৭৪ শতাংশ ঋণের জোগান দিচ্ছে বেসরকারি ব্যাংক

সোহেল রহমান : একটা সময় ছিল যখন দেশে ব্যাংকঋণের একমাত্র এবং পরবর্তী সময়ে প্রধান জোগানদাতা ছিল রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক। সেই চিত্র এখন আর নেই। বর্তমানে দেশের ব্যাংক খাতে ঋণ বিতরণের প্রধান নিয়ামক হয়ে উঠেছে বেসরকারি ব্যাংকগুলো। গ্রাহক বা ঋণগ্রহীতার সংখ্যায় অনেক পিছিয়ে থাকলেও বর্তমানে ব্যাংক খাতের ৭৪ শতাংশ ঋণ বিতরণ করছে বেসরকারি বাণিজ্যিক ও ইসলামি ব্যাংকগুলো। এর বিপরীতে ঋণগ্রহীতার

সংখ্যা হচ্ছে মোট ঋণগ্রহীতার মাত্র ২৮ শতাংশ। অন্যদিকে প্রায় সমসংখ্যক গ্রাহককে ঋণ দিয়েও মোট ঋণপ্রবাহের মাত্র ১৯ শতাংশ হচ্ছে রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত বছর (২০১৬) দেশের ব্যাংক খাতে মোট বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ছিল ছয় লাখ ৬৮ হাজার ৬৫৬ কোটি টাকা। আর এর বিপরীতে মোট ঋণগ্রহীতার সংখ্যা হচ্ছে এক কোটি এক লাখ ৩৯ হাজার ৬১৭ জন। এর মধ্যে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণের পরিমাণ ও ঋণগ্রহীতার সংখ্যা হচ্ছে যথাক্রমে ৫০ দশমিক ৬৫ শতাংশ ও ১৩ দশমিক ৯০ শতাংশ এবং ইসলামি ব্যাংকগুলোয় এ হার হচ্ছে যথাক্রমে ২৩ দশমিক ৩৭ শতাংশ ও ১৪ দশমিক ১৮ শতাংশ। অন্যদিকে রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণের পরিমাণ ও ঋণগ্রহীতার সংখ্যা হচ্ছে যথাক্রমে ১৯ দশমিক ১১ শতাংশ ও ২৮ দশমিক ৭৮ শতাংশ এবং বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোতে এ হার হচ্ছে যথাক্রমে তিন দশমিক ৪৫ শতাংশ ও ৪১ দশমিক ৪৯ শতাংশ। এছাড়া বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোয় ঋণ বিতরণের পরিমাণ ও ঋণগ্রহীতার সংখ্যা হচ্ছে যথাক্রমে তিন দশমিক ৪২ শতাংশ ও এক দশমিক ৬৫ শতাংশ।

অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে, রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ইসলামি ব্যাংকগুলোর চেয়েও কম। অন্যদিকে ইসলামি ব্যাংকগুলোয় ঋণগ্রহীতার সংখ্যা সাধারণ বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর তুলনায় বেশি। আর সবচেয়ে বেশি ঋণগ্রহীতা হচ্ছে রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকে। মূলত কৃষিঋণ বিতরণের কারণেই বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোতে ঋণগ্রহীতার সংখ্যা বেশি বলে মনে করছেন ব্যাংকাররা।

যদি পেছন ফিরে তাকাই, তিন দশক আগে ১৯৮৫ সালে দেশের ব্যাংক খাতে মোট বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ছিল ১০ হাজার ১৪৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৮১ শতাংশেরও বেশি ঋণ ছিল রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর। এর মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ছিল ৫৮ দশমিক ২৬ শতাংশ এবং বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর ছিল ২২ দশমিক ৯৪ শতাংশ। অন্যদিকে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক ও বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ছিল যথাক্রমে ১৩ দশমিক ৫০ শতাংশ ও ৫ দশমিক ২৮ শতাংশ।

কিন্তু পরবর্তী সময়ে প্রথম (১৯৯৫), দ্বিতীয় (২০০৫) ও তৃতীয় দশকে (২০১৫) রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে ঋণ বিতরণের হার কমে দাঁড়ায় যথাক্রমে ৫২ দশমিক ৩৬ শতাংশ, ৩৫ দশমিক ২৫ শতাংশ ও ১৯ দশমিক ৬৯ শতাংশে। অর্থাৎ তিন দশকে রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণের হার কমেছে প্রায় ৩৮ শতাংশ। একই সঙ্গে রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোতেও ঋণ বিতরণের হার কমেছে প্রায় ১৯ শতাংশ। অন্যদিকে আলোচ্য সময়ে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোয় (ইসলামি ব্যাংকগুলোসহ) ঋণ বিতরণের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে যথাক্রমে ২৫ দশমিক ১৩ শতাংশ, ৪৯ শতাংশ ও ৭২ দশমিক ৪৮ শতাংশ। অর্থাৎ তিন দশকে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে (ইসলামি ব্যাংকগুলোসহ) ঋণ বিতরণের হার বেড়েছে ৫৯ শতাংশ।

অন্যদিকে ১৯৮৫ সালে দেশের ব্যাংক খাতে মোট ঋণগ্রহীতার সংখ্যা ছিল ৬৫ লাখ ৮৩ হাজার ১০৫ জন। এর মধ্যে প্রায় ৯৬ শতাংশ ঋণগ্রহীতাই ছিলেন রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর। এর মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংক ও রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোতে ঋণগ্রহীতার হার ছিল যথাক্রমে ৪৭ দশমিক ৫২ শতাংশ ও ৪৮ দশমিক ১২ শতাংশ। বাকিগুলোর মধ্যে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক ও বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে ঋণগ্রহীতার হার ছিল যথাক্রমে মাত্র চার দশমিক ৩০ শতাংশ ও দশমিক শূন্য পাঁচ শতাংশ।

কিন্তু পরে ২০১০ সালে রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোয় ঋণগ্রহীতার হার প্রায় ১৪ শতাংশ কমে যায়। আলোচ্য বছরে রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোয় ঋণগ্রহীতার হার ছিল ৩৩ দশমিক ১৪ শতাংশ। এরপর ২০১৫ সালে এ হার আরও কমে দাঁড়ায় ২৯ দশমিক ২৫ শতাংশে। অন্যদিকে গত তিন দশকে বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোয় ঋণগ্রহীতার হার সামান্যই কমেছে। ২০১৫ সালে এটা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৩ শতাংশে। আর বেসরকারি ব্যাংকগুলোয় আশির দশকের শেষ সময় থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত ঋণগ্রহীতার হার কমে যায়। ২০০৫ সালের পর এসব ব্যাংকে ঋণগ্রহীতার হার বাড়তে থাকে। ২০১৫ সালে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোয় (ইসলামি ব্যাংকগুলোসহ) ঋণগ্রহীতার হার বেড়ে দাঁড়ায় ২৬ শতাংশের বেশি। বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে এ হার দাঁড়ায় এক দশমিক ৭৬ শতাংশে।

অন্যদিকে সাম্প্রতিক সময়ে দেশের ব্যাংক খাতে আমানতের চেয়ে ঋণ বিতরণে প্রবৃদ্ধির হার বাড়লেও সার্বিকভাবে এ খাতে আমানতের পরিমাণ বরাবরই বেশি। গত বছর (২০১৬) দেশের ব্যাংক খাতে মোট আমানতের পরিমাণ ছিল আট লাখ ৯৯ হাজার ৪১৪ কোটি টাকা। এর বিপরীতে মোট ঋণ বিতরণ করা হয়েছে ছয় লাখ ৬৮ হাজার ৬৫৬ কোটি টাকা। গত ২০১৪ সালে ব্যাংক খাতে আমানত ও ঋণ বিতরণের প্রবৃদ্ধির হার ছিল যথাক্রমে ১৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ ও ১০ দশমিক ৬৮ শতাংশ। সর্বশেষ ২০১৬ সালে আমানতে প্রবৃদ্ধির হার কমে দাঁড়িয়েছে ১৩ দশমিক ১২ শতাংশ এবং ঋণ বিতরণে প্রবৃদ্ধির হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩ দশমিক ৯ শতাংশ।