মত-বিশ্লেষণ

মানবপ্রেমী বিপ্লবের অনুসরণে এগিয়ে আসতে পারেন ধনাঢ্যরা

মোহাম্মদ আবু নোমান:  মাঝেমধ্যে আমাদের প্রিয় জন্মভূমিকে নিয়ে হতাশ ও নিরাশ হতে হয়। কতিপয় শিক্ষিত, সম্ভ্রান্ত, ধনকুবের দ্বারাও যখন দুর্নীতি, নৈতিক অবক্ষয় ও রাষ্ট্রীয় তহবিল তসরুপের খবর আমরা দেখে থাকি, শুনে থাকি; তখন মনবেদনা নিয়েও ভাবতে হয় পৃথিবীর সর্বত্র যখন এগিয়ে যাচ্ছে, আমরা তখনও পিছিয়ে যাচ্ছি! কিন্তু না; সারা দেশ যখন ‘ফণীর’ ভয়ংকর ছোবলের আতঙ্কে আতঙ্কিত ছিল, এর মাঝেই আমাদের আশা ও আলো দেখিয়েছেন, ‘দেশ বিপ্লবের’ সমূহ সম্ভাবনা জাগিয়ে তুলেছেন রাজশাহীর আড়ানীর হোটেল ব্যবসায়ী বিপ্লব সরকার নামের এক যুবক।
বিপ্লবের এসএসসি পরীক্ষাটা দেওয়া হয়নি। লেখাপড়া না করে কী ভুল করেছেন, এখন তিনি বুঝতে পারেন। এ জন্য যেসব বাচ্চা লেখাপড়া শিখছে, তারা যেন শারীরিকভাবে সুস্থ থাকতে পারে, তার জন্য তিনি তার সাধ্যের মধ্যে যতটুকু পারছেন, সহযোগিতা করছেন।
গায়ে স্কুল ড্রেস আর পকেটে পাঁচটি টাকা থাকলেই বিপ্লবের হোটেলে দুপুরে ডাল-ভাত খাওয়া যায়। শুধু স্কুলশিক্ষার্থীদের জন্য দুপুরে ভাত খাওয়ার এই ‘পাঁচ টাকার প্যাকেজ’ গত তিন বছর ধরে চালু রেখেছেন বিপ্লব সরকার। শ্যামল সরকারের ছেলে বিপ্লবের বাড়ি রাজশাহীর বাঘা উপজেলার আড়ানী পূর্বপাড়া মহল্লায়। ‘অন্নপূর্ণা হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট’ নামে আড়ানী বাজারের তালতলায় বড়াল নদের ধারে বিপ্লব সরকারের হোটেল। আড়ানী মনোমোহিনী সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এ হোটেলে পাঁচ টাকায় দুপুরের খাবার সেরে নেয়। ওই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সঞ্জয় কুমার পাঁচ টাকার প্যাকেজ সম্পর্কে সংবাদমাধ্যমকে বলেন, তিনি তার স্কুলের শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে শোনার পর একদিন দেখতে গিয়েছিলেন। তিনি দেখে অবাক হয়েছেন।
অনেক অনেক ধন্যবাদ, অভিবাদন বিপ্লব সরকারকে। বিপ্লবদের মতো মানবসন্তান আজও আছে বলেই পৃথিবীটা এখনও এত সুন্দর। কে বলেছে বিপ্লব শিক্ষিত নয়? রবং স্বশিক্ষায় শিক্ষিত বিপ্লবের কর্ম, জ্ঞান, অনেক অনেক ডিগ্রি ও ডক্টরেটধারী থেকেও সমুন্নত। আমাদের মানসিকতা বিপ্লবের পর্যায়ে পৌঁছাতে পারলে দেশের অনেক কঠিন সমস্যার সমাধান হয়ে যেত। বিপ্লব বলেন, ‘মনের আনন্দেই এটি করছি, সেবার মানসিকতা থেকেই করছি।’ রেয়ার হলেও পিওর সাদামনের নিঃস্বার্থ ভালো মনের মানুষ এখনও পৃথিবীতে আছে। যাদের কারণেই হয়তো পাপ আর পাপীতে পূর্ণ এ দুনিয়ার অস্তিত্ব এখনও আছে! মন ছুঁয়ে যাওয়ার মতো মানবতার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী বিপ্লবের প্রতি তার কর্মগুণেই শ্রদ্ধা চলে আসে। বিপ্লব সম্পর্কে কোনো মন্তব্য করার মতো যোগ্যতা আমার আছে বলে মনে করছি না! এ কাজ করতে শুধু ভালো মনই নয়, বিশাল সাহসও লাগে। ব্যাপক ধন-দৌলতধারী মানুষ অপেক্ষা বড় মনের মানুষই উত্তম বিপ্লবই তার উদাহরণ। মানুষের সম্মান, মর্যাদা, বয়স ও সম্পদ থেকে নয়; আচরণ ও কার্য থেকেই আসে। মানুষের কল্যাণে নিজেকে সম্পৃক্ত করতে বিত্তশালী হওয়াটাই বড় কথা নয়। আগে আমাদের মনটা উদার হতে হবে।
এ দেশের তথাকথিত অভিজাত ভদ্রলোক, কোটিপতিদের মানসিকতা যদি এরকম হতো, তাহলে কতই না ভালো হতো! বিপ্লবই তো সত্যিকারের একজন দেশপ্রেমিক, শিক্ষানুরাগী, অনুকরণীয়, অনুসরণীয়, মানবিক ও আদর্শিক দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী মানুষপ্রেমী সাহসী যুবক। যারা নীরবে-নিভৃতে, উদার মানসিকতা নিয়ে মহৎ কাজ করে চলেছেন। বিপ্লবের সামর্থ্য কম; কিন্তু ইচ্ছা, চেষ্টা, বাসনা পাহাড়সম। একজন সাধারণ মানুষ কীভাবে অসাধারণ হয়ে ওঠেÑবিপ্লব তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ। সবাই এভাবে এগিয়ে এলে দেশটি খুব তাড়াতাড়ি বদলে যেতে পারে। এভাবেই আমরা একদিন পাল্টে যাব, আর পাল্টে যাবে এ দেশ এটাই আমরা বুঝতে চাই, ভাবতে চাই, বিশ্বাস করতে চাই।
বিপ্লব সরকার বলেন, ‘গ্রামের অধিকাংশ বাচ্চাই বাড়ি থেকে টিফিন নিয়ে আসে না। অনেকের বেশি টাকা দিয়ে হোটেলে দুপুরের খাবার কিনে খাওয়ার মতো সামর্থ্যও নেই। তারা স্কুলে এসে টিফিনের সময় আশেপাশের দোকান থেকে মুখরোচক কিছু একটা কিনে খায়। এগুলো স্বাস্থ্যের জন্যও ক্ষতিকর। অথচ দুপুরে এক প্লেট ভাত খেতে পারলে তাদের শরীরটা ভালো থাকে। এ চিন্তা থেকেই বাবার অগোচরে পাঁচ বছর আগেই এ প্যাকেজ চালু করি। তখন থেকেই বাচ্চারা খেতে আসতে শুরু করে। তবে বাবা দুবছর পর বিষয়টি জানতে পারেন। কিন্তু তিনি এতে বাধা দেননি।’
স্কুলশিক্ষার্থীদের টার্গেট করে কতজনই তো বিক্রি করে ইয়াবাসহ সব ভয়ংকর নেশা! গত ১৯ ডিসেম্বর রাজধানীর তেজগাঁওয়ে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের অতিরিক্ত পরিচালক (গোয়েন্দা) নজরুল ইসলাম শিকদার বলেছিলেন, ‘শিক্ষার্থীরাই বেশি ইয়াবা সেবন করে।’ এর আগে এ খবরও আমরা শুনেছি, ড্যান্ডি নেশায় আক্রান্ত মানিকগঞ্জের প্রাইমারি স্কুলের কোমলমতি শিশুরা। বাসস্ট্যান্ড এলাকার একটি দোকানে স্থানীয় শিশু কল্যাণ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থীর কাছে ড্যান্ডি বিক্রির সময় পৌরসভার কান্দা পৌলী গ্রামের বাসিন্দা মাদক ব্যবসায়ী আমিনুল ইসলাম বিল্টুকে ১৬৫ পিস ড্যান্ডিসহ আটক করেন মানিকগঞ্জ ডিবির স্পেশাল স্কোয়াড সদস্যরা। এ ঘটনায় মানিকগঞ্জের পুলিশ সুপার মাহফুজুর রহমান সংবাদ সম্মেলনে বলেন, আটক বিল্টু শহরের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের কাছে এই ড্যান্ডি বিক্রি করে থাকে। ওই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাব্বির ও সুমিকে সাংবাদিকদের সামনে হাজির করা হলে তারা জানায়, বিল্টুর দোকান থেকে তারা ড্যান্ডি কিনে নেশা করে থাকে। দুই শিশুর মতে, মানিকগঞ্জে অনেক শিশু শিক্ষার্থী এই ড্যান্ডি নেশায় আক্রান্ত।
বিপ্লবও ব্যবসা করছেন, আর মাদক কারকারিরাও ব্যবসা করছে। বর্তমানে পবিত্র রমজান চলছে, রমজান মাসে আজ নিন্মবিত্ত ও মধ্যবিত্তদের অবস্থা একেবারেই শোচনীয়। সাহরি, ইফতারে নিন্ম ও মধ্যবিত্তদের পেটভরে খাওয়ারও সুযোগ নেই। দ্রব্যমূল্য আকাশ ছোঁয়ায় বছরব্যাপী অবশ্যম্ভাবী নিয়তি ও অভিন্ন দুর্ভোগের মাত্রা রমজানে অসহনীয় হয় খেটে খাওয়া মানুষের জন্য। সবার সামর্থ্য সমান নয়, অনেকে রোজা রেখে ইফতারসামগ্রী জোগাড় করতে হিমশিম খান। এতে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগের শিকার হয় স্বল্প ও নিন্ম আয়ের মানুষ। এতে মুসলিম হিসেবে আসলেই আমাদের লজ্জিত হওয়া উচিত।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সংযমের মাসে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যমূল্য হ্রাস করে জনগণের সেবা করা হয়। আমাদের দেশে বিষয়টি সম্পূর্ণ বিপরীত। রমজান এলেই দ্রব্যমূল্য আকাশ ছোঁয়! যা যুগ যুগ ধরেই চলমান। অথচ রমজানে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কমিয়ে রাখার বক্তব্য, আলাপ ও নির্দেশ শোনা যায়; কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয় না। বাজারে খাদ্যের পর্যাপ্ত মজুত ও সরবরাহ থাকার পরও কেন পণ্যের দাম বাড়ে, তা অনুসন্ধান ও প্রতিকার করা কি কোনো সরকারের সাধ্য, সামর্থ্য ও শক্তির বাইরে?
যে সময় শহরের ফুটপাতে এক কাপ রঙ চা খেতে ১০ টাকা লাগে, সে যুগে পাঁচ টাকায় স্কুলের বাচ্চাদের ?দুপুরের খাবার খাইয়ে পুুরো বাংলাদেশকে বিপ্লব দেখিয়ে দিয়েছেন! হরতাল, ধর্মঘট, আমরণ অনশন, আন্দোলন, এটা চাই, ওটা চাই, আমাদের দাবি মানতে হবে প্রভৃতি সারা জীবন ধরে আমরা শুনছি। কিন্তু এসব না করেও বিপ্লবের মতো অল্প কিছু মানুষ একটি দেশকে অনেক ওপরে নিয়ে জেতে পারে। বিপ্লবই তার বাস্তব উদাহরণ।
বিপ্লব সরকার বলেন, বাচ্চাদের তিনি কয়েকটি শর্তে খেতে দেন। তার প্যাকেজ খেতে হলে অবশ্যই স্কুল ড্রেস পরে আসতে হবে। আর খাবারের আগে বা পরে বাইরের দোকানে অন্য কোনো মুখরোচক খাবার খাওয়া যাবে না। তিনি বলেন, তিনি দেখেছেন বেশিরভাগ বাচ্চাই এক প্লেটের বেশি ভাত খেতে পারে না। তিনি ভাতের সঙ্গে সবজি আর ডাল দিয়ে একটি প্যাকেজ তৈরি করেছেন। খাবার সময় তিনি খেয়াল করেন, কোনো বাচ্চা যেন সবজি নষ্ট না করে। শরীরের জন্য সবজির বড় প্রয়োজন। তিনি তাদের সবজি খেতে বাধ্য করেন। টমেটোর মৌসুমে টমেটোর সালাদ খেতে বাধ্য করেন। এ প্যাকেজ তিনি পাঁচ টাকায় দেন। তবে পাশাপাশি খেতে বসে কোনো বাচ্চা যদি বেশি টাকা দিয়ে মুরগির মাংস খেতে চায়, তাহলে তিনি পাশের বাচ্চাটাকেও ছোট এক টুকরো মুরগির মাংস ও একটু ঝোল দেন, যাতে তার মন খারাপ না হয়।
মানবতার কোনো সীমানা, ধর্ম, বর্ণ, বয়স নেই। বিপ্লবকে অন্তরের অন্তস্তল থেকে বিনম্র শ্রদ্ধা ও শুভকামনা। বিপ্লবের মতো যুবকদের মহতী ও মানবতাধর্মী উদ্যোগের কারণেই পৃথিবীতে প্রকৃত মানুষ আছে বলেই এখনও আমরা ভালোভাবে বেঁচে থাকার, সোনার বাংলাদেশকে নিয়ে বিশ্বব্যাপী গর্ব করার অনুপ্রেরণা পাই। এরকম বড় মন ও হৃদয়ের লোক আছে বলেই দেশকে নিয়ে এখনও আশা আছে। সবকিছু এখনও শেষ হয়ে যায়নি।
বিপ্লব সরকার আরও বলেন, ‘গ্রামের অধিকাংশ শিশুই বাড়ি থেকে টিফিন নিয়ে আসে না। অনেকের বেশি টাকা দিয়ে হোটেলে দুপুরের খাবার কিনে খাওয়ার মতো সামর্থ্যও নেই। তারা স্কুলে এসে টিফিনের সময় আশেপাশের দোকান থেকে মুখরোচক কিছু একটা কিনে খায়। এগুলো স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। অথচ দুপুরে এক প্লেট ভাত খেতে পারলে তাদের শরীরটা ভালো থাকে।’ বিপ্লবের এ কথায় যে কোনো বিবেকবান মানুষই আবেগাপ্লুত না হয়ে পারবেন কী? বিপ্লবের কথাগুলোয় যে কোনো হৃদয়বান মানুষেরই চোখে পানি না এসে পারে না। সে সঙ্গে মনে করিয়ে দিল স্কুলজীবনে দল বেঁধে টিফিন পিরিয়ডে আমরা কীভাবে পোড়া তেলে ভাজা চপ, সমুচা, শিঙাড়া, ফুসকা, দূষিত চর্বিমাখা ঝালমুড়ি ও আচার খেতাম। যার ফলে প্রায় সবারই অসুস্থতা বোধসহ স্থায়ী এসিডিটি শরীরে বাসা বেঁধেছে। আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ও বর্তমানে ওসব খেয়ে সুস্থ থাকার সম্ভাবনা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে।
এছাড়া বগুড়ার আকবরিয়া গ্র্যান্ড হোটেল সারাদিন উন্নতমানের খাবার বিক্রি করার পর রাতে গরিব, ভিক্ষুক, ভাসমান, ছিন্নমূল ও অভাবী মানুষের মুখে বিনামূল্যে খাবার তুলে দেওয়ার নজির স্থাপন করে আসছে। বগুড়া শহরের কবি কাজী নজরুল ইসলাম সড়কে অবস্থিত হোটেলটির প্রতিষ্ঠাতা মরহুম আকবর আলী মিঞা। হোটেল কর্তৃপক্ষ ৯৬ বছর ধরে এভাবেই বিনা মূল্যে খাবার বিতরণ করে আসছে।
জাকাত দেওয়ার সময় হুড়োহুড়িতে মারা যাওয়ার ঘটনা প্রায় প্রতি বছরই ঘটে। এভাবে জাকাত দেওয়ার পেছনে প্রদর্শনেচ্ছাও কাজ করে। কিন্তু অভাবী মানুষের কোনো উপকার হয় না। ব্যতিক্রম আলোকিত মানুষ বিপ্লব ও আকবর আলী। তারা প্রমাণ করলেন ‘মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনের জন্য’। তাদের এই মহৎ কাজের দৃষ্টান্ত বড় ধনকুবেরদের ভেতরে ভালো কাজ করার প্রেরণা হিসেবে কাজ করলে সমাজ আরও এগিয়ে যাবে।

ফ্রিল্যান্স লেখক

[email protected]

সর্বশেষ..