৭৬ কোটি টাকার ভ্যাট ফাঁকি রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা আরজেএসসির

রহমত রহমান: যৌথ মূলধন কোম্পানি ও ফার্মসমূহের নিবন্ধকের কার্যালয়ের (আরজেএসসি) বিরুদ্ধে প্রায় ৭৬ কোটি টাকার মূল্য সংযোজন কর (মূসক বা ভ্যাট) ফাঁকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। প্রতিষ্ঠানটি নিবন্ধন সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে ভ্যাট আদায় করলেও তা পরিশোধ না করে ২০১৪ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত এ বিপুল পরিমাণ ভ্যাট ফাঁকি দিয়েছে। সম্প্রতি প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে মামলা করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) আওতাধীন কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট, ঢাকা (দক্ষিণ)। বকেয়া আদায়ে সম্প্রতি প্রতিষ্ঠানটির নিবন্ধক (রেজিস্ট্রার) বরাবর চূড়ান্ত দাবিনামা জারি করেছে এনবিআর। এনবিআর সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
সূত্র জানায়, যৌথ মূলধন কোম্পানি ও ফার্মসমূহের নিবন্ধকের কার্যালয় নামে সরকারি প্রতিষ্ঠানটি প্রাইভেট ও পাবলিক কোম্পানি নিবন্ধন, সোসাইটি নিবন্ধন, পার্টনারশিপ ফার্ম, ট্রেড অর্গানাইজেশন হতে নাম ক্লিয়ারেন্স ফি, রেজিস্ট্রেশন ফি, রিটার্ন ফাইলিং ফি, সার্টিফাইড কপি ইস্যু ফি, এনসি সময় এক্সটেনশন ফি, উইন্ডিং ফি ও সাধারণ আবেদন ফি বাবদ অর্থ আদায় করে থাকে। সরকারি প্রতিষ্ঠানটি কোম্পানি আইন, ১৯৯৪, ট্রেড অর্গানাইজেশনস অর্ডিন্যান্স ১৯৬১, অংশীদারি কারবার আইন ১৯৩২ এবং সোসাইটিজ রেজিস্ট্রেশন অ্যাক্ট ১৯৮০ অনুযায়ী এসব ফি আদায় করে আসছে। এসব সেবার বিপরীতে প্রতিষ্ঠানটি উৎসে ভ্যাট আদায় করছে না প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ উঠে।
মূল্য সংযোজন কর আইন ও বিধি অনুযায়ী সরকারি-আধাসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স, রেজিস্ট্রেশন, পারমিট প্রদান বা নবায়নের সময় ১৫ শতাংশ হারে উৎসে ভ্যাট কর্তন করার বিধান রয়েছে। সে অনুযায়ী আরজেএসসির সেবা প্রদানের বিপরীতে উৎসে ভ্যাট কর্তনের জন্য মৌখিকভাবে অনুরোধ ও একাধিকবার চিঠি দেয় এনবিআর। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি উৎসে ভ্যাট কর্তন বা পরিশোধ করেনি। পরে প্রতিষ্ঠানটির ২০১৪-১৫ অর্থবছর থেকে চলতি অর্থবছরের মার্চ পর্যন্ত কাগজপত্র পর্যালোচনা করা হয়।
এতে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটি এ চার বছরে ৫০৮ কোটি ১৪ লাখ টাকার সেবা প্রদানের বিপরীতে ৭৬ কোটি ২২ লাখ টাকার ভ্যাট ফাঁকি দিয়েছে যা প্রতিবেদনে উঠে আসে। এর মধ্যে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ১০৮ কোটি ৯৬ লাখ টাকার সেবার বিপরীতে ১৬ কোটি ৩৪ লাখ টাকা, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ১৫২ কোটি ৭২ লাখ টাকার সেবার বিপরীতে ২২ কোটি ৯ লাখ টাকা, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ২১২ কোটি ৭ লাখ টাকার সেবার বিপরীতে ৩১ কোটি ৮১ লাখ টাকা, ২০১৭-১৮ অর্থবছর ৩৪ কোটি ৩৮ লাখ টাকার সেবার বিপরীতে পাঁচ কোটি ১৫ লাখ টাকার ভ্যাট ফাঁকি দিয়েছে। ভ্যাট ফাঁকির অভিযোগে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। পরে গত বছরের ২৬ সেপ্টেম্বর প্রতিষ্ঠানটিকে দাবিনামা জারি ও কারণ দর্শানোর নোটিস দেওয়া হয়। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটির পক্ষে কোনো ধরনের জবাব বা কোনো কর্মকর্তা শুনানিতে হাজির হয়নি। সম্প্রতি চূড়ান্ত দাবিনামা জারি করা হয়। চূড়ান্ত দাবিনামা অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটি ৭৬ কোটি ২২ লাখ টাকার উৎসে ভ্যাট ও সুদ ৩০ কোটি ৪০ লাখ টাকাসহ মোট ১০৬ কোটি ৬২ লাখ টাকা বকেয়া পরিশোধ না করে ফাঁকি দিয়েছে। এ বকেয়া জমা না দিলে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়। প্রতিষ্ঠানটি ২০১৪-১৫ অর্থবছর থেকে রাজস্ব দেওয়া শুরু করে। কিন্তু সেবার বিপরীতে কোন ভ্যাট কর্তন করত না।
আরজেএসসির সূত্রে জানা যায়, প্রতিষ্ঠানটি ২০১৪-১৫ অর্থবছর ১০৮ কোটি ৯৬ লাখ, ২০১৫-১৬ অর্থবছর ১৫২ কোটি ৭২ লাখ, ২০১৬-১৭ অর্থবছর ২১২ কোটি ৭ লাখ এবং চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত ১৫৩ কোটি ৪৭ লাখ টাকার রাজস্ব আদায় করে। তবে চলতি অর্থবছরের মার্চ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি পাঁচ কোটি ৭৬ লাখ টাকার ভ্যাট আদায় করেছে। আরজেএসসির পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি, প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি, বিদেশি কোম্পানি, অংশীদারি ফার্ম, ট্রেড অর্গানাইজেশন ও সোসাইটি নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বর্তমানে দুই লাখ ১৬ হাজার ৬২৩টি। এর মধ্যে ২০১৪-১৫ অর্থবছর থেকে ২০১৭-১৮ অর্থবছরের মার্চ পর্যন্ত নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা সাত হাজার ৬৬৩টি।
এ বিষয়ে কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট, ঢাকা (দক্ষিণ) এর কমিশনার কাজী মোস্তাফিজুর রহমান শেয়ার বিজকে বলেন, আইন অনুযায়ী সেবার বিপরীতে উৎসে ভ্যাট কর্তনের জন্য আমরা মৌখিকভাবে বলেছি, চিঠি দিয়েছি। কিন্তু কোন জবাব দেয়নি। পরে আমরা মামলা করি। শুনানিতে তারা অংশ নেয়নি। আমরা চূড়ান্ত দাবিনামা জারি করেছি। মন্ত্রণালয় থেকে এনে হলেও তারা টাকা দিতে হবে। মামলা করার পর এখন প্রতি মাসে আরজেএসসি প্রায় দুই কোটি টাকার বেশি ভ্যাট দিচ্ছে বলে জানান তিনি।
এ বিষয়ে আরজেএসসির নিবন্ধক রুহিদাস জদ্দারের যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তাকে পাওয়া যায়নি। পরে আরজেএসসির উপ-নিবন্ধক আবু ইসা মোহাম্মদ মোস্তফা ভূঁইয়া শেয়ার বিজকে বলেন, ‘এনবিআর রাজস্ব আদায় করে আমরাও রাজস্ব আদায় করি। এনবিআর ৭৬ কোটি টাকা ফাঁকির কথা বলছে। আমরা কিভাবে ফাঁকি দেব।’ ভ্যাট ফাঁকির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এতদিন আমরা সেবার ওপর ভ্যাট নিতাম না। এনবিআর থেকে চিঠি দেওয়ার পর আমরা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেই। পরে গত বছর মন্ত্রণালয় থেকে আদেশ জারির পর ভ্যাট কর্তন করা হয়। তবে এ ভ্যাট যৌক্তিক নয়। আমরা তা প্রত্যাহারের জন্য চিঠি দেব। আশা করি প্রত্যাহার হয়ে যাবে।’