৩৬ শতাংশ বাড়তি ব্যয়ে ৭০টি মিটারগেজ ইঞ্জিন কিনছে রেল

চুক্তি সই আজ

নিজস্ব প্রতিবেদক: যাত্রীচাহিদা মেটাতে অবশেষে ৭০টি মিটারগেজ ইঞ্জিন কিনছে রেলওয়ে। কোরিয়ার হুন্দাই রোটেম থেকে ইঞ্জিনগুলো কেনায় ব্যয় হবে দুই হাজার ৬৫৬ কোটি টাকা, যদিও এ মূল্য প্রকল্প ব্যয়ের চেয়ে সাড়ে ৩৬ শতাংশ বেশি। আবার সরবরাহকারীর ঋণে (সাপ্লায়ার্স ক্রেডিট) ইঞ্জিনগুলো কেনায় অর্থায়নের ব্যবস্থাও করছে হুন্দাই রোটেম। এজন্য উচ্চ সুদে ঋণও নিতে হচ্ছে।
ইঞ্জিনগুলো কেনায় হুন্দাই রোটেম কোম্পানির সঙ্গে আজ চুক্তি সই করবে রেলওয়ে, যদিও এ কোম্পানিটি দ্বিতীয় সর্বনিম্ন  দরদাতা। এদিকে ২০১৫ সালে সারা দেশে মিটারগেজ রেলপথ পর্যায়ক্রমে বন্ধ করে দেওয়ার নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী। এর পরিপ্রেক্ষিতে নতুন কোনো মিটারগেজ রেলপথ নির্মাণ করা হচ্ছে না। বিদ্যমান মিটারগেজ রেলপথগুলোও পর্যায়ক্রমে ডুয়েলগেজে রূপান্তর করা হচ্ছে। তাই ৭০টি মিটারগেজ ইঞ্জিন কেনার উদ্যোগ নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
তথ্যমতে, রেলওয়ের চাহিদা মেটাতে ২০১১ সালে ৭০টি মিটারগেজ ইঞ্জিন কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর মধ্যে ৩০টি সম্পূর্ণ অবস্থায়, ২৫টি অর্ধেক খোলা ও ১৫টি সম্পূর্ণ খোলা অবস্থায় আনা হবে। এক্ষেত্রে অর্ধেক ও সম্পূর্ণ খোলা ইঞ্জিনগুলো দেশে এনে ওয়ার্কশপে সংযোজন করা হবে। এজন্য তিন দফা দরপত্র আহ্বান করা হয়। তবে উপযুক্ত প্রস্তাব না পাওয়ার প্রথম দুবার দরপত্র বাতিল করা হয়।
৭০টি ইঞ্জিন কেনায় সর্বশেষ ২০১৫ সালে আহ্বানকৃত দরপত্রে পাঁচটি প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়। এর মধ্যে দক্ষিণ কোরিয়ার হুন্দাই রোটেম ও স্পেনের ভসলো এসপানা কারিগরিভাবে যোগ্য বিবেচিত হয়। এদের আর্থিক প্রস্তাবনা যাচাই করে দেখা যায়, ইঞ্জিনগুলোর জন্য হুন্দাই রোটেম দর প্রস্তাব করেছে প্রায় ২৩ কোটি ৬২ লাখ ডলার বা এক হাজার ৮৩৭ কোটি এক লাখ টাকা। আর ভসলো এসপানা প্রস্তাব করে ২১ কোটি ৪৭ লাখ ইউরো বা এক হাজার ৮৩৫ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। অর্থাৎ সর্বনিম্ন দরদাতা ভসলো এসপানা।
এদিকে ২০১৫ সালে দরপত্র আহ্বানের সময় ইঞ্জিনগুলোর দাফতরিক মূল্য প্রাক্কলন করা হয় এক হাজার ৫১৬ কোটি ২২ লাখ টাকা। অর্থাৎ দাফতরিক মূল্যের চেয়ে সর্বনিম্ন দরদাতা ৩২০ কোটি ৭৯ লাখ টাকা বা ২১ দশমিক ১৫ শতাংশ বেশি দাম প্রস্তাব করে। এরই মধ্যে সর্বনিম্ন দরদাতা ভসলো এসপানার নাম পরিবর্তিত হয়ে স্ট্যাডলার রেল ভ্যালেন্সিয়া হয়েছে। গত বছর ১৭ ডিসেম্বর নাম পরিবর্তনের প্রামাণিক দলিল রেলপথ মন্ত্রণালয় থেকে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগে (ইআরডি) পাঠানো হয়। পরে এ বিষয়ে সিপিটিইউ, রেলওয়ে ও রেলপথ মন্ত্রণালয়ে এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। আর ৭ ফেব্রুয়ারি প্রস্তাবটি ক্রয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে পাঠানো হয়।
যদিও নাম পরিবর্তনের প্রস্তাবের বিষয়টি গ্রহণ না করে ফেরত পাঠায় ক্রয় কমিটি। এক্ষেত্রে দ্বিতীয় সর্বনিম্ন দরদাতাকে কাজটি দেওয়ার জন্য সুপারিশ করা হয়। এরই মধ্যে ডলারের বিনিময় হার পরিবর্তন হওয়ায় ৭০টি ইঞ্জিন কেনায় ভ্যাট-শুল্ক ছাড়া দাম পড়বে এক হাজার ৯০৬ কোটি ৩৮ লাখ টাকা। আর ভ্যাট-শুল্কসহ ইঞ্জিনগুলো কেনায় ব্যয় পড়ছে দুই হাজার ৬৫৬ কোটি টাকা। অথচ প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছিল এক হাজার ৯৪৬ কোটি টাকা। এ হিসাবে ৭০ ইঞ্জিন কেনায় ব্যয় বেশি পড়ছে ৭১০ কোটি টাকা।
জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক আবদুল মতিন চৌধুরী শেয়ার বিজকে বলেন, সর্বনিম্ন দরদাতা কোম্পানির নাম পরিবর্তন হওয়ায় তাতে আপত্তি তোলে ক্রয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি ও সিপিটিইউ। তাদের সুপারিশ ক্রমে দ্বিতীয় সর্বনিম্ন দরদাতার কাছ থেকে ইঞ্জিনগুলো কেনা হচ্ছে। এটি রেলওয়ের কোনো সিদ্ধান্ত নয়।
সূত্র জানায়, ৭০টি ইঞ্জিনের মধ্যে আংশিক ও সম্পূর্ণ খোলা ইঞ্জিনগুলো পাবর্তীপুরের কেন্দ্রীয় লোকোমোটিভ কারখানায় সংযোজন করা হবে। এজন্য দাম কিছুটা কম পড়বে বলে ধরা হয়েছিল। যদিও রেলওয়ে এর আগে আংশিক বা সম্পূর্ণ খোলা ইঞ্জিন ক্রয় করেনি। এ কারণে ডিপিপিতে অনুমাননির্ভর মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে পূর্ণাঙ্গ ও খোলা ইঞ্জিনের দাম প্রায় কাছাকাছি প্রস্তাব করেছে হুন্দাই রোটেম।
পূর্ণাঙ্গ ইঞ্জিনের এককপ্রতি দাম ধরা হয়েছিল ২২ কোটি টাকা, আংশিক খোলা ১৫ কোটি ৬০ লাখ ও সম্পূর্ণ খোলা ইঞ্জিনের দাম ১৪ কোটি টাকা ধরা হয়। তবে হুন্দাই রোটেম এসব ইঞ্জিনের এককপ্রতি দাম প্রস্তাব করে যথাক্রমে ৩৩ লাখ ৯৫ হাজার ডলার (২৮ কোটি ৫২ লাখ টাকা), ৩২ লাখ ডলার (২৬ কোটি ৮৮ লাখ টাকা) ও ৩১ লাখ ৮৪ হাজার ডলার (২৬ কোটি ৭৫ লাখ টাকা)। আর ইঞ্জিনগুলো কেনার জন্য নেওয়া হবে কঠিন শর্তের ঋণ। এজন্য গুনতে হবে উচ্চ হারে সুদ।
উল্লেখ্য, ২০১১ সালে গৃহীত প্রকল্পটি ২০১৭ সালে শেষ করার কথা ছিল। তবে প্রকল্পটির মেয়াদ আরও ছয় বছর বাড়িয়ে ২০২৩ সাল পর্যন্ত প্রস্তাব করা হয়েছে। যদিও মিটারগেজ রেলপথ ক্রমেই বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্তের পর প্রকল্পটির গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকেই।