৪৭ শতাংশ কল ড্রপই গ্রামীণফোন গ্রাহকের

এক বছরে কল ড্রপ ২২২ কোটি মিনিট

হামিদুর রহমান: গত এক বছরে মোবাইল ফোন অপারেটরগুলোর কল ড্রপ হয়েছে ২২২ কোটি ১৫ লাখ মিনিট। এর মধ্যে গ্রাহকদের একের অধিক কল ড্রপ হয়েছে ৬৯ কোটি ৩৮ লাখ মিনিট, যদিও ফেরত দেওয়া হয়েছে মাত্র ২২ কোটি ছয় লাখ মিনিট। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি কল ড্রপ হচ্ছে দেশের বহুজাতিক মোবাইল ফোন অপারেটর গ্রামীণফোনের। মোট কল ড্রপের প্রায় ৪৭ শতাংশই এ অপারেটরের গ্রাহকদের।
এদিকে কল ড্রপের ব্যাখ্যা চেয়ে অপারেটরদের চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ সংস্থা (বিটিআরসি)। গতকাল অপারেটরদের পাঠানো এ চিঠিতে আগামী পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে কল ড্রপের বিষয়ে ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে।
বিটিআরসির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন অপারেটরের মোট কল ড্রপ হয়েছে ২২২ কোটি ১৫ লাখ মিনিট। এর মধ্যে গ্রামীণফোন গ্রাহকদের মোট কল ড্রপ হয়েছে ১০৩ কোটি ৪৩ লাখ মিনিট। অর্থাৎ এক বছরে কল ড্রপের ৪৬ দশমিক ৫৬ শতাংশই গ্রামীণফোনের। এর মধ্যে একের অধিক কল ড্রপ হয়েছে ২৭ কোটি ৭৭ লাখ। আর প্রতিষ্ঠানটি ফেরত দিয়েছে ১০ কোটি ৩০ লাখ মিনিট।
জানতে চাইলে গ্রামীণফোনের এক্সটার্নাল কমিউনিকেশন বিভাগের প্রধান সৈয়দ তালাত কামাল এক মেইল বার্তায় শেয়ার বিজকে জানান, ‘রেডিও প্রযুক্তিনির্ভর মোবাইল সেবায় কল ড্রপ একটি স্বাভাবিক উপসর্গ।
গ্রামীণফোনের নেটওয়ার্কে কল ড্রপের পরিমাণ সব সময়ই বিটিআরসি ও আন্তর্জাতিক নির্ধারিত মানদণ্ডের অনেক নিচে রয়েছে। গ্রাহকসংখ্যার বিচারে গ্রামীণফোনের কল ড্রপের পরিমাণ অন্যান্য অপারেটরের তুলনায় অনেক কমই রয়েছে। গ্রাহকদের অসুবিধার কথা বিবেচনা করে গ্রামীণফোন গ্রাহকদের কল ড্রপের ক্ষতিপূরণ দিয়ে থাকে।’
যদিও গত রোববার জাতীয় সংসদ অধিবেশনে মোবাইল ফোন অপারেটর গ্রামীণফোনের কল ড্রপ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ। তিনি বলেন, ‘ইদানীং লক্ষ করলে দেখা যাবে আমরা যারা গ্রামীণফোন ব্যবহার করি, প্রত্যেকটি কলে কল ড্রপ হয়। একেকটি কলে তিন, চার, পাঁচবার ড্রপ হয়। এজন্য বারবার কল করতে হয়।’
বিদেশে একটা কল করছি, হঠাৎ কলটা ড্রপ করল। আমাদের রোমিং টেলিফোন আছে, দেশের বাইরে যাই, সেখানে একটা কল ড্রপ করলে আবার কল করতে হয়। এই কল ড্রপের পেছনে ব্যবসায়িক স্বার্থ জড়িত রয়েছে বলে মনে করেন তোফায়েল।
তিনি আরও বলেন, রবি আছে, অন্যান্য ফোন আছেÑগ্রামীণফোনের মতো এ রকম অন্যায় করে ব্যবসা করে লাভ করা, এটা কিন্তু সঠিক হয় না। এটা বাস্তবসম্মত নয়। বিষয়টি গ্রামীণফোনকে জানিয়েও সমস্যা সমাধান না হওয়ায় টেলিযোগাযোগমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন বাণিজ্যমন্ত্রী।
এদিকে বাণিজ্যমন্ত্রী সংসদে ক্ষোভ প্রকাশের পরদিন বিটিআরসি বিষয়টি নিয়ে অপারেটরগুলোকে চিঠি দিয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ‘সাম্প্রতিক সময়ে মোবাইল অপারেটরদের কল ড্রপ-সংক্রান্ত অভিযোগ অব্যাহতভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে চলমান জাতীয় সংসদেও আলোচনা হয়েছে। দিন দিন টেলিযোগাযোগ সেবার মান নিয়ে জনসাধারণের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং সেবার মান নিয়ন্ত্রণ বর্তমানে বিটিআরসির একটি অগ্রাধিকারযোগ্য কার্যক্রম। বিটিআরসি এরই মধ্যে ড্রাইভ টেস্টের মাধ্যমে বিভিন্ন অপারেটরের সেবার মান নিয়মিত পরিমাপ করছে। গ্রাহকস্বার্থের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে কল ড্রপের পরিমাণ বিটিআরসি কর্তৃক নির্ধারিত সীমার (দুই শতাংশ) মধ্যে থাকা আবশ্যক। অপারেটরদের দাখিল করা মাসিক রিপোর্টে তাদের কল ড্রপ নির্ধারিত সীমার মধ্যেই আছে বলে দাবি করলেও সম্প্রতি এ বিষয়ে গ্রাহকপর্যায়ে অনেক অভিযোগ আছে। এছাড়া কোনো কোনো অপারেটরের নেটওয়ার্কে একটি কলে চার থেকে পাঁচবার কল ড্রপ হয় বলে অভিযোগ রয়েছে, যা বাস্তবসম্মত নয়।’
বিটিআরসির তথ্যমতে, কল ড্রপের তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে রবি আজিয়াটা। অপারেটরটির গ্রাহকদের এ বছরে কল ড্রপ হয়েছে ৭৬ কোটি ১৮ লাখ মিনিট বা ৩৪ দশমিক ২৯ শতাংশ। এর মধ্যে একের অধিক কল ড্রপ হয়েছে ২৪ কোটি ৪৭ লাখ। আর রবি আজিয়াটা তার গ্রাহকদের ফেরত দিয়েছে ছয় কোটি ৮২ লাখ মিনিট।
বাংলালিংক ব্যবহারকারী গ্রাহকদের কল ড্রপ হয়েছে ৩৬ কোটি ৫৪ লাখ মিনিট। এর মধ্যে একের অধিক কল ড্রপ হয়েছে ১৭ কোটি ১৪ লাখ মিনিট। এর মধ্যে প্রতিষ্ঠানটি ফেরত দিয়েছে চার কোটি ৯৪ লাখ মিনিট। এছাড়া রাষ্ট্রায়ত্ত মোবাইল ফোন অপারেটর টেলিটকে কল ড্রপ হয়েছে ছয় কোটি। তবে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান টেলিটকে গ্রাহকদের কল ড্রপ গ্রাহকদের ফেরত দেওয়া হয় না।
বিটিআরসির বর্তমান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জহুরুল ইসলাম শেয়ার বিজকে বলেন, ‘গ্রাহকদের সেবার মান বাড়াতে কোয়ালিটি অব সার্ভিস (কিউওএস) নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে। নতুন এই নীতিমালা অনুযায়ী মোবাইল ফোন অপারেটরগুলোর নেটওয়ার্ক ও দুর্বল নেটওয়ার্ক কাভারেজ, ইন্টারনেটের উচ্চমূল্য, ভয়েস কলের নি¤œমান এবং গ্রাহকসেবার অসন্তুষ্টি দূর করা হবে। মোবাইলে কথা বলার (ভয়েস কল) সময় কল ড্রপের হার হতে হবে দুই শতাংশের কম। কোনো অপারেটর নীতিমালা উপেক্ষা করলে তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। আশা করছি এই সেবাটি চালু হলে গ্রাহকদের মানসম্মত সেবা প্রদান করা যাবে।’
উল্লেখ্য, গ্রাহক বিবেচনায় গ্রামীণফোনের সংযোগ রয়েছে সাত কোটি সাত লাখ ও রবির চার কোটি ৬১ লাখ সংযোগ। এছাড়া বাংলালিংকের সংযোগ রয়েছে তিন কোটি ৩৪ লাখ ও রাষ্ট্রায়ত্ত মোবাইল ফোন অপারেটর টেলিটকের সংযোগ রয়েছে ৩৮ লাখ ৭৩ হাজার।