মত-বিশ্লেষণ

বাঙালির বর্ষবরণ

কাজী সালমা সুলতানা: বছর ঘুরে আবারও এলো বৈশাখ। বঙ্গাব্দ ১৪২৬। বাঙালির সর্বশ্রেষ্ঠ উৎসবের দিন, নতুন বছরের নতুন আনন্দে জেগে ওঠার দিন। পুরানো গ্লানিকে মুছে ফেলার দিন। চারিদিকে আয়োজন চলছে নতুন বছরকে বরণ করার।
বাঙালির সর্বজনীন উৎসব পহেলা বৈশাখ। এদিন আনন্দঘন পরিবেশে বরণ কওে নেওয়া হয় নতুন বছরকে। অতীতের ভুলত্রুটি ও ব্যর্থতার গ্লানি ভুলে সুখ-শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনায় উদযাপিত হয় দিনটি। এক সময় নববর্ষ পালন করা হতো ঋতুধর্মী উৎসব হিসেবে। তখন এর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল কৃষির। কারণ আমাদের দেশে কৃষিকাজ ছিল পুরোপুরি ঋতুনির্ভর। এই কৃষিকাজের সুবিধার্থেই মুগল সম্রাট আকবর ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দের ১০/১১ মার্চ বাংলা সন প্রবর্তন করেন। এ সন কার্যকর করা হয় তাঁর সিংহাসন আরোহণের তারিখ অর্থাৎ ৫ নভেম্বর ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দে।
নববর্ষের উৎসব বাংলার গ্রামীণ জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। গ্রামের সাধারণ মানুষের কাছে দিনটি ছিল বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। নববর্ষে বাড়িঘর পরিষ্কার করা, ব্যবহার্য সামগ্রী ধোয়ামোছা করা ইত্যাদি ছিল তাদেও জীবনের অনুসঙ্গ। এ দিনটিতে ভালো খাবর খাওয়া, ভালো পোষাক পড়িধান করা এবং ভালো কাজ দিয়ে বছর শুরু করা মঙ্গলজনক মনে করা হতো। নববর্ষে ঘরে ঘরে আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব এবং প্রতিবেশীদের আমন্ত্রণ জানিয়ে সুস্বাদু খাবর পরিবেশন করা এবং শুভেচ্ছা বিনিময় ছিল তাদেও জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
নববর্ষকে আরো আনন্দঘন ও উৎসবমুখর কওে তোলে বৈশাখী মেলা। এটি মূলত সর্বজনীন লোকজ উৎসব। স্থানীয় কৃষিজাত দ্রব্য, কারুপণ্য, লোকশিল্প পণ্য, কুটির শিল্প সামগ্রী, সবরকম হস্তশিল্প ও মৃৎশিল্প সামগ্রী ছিল মেলার বড় আকর্ষণ। এই মেলা বাঙালিদের এক অনাবিল মিলন মেলায় পরিণত হয়। বলা হয় বৈশাখী মেলা বাঙালির আনন্দঘন লোকায়ত সংস্কৃতির ধারক।
ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠান নাগরিক জীবনে নতুন মাত্রা যুক্ত করে বঙ্গাব্দের প্রথম দিন, পহেলা বৈশাখে। সূর্যোদয়ের সাথে সাথে রমনার বটমূলে রবি ঠাকুরের ‘এসো হে বৈশাখ এসো এসো’ গানের মাধ্যমে বরণ করা হয় নতুন বছরকে। ১৩৭২ বঙ্গাব্দে (১৯৬৫) ছায়ানট প্রথম এ উৎসব শুরু করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের বকুলতলার প্রভাতী অনুষ্ঠানেও নববর্ষকে সম্ভাষণ জানানো হয়। প্রথম দিকে খুব ছোট পরিসরে এ আয়োজন করা হলেও এখন ছায়ানটের বর্ষবরণ নাগরিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে, বেড়েছে অনুষ্ঠানের নান্দনিকতা ও মাত্রা।
এদেশের সাম্প্রদায়িক শক্তি বারবার বৈশাখের আবেদনকে, এর অগ্রযাত্রাকে রুদ্ধ করার চেষ্টা করেছে। চেষ্টা করে গলাটিপে একে হত্যা করার। কিন্তু বিকৃত সংস্কৃতির ধারক ওই সব অপশক্তি বুঝতে পারেনি যে এটি এখন বাঙালি জাতির সংস্কৃতির অংশ। কোন জাতির সংস্কৃতিকে কোন অপশক্তি কখনই রুখতে পারে না। পাকিস্তান আমলে আইযুব সরকার রবীন্দ্রসঙ্গীত তথা বাঙালি সংস্কৃতি চর্চার বিরোধিতার প্রতিবাদেই জন্ম ছায়ানটের নববর্ষ বরণের আয়োজন। ক্রমশই এ অনুষ্ঠান বিপুল মানুষের হৃদয়ে সুদৃঢ় আসন করে নিয়েছে, বাঙালি সংস্কৃতির আদর্শ লালনে উৎসাহ-উদ্দীপনা সৃষ্টি করেছে। স্বাধীনতা-উত্তরকালে সংস্কৃতি অঙ্গনে পহেলা বৈশাখ উদযাপন বিশেষ গুরুত্ব লাভ করে। চিরায়ত বাঙালি সংস্কৃতির ওপর কালো থাবা বিস্তারে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার পূর্বপাকিস্তানে রবীন্দ্রসংগীতের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারী করে। পাকিস্তান সরকারের এই অন্যায়ের জবাব দিতে ছায়ানট যে বর্ষবরণের আয়োজন করে তা এখন বাঙালি সংস্কৃতির অন্যতম পরিচায়ক রূপ ধারণ করেছে। ষাটের দশকে যাত্রা শুরু করা এ সাংস্কৃতিক উদ্যোগ বাঙালির আত্মপরিচয়ের আন্দোলন-সংগ্রামকে বেগবান করেছিল। সেই সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য প্রেরণা জুগিয়েছিল মহান মুক্তিযুদ্ধে। ১৯৭২ সালে (বাংলা ১৩৭৯ সন) ‘পহেলা বৈশাখ’ বাংলাদেশের জাতীয় পার্বন হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হবার আগ পর্যন্ত পাকিস্তান সরকার ২১ শে ফেব্রুয়ারির মতোই থামিয়ে দিতে চেয়েছে বৈশাখের উদযাপন। কারণ দু’টি বিষয়ই বাঙালি সংস্কৃতির বৃহৎ অংশ।
পাকিস্তান সরকার ছিল সাম্প্রদায়িক চেতনার ধারক ও বাহক। তাই তারা চিরায়ত বাঙালি সংস্কৃতিকে মেনে নিতে পারেনি। সেই চেতনার ধারকেরাই ২০০১ (বাংলা ১৪০৮ সন) সালে রমনার বটমূলে ছায়ানট বাংলা বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে বোমা হামলা করে, থামিয়ে দেওয়ার চেষ্টা কওে আমাদেও সাংস্কৃতিক অগ্রযাত্রাকে। কিন্তু অজেয় বাঙালীর সামনে কোন দিনই মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেনি কোন সাম্প্রদায়িক শক্তি। এত বড় একটি জঘন্য ঘটনার পরও থেমে থাকেনি বর্ষবরণ, পহেলা বৈশাখ উদযাপন। শতসহ¯্র প্রতিকূলতা অতিক্রম করে বর্ষবরণ আজ অতিক্রম করেছে রাষ্ট্রীয় সীমা। দেশে দেশে- যেখানেই বাঙালি জাতির অবস্থান আছে, সেখানেই উদযাপিত হচ্ছে পহেলা বৈশাখ।
বর্তমানে পহেলা বৈশাখ বা নববর্ষ জাতীয় শুধুই বাঙালির উৎসব নয়, এটি জাতীয় উৎসব হিসেবে মর্যাদা পেয়েছে, পেয়েছে সরকারিভাবে স্বীকৃতি। সরকারি দপ্তরে অন্যান্য উৎসবের মতই পহেলা বৈশাখেও আনন্দ করার জন্য ভাতা প্রদান করা হচ্ছে। এর ধারাবাহিকতায় বেসরকারি অফিসেও চালু হয়েছে বঙ্গাব্দ নববর্ষের ভাতা।

বাংলা নববর্ষ ও চৈত্রসংক্রান্তি উপলক্ষে তিন পার্বত্য জেলায় (রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি) উপজাতীয়দের ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয়-সামাজিক উৎসব ‘বৈসাবি’ আনন্দমুখর পরিবেশে পালিত হয়। পুরোনো বছরের বিদায় এবং নতুন বছরকে বরণ উপলক্ষে পাহাড়িরা তিন দিনব্যাপী এ বর্ষবরণ উৎসব সেই আদিকাল থেকে পালন করে। এ উৎসব উপলক্ষে পাহাড়িদের বিভিন্ন খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও আদিবাসী মেলার আয়োজন করা হয়।
১৯৮৯ সালে তৎকালীন স্বৈর শাসনের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের ঐক্য এবং একই সঙ্গে শান্তির বিজয় ও অপশক্তির ধ্বংস কামনা নিয়ে এই শোভাযাত্রার আত্মপ্রকাশ ঘটে। চারুকলার শিল্পীদের নেওয়া এই ব্যতিক্রমধর্মী উদ্যোগটি বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে নতুন মাত্রা যুক্ত করে। প্রথম দিকে এই শোভাযাত্রার নাম ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’ থাকলেও পরে ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ নামে সুপরিচিতি পায়। নব্বই দশকে স্বৈরাচার হটিয়ে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় পয়লা বৈশাখের উৎসব আয়োজন যেমন স্মরণীয় ভূমিকা রেখেছে, তেমনি আজকের দিনে জঙ্গিবাদ, উগ্রবাদ, ধর্মান্ধতা ও সন্ত্রাসবাদ নির্মূলে জুগিয়েছে দিশা। শানিত করছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। সেই জন্য বলা হয়, একদিন যে পয়লা বৈশাখ সীমাবদ্ধ ছিল মূলত ব্যবসায়ীদের হালখাতার মধ্যে, তা-ই ষাটের দশক থেকে জাতিপরিচয়ের পুনরাবিষ্কার ও স্বাধীনতা-অভিসারী জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের গতিধারায় নতুন মাত্রা যুক্ত করে এখন স্ফুরিত আপন আচার ও সংস্কৃতির বর্ণিল প্রকাশে।
বর্তমানে এটি বর্ষবরণ উদযাপনের যেমন অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ, তেমনি ইউনেস্কোর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেরও অংশ। ২০১৬ সালে ইউনেস্কো মঙ্গল শোভাযাত্রাকে ‘মানবতার অমূল্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য’ হিসেবে ঘোষণা করে। এই শোভাযাত্রার বিশেষত্ব হলো, তা মানুষের মধ্যে ঐক্যের বন্ধন প্রতিষ্ঠায় যেমন সহায়ক, তেমনি যুক্ত করে আনন্দ উচ্ছ্বাসে মেতে ওঠার ভিন্ন এক আহ্বান। শান্তির বিজয় ও অপশাসনের ধ্বংস এবং মানবতার কল্যাণ ও মুক্তি নিয়ে সে আবির্ভূত হয় ধরায়। কোনো কোনো সংগঠন একে বাংলা শোভাযাত্রা নামেও উদযাপন করে থাকে।
বাঙালির এই আয়োজনে নেই কোনো ধর্মের দেয়াল, নেই কোনো সংস্কার। আছে কাছে আসার, কাছে টানার বাঙালিয়ানা। আছে এক অনাবিল আনন্দে অবগাহনের আহ্বান। বাংলা ভাষাভাষী সব জাতি-গোষ্ঠীর, সব সম্প্রদায়ের, সব প্রেণিপেশার ও ভিন্ন ভিন্ন বয়সের সব মানুষের। তাই যুগের পর যুগ পেরিয়ে এই উৎসব আয়োজন ধারণ করে আসছে অসাম্প্রদায়িক চেতনা। রূপ নিয়েছে সর্বজনীন উৎসবে। এই দিনে বাঙালি আপনা থেকেই আত্মপরিচয় খুঁজে পায়। ফিরে পায় তার শিকড়ের ঠিকানা। জাতি, ধর্ম, বর্ণ, গোত্র নির্বিশেষে সব চেতনার মানুষ আত্মীয়তার বন্ধন অনুভব করে। উপনীত হয় মহামিলনের বিস্তীর্ণ মোহনায়, ঐক্যের আঙিনায়।

গণমাধ্যমকর্মী
[email protected]

সর্বশেষ..