বিক্রির হিসাবে গরমিল দেখা গেছে বিপিসি ও বিপণনকারী তিন কোম্পানি পদ্মা, মেঘনা ও যমুনার। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে পদ্মা অয়েলের জ্বালানি তেল বিক্রির পরিমাণ ছিল ১৭ লাখ ৮৩ হাজার মেট্রিক টন। মেঘনা পেট্রোলিয়ামের বিক্রির পরিমাণ ১৭ লাখ ৯৫ হাজার ৪৯২ ও যমুনা অয়েলের ১৬ লাখ পাঁচ হাজার ৫০৬ মেট্রিক টন।

যদিও বিপিসির হিসাবে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে মেঘনা পেট্রোলিয়াম জ্বালানি তেল বিক্রি করেছে ১৭ লাখ ৯২ হাজার ৩০৭ মেট্রিক টন। পদ্মা অয়েলের বিক্রি ছিল ১৭ লাখ ৭১ হাজার ৪২৩ ও যমুনা অয়েলের ১৬ লাখ ছয় হাজার ১৩৯ মেট্রিক টন। অর্থাৎ তিন কোম্পানির জ্বালানি তেল বিক্রির পরিমাণ ৫১ লাখ ৬৯ হাজার ৮৬৯ মেট্রিক টন। যদিও বিপিসির হিসাবের সঙ্গে এক্ষেত্রে পার্থক্য ১৪ হাজার ১২৯ মেট্রিক টন।

এদিকে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে দেশে ৫৩ লাখ ২১ হাজার ৪২৩ মেট্রিক টন জ্বালানি তেল বিক্রি করা হয়। এর মধ্যে মেঘনা পেট্রোলিয়ামের বিক্রি করেছে ১৮ লাখ এক হাজার ২৭৯ মেট্রিক টন। পদ্মা অয়েলের বিক্রি ছিল ১৭ লাখ ৯৪ হাজার ১৫২ মেট্রিক টন, যমুনা অয়েল লিমিটেডের ১৬ লাখ ২৪ হাজার ৯৫০ মেট্রিক টন। অর্থাৎ ২০১৪-১৫ অর্থবছর তিন কোম্পানির জ্বালানি তেল বিক্রির পরিমাণ ছিল ৫২ লাখ ২০ হাজার ৩৮১ মেট্রিক টন।

২০১৪-১৫ অর্থবছরে পদ্মা অয়েলের জ্বালানি তেল বিক্রির পরিমাণ ছিল ১৭ লাখ ৮৯ হাজার মেট্রিক টন, মেঘনা পেট্রোলিয়ামের ১৮ লাখ আট হাজার ৭৩৫ ও যমুনা অয়েলের ১৬ লাখ ৩৪ হাজার ৪৮১ মেট্রিক টন। এতে ওই অর্থবছর তিন কোম্পানির তেল বিক্রির পরিমাণ দাঁড়ায় ৫২ লাখ ৩২ হাজার ২১৬ মেট্রিক টন। অর্থাৎ তিন কোম্পানির বিক্রি প্রায় ১২ হাজার মেট্রিক টন কম দেখানো হয়েছে।

জানতে চাইলে মেঘনা পেট্রোলিয়ামের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, মেঘনা পেট্রোলিয়াম দেশের সর্ববৃহৎ তেল বিপণনকারী কোম্পানি। এ ছাড়া তালিকাভুক্ত হওয়ায় প্রতি বছর মেঘনা পেট্রোলিয়ামের হিসাব বেসরকারি দুটি কোম্পানি দ্বারা নিরীক্ষা (অডিট) করাতে হয়। এতে প্রতি লিটার তেল বিক্রির হিসাব দিতে হয় অডিট কোম্পানিগুলোকে। তাই মেঘনা পেট্রোলিয়ামের হিসাবে ফাঁকি দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। একই অবস্থা তালিকাভুক্ত অপর দুই প্রতিষ্ঠান পদ্মা ও যমুনা অয়েলের। এক্ষেত্রে হিসাবে গরমিল থাকলে তার দায়দায়িত্ব বিপিসির।

এ ধরনের পরিস্থিতি তেল বিক্রিতে চুরি, রাষ্ট্র ও জনগণকে ধোঁকা দেওয়ার সুযোগ তৈরি করে বলে মনে করেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ক্যাবের উপদেষ্টা ড. শামসুল আলম। তিনি বলেন, বিপিসির হিসাবে গরমিল রয়েছে বলে বহু আগে থেকেই দাবি জানানো হয়েছে। এ জন্য বিভিন্ন সময় বিপিসির হিসাবে আন্তর্জাতিক অডিটের শর্ত তোলে দাতা সংস্থাগুলো। যদিও তা করা হয়নি। তাই জ্বালানি তেল বিক্রির হিসাবে বিপিসি ও তিন কোম্পানির ভিন্নতা নিয়ে সন্দেহ জাগা স্বাভাবিক। এতে রাষ্ট্র তার আয় ও সম্পদ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।