মত-বিশ্লেষণ

সমৃদ্ধির অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশ: বড় প্রকল্পের অগ্রগতি দৃশ্যমান

মো. রেজাউল করিম: একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের মধ্য দিয়ে বর্তমান জোট সরকার টানা তৃতীয়বারের মতো সরকার গঠন করে। সরকারের ধারাবাহিকতা বজায় থাকার কারণে বিগত সময়ে গৃহীত উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর কাজের অগ্রগতি নতুন মাত্রা লাভ করে। বিশেষ করে ফার্স্ট ট্র্যাক প্রজেক্ট হিসেবে পরিচিত সরকারের ১০ মেগা প্রকল্পের কাজে ব্যাপক অগ্রগতি সাধিত হয়।
এরই মধ্যে বর্তমান সরকার তৃতীয় মেয়াদের সাত মাস সময় পার করেছে। এ স্বল্পসময়ে ১০ মেগা প্রকল্পের কাজ অতীতের যে কোনো সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেশি। সরকারের বিশেষ অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত ১০ মেগা প্রকল্প হলো: পদ্মা বহুমুখী সেতু, ঢাকা মাস র‌্যাপিড ট্রানজিট ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট (মেট্রোরেল), পদ্মা রেলসেতু সংযোগ, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার ও দোহাজারী থেকে ঘুনধুম পর্যন্ত রেললাইন নির্মাণ, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন, রামপাল মৈত্রী সুপার থার্মাল পাওয়ার প্রজেক্ট, মাতারবাড়ি আলট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল কোল ফাওয়ার্ড পাওয়ার প্রজেক্ট, বঙ্গোপসাগরের সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ, পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ ও এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্প। প্রকল্পগুলোর মধ্যে পদ্মা বহুমুখী সেতু ও মেট্রোরেলের কাজে অগ্রগতি হয়েছে সর্বাধিক। এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের কাজ এরই মধ্যে সমাপ্ত হয়েছে।
সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের কাজ চলছে দ্রুতবেগে। ছয় দশমিক ১৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে এ সেতুতে মোট স্প্যানের সংখ্যা হবে ৪১। প্রতিটি স্প্যানের দৈর্ঘ্য ১৫০ মিটার। ২৪০ ইস্পাত পাইলের ওপর মোট ৪২টি পিলার নির্মিত হবে। পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্পের সংশোধিত ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৩২ হাজার কোটি টাকা। এরই মধ্যে সেতুর ৪১ স্প্যানের মধ্যে ১৩টি বসানো হয়েছে এবং আরও একটি স্প্যান বসানোর অপেক্ষায় রয়েছে। ফলে মূল সেতুর ১৯৫০ মিটার দৃশ্যমান হয়েছে। বর্তমানে পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্পের সার্বিক কাজের ৬৭ শতাংশ অগ্রগতি হয়েছে। ২০২০ সালের মধ্যেই দেশের পূর্ব থেকে পশ্চিমে এ সেতুর মাধ্যমে যোগাযোগ স্থাপিত হবে বলে প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।
যানজট রাজধানীবাসীর নিত্যসঙ্গী এবং ভোগান্তির সবচেয়ে বড় কারণ। এ যন্ত্রণা হতে রাজধানী ও এর আশেপাশের এলাকার মানুষকে মুক্তি দিতে সরকার একটি সমন্বিত মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। এর আওতায় সরকার ৪৬টি মেগা প্রকল্প প্রণয়ন করেছে। তš§ধ্যে রয়েছে দুটি পাতাল রেল, তিনটি এলিভেটেড রেল, বৃত্তাকার জলপথ উন্নয়ন ও ছয়টি মেট্রোরেল। এছাড়া ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, মুন্সীগঞ্জ, নরসিংদী ও মানিকগঞ্জ জেলার প্রায় সাড়ে সাত হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকার যানজট নিরসনে আরও পাঁচটি মাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (এমআরটি), দুটি বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি), তিনটি রিং রোড, আটটি রেডিয়াল সড়ক, ছয়টি এক্সপ্রেসওয়ে এবং ২১টি ট্রান্সপোর্টেশন হাব নির্মাণের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। এর মধ্যে ঢাকা এমআরটি-৬ বাস্তবায়ন কাজ এগিয়ে চলেছে দ্রুতগতিতে। এটি হবে বাংলাদেশের প্রথম মেট্রোরেল। এর রুট হবে উত্তরা থেকে কাজীপাড়া, ফার্মগেট ও শাহবাগ হয়ে মতিঝিল পর্যন্ত। এর স্টেশন হবে ১৬টি। মোট আট প্যাকেজে এর কাজ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। প্রকল্পটি ২০২৪ সালে সমাপ্ত হওয়ার কথা থাকলেও প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দিকনির্দেশনায় প্রথম পর্যায়ে উত্তরা তৃতীয় ফেইজ হতে আগারগাঁও পর্যন্ত অংশ ডিসেম্বর ২০১৯ এবং বাংলাদেশ ব্যাংক পর্যন্ত সম্পূর্ণ অংশ ২০২০ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে বাস্তবায়নের সংশোধিত পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। সংশোধিত এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে মেট্রোরেলের নির্মাণকাজ পুরোদমে এগিয়ে চলেছে।
পদ্মা রেলসেতু সংযোগ প্রকল্প বাস্তবায়িত হবে তিন পর্যায়ে। প্রথম পর্যায়ে মাওয়া থেকে ফরিদপুরের ভাঙ্গা পর্যন্ত, দ্বিতীয় পর্যায়ে ঢাকা থেকে মাওয়া পর্যন্ত এবং তৃতীয় পর্যায়ে নির্মাণ করা হবে ভাঙ্গা থেকে যশোর পর্যন্ত রেললাইন। প্রথম পর্যায়ের কাজ খুব দ্রুত এগিয়ে চলছে এবং এ অংশের কাজ পদ্মা সেতু উদ্বোধনের সঙ্গেই উদ্বোধন করা হবে বলে আশা করা যায়। দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজও এগিয়ে চলেছে দ্রুতগতিতে। তৃতীয় পর্যায়ের কাজ সমাপ্ত হবে সবশেষে এবং ২০২৪ সালের মধ্যে প্রকল্পের কাজ সমাপ্ত হওয়ার কথা রয়েছে। এ রেলপথ নির্মাণ হলে ঢাকা থেকে যশোরের দূরত্ব কমে হবে ১৬৬ কিলোমিটার।
পর্যটনশিল্পের বিকাশে উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা অপরিহার্য। তাই বিশ্বের দীর্ঘতম সমদ্রসৈকত কক্সবাজারে পর্যটকদের নিরাপদ ও আরামদায়ক যাতায়াতের জন্য সরকার চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত অগ্রাধিকার ভিত্তিতে রেললাইন নির্মাণ প্রকল্প গ্রহণ করেছে। চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার/দোহাজারী হয়ে ঘুনধুম পর্যন্ত রেললাইনের নির্মাণকাজ এগিয়ে চলছে দ্রুতগতিতে এবং এ প্রকল্পের কাজ সমাপ্ত হবে ২০২২ সালের অক্টোবরের মধ্যে। এ যাবৎ প্রকল্পের ২১ দশমিক ৫১ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে।
ক্রমবর্ধমান শিল্পায়নের চাহিদা পূরণ ও সবার জন্য বিদ্যুৎ সুবিধা নিশ্চিতে সরকার পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের কাজ হাতে নিয়েছে। রুশ ফেডারেশনের আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প সরকারের অগ্রাধিকার প্রকল্প এবং এর কাজ এগিয়ে চলছে দ্রুতগতিতে। এ প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে ২০২২ সাল থেকে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে আরও দুই হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ এবং এটি হবে দেশের প্রথম পারমাণবিক শক্তিচালিত বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র।
রামপাল মৈত্রী সুপার থার্মাল পাওয়ার প্রজেক্টের আওতায় ভারত ও বাংলাদেশের যৌথ অর্থায়নে নির্মিত হচ্ছে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র। সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য অক্ষুন্ন রেখে এর কাজ পুরোদমে এগিয়ে চলেছে। কয়লাভিত্তিক এ বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের জন্য ৪৩০ একর ভূমি উন্নয়নের কাজ এরই মধ্যে শেষ হয়েছে। প্রকল্প এলাকার সীমানা প্রাচীর, মূল বিদ্যুৎকেন্দ্রের ফেন্সিং ও নির্মাণকাজের বিদ্যুৎ লাইন নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে। এ বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণকাজের বর্তমান ভৌত ও আর্থিক অগ্রগতি যথাক্রমে ২৪ দশমিক সাত ও ২০ দশমিক ৬৯ শতাংশ। দুটি ইউনিটের মধ্যে প্রথম ইউনিট মার্চ ২০২১ এবং দ্বিতীয় ইউনিট ডিসেম্বর ২০২১-এর মধ্যে চালু হওয়ার কথা রয়েছে। এ প্রকল্পের কাজ বর্তমানে যে গতিতে চলছে, তার ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই শেষ হবে বলে আশা করছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
জাপান সরকার তথা জাইকার অর্থায়নে নির্মিত হচ্ছে মাতারবাড়ি আল্ট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল কোল ফাওয়ার্ড পাওয়ার প্লান্ট। এর নির্মাণকাজ ২০২৪ সালের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। বর্তমানে এর নির্মাণকাজের ভৌত অগ্রগতি ২১ দশমিক ১৮ শতাংশ এবং আর্থিক অগ্রগতি ২০ দশমিক ২৬ শতাংশ।
পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার রাবনাবাদ চ্যানেলে নির্মাণ করা হচ্ছে দেশের তৃতীয় পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দর। পরবর্তীকালে এর অর্থনৈতিক গুরুত্ব বিবেচনা করে পায়রা বন্দর প্রকল্পটিকে ফার্স্ট ট্র্যাক প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ২০১৬ সালে পায়রা সমুদ্রবন্দর উন্নয়নের জন্য ১৯টি কম্পোনেন্ট-সম্পন্ন একটি কনসেপচুয়াল মাস্টারপ্ল্যান প্রস্তুত করা হয়, যার ১২টি পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষ ও বাকি সাতটি বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সম্পন্নের প্রক্রিয়া চলমান। এরই মধ্যে বাণিজ্যিক জাহাজ হতে লাইটার জাহাজে পণ্য খালাসের মাধ্যমে সীমিত পরিসরে এর অপারেশনাল কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এ টার্মিনালে কয়লাবাহী জাহাজ থেকে বেল্টের মাধ্যমে কয়লা আনলোড করা হবে। এরই মধ্যে নিরাপত্তা ভবন, পানি পরিশোধনাগার, বৈদ্যুতিক সাব-স্টেশন, ভিএইচএফ টাওয়ার, প্রশাসনিক ভবন, ওয়্যারহাউজ, মসজিদ, মাল্টিপারপাস ভবন ও স্টাফ ডরমিটরি নির্মাণ করা হয়েছে। সার্ভিস জেটি ও সংযোগ নদীর ড্রেজিং এবং মার্কিং (বয়া স্থাপন) সম্পন্ন হয়েছে। পাইলট ভেসেল, হেভি ডিউটি স্পিডবোট, টাগবোট, বয়া লেইং ভেসেল ও জরিপ বোটের নির্মাণকাজও শেষ পর্যায়ে রয়েছে। এছাড়া জাতীয় মহাসড়কের সঙ্গে স্থল সংযোগের চার লেনবিশিষ্ট শেখ হাসিনা মহাসড়কের নির্মাণকাজও শেষ পর্যায়ে রয়েছে।
কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের জন্য জাপানের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান প্যাসিফিক কনসালট্যান্ট ইন্টারন্যাশনালের (পিসিটি) মাধ্যমে একটি টেকনো ইকোনমিক স্টাডি করা হয়। প্রাথমিকভাবে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপে (পিপিপি) এ বন্দর নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হলেও পরে জিটুজি পদ্ধতিতে ওই প্রকল্প বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ২০ হাজার কোটি টাকা।
১৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি ব্যয়ে কক্সবাজারের মহেশখালীতে নির্মাণ করা হয়েছে লিকুফাইড ন্যাচারাল গ্যাস (এলএনজি) টার্মিনাল। সমুদ্রপথে আমদানি করা এলএনজি এ টার্মিনাল থেকে চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর হয়ে সারা দেশে সরবরাহ করা যাবে। প্রতিদিন ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস এ টার্মিনালের মাধ্যমে আমদানি করা যাবে।
১৯৭১ সালে স্বাধীনতা অর্জনের মাধ্যমে বাংলাদেশ উত্তরাধিকার সূত্রে লাভ করে একটি নাজুক, ভঙ্গুর ও দুর্বল অর্থনৈতিক ভিত্তি। প্রায় দুই শতাব্দীর ইংরেজ শাসন ও ২৪ বছরের পাকিস্তানি শাসন-শোষণের ফলে শিল্প, শিক্ষা, কৃষিসহ সব ক্ষেত্রেই পিছিয়ে ছিল বর্তমান বাংলাদেশ অধ্যুষিত ভূখণ্ড। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে এই পশ্চাৎপদ অর্থনীতিকে উজ্জীবিত করতে দেশের প্রত্যেক মানুষ অক্লান্ত পরিশ্রম করেছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, শিল্প, অর্থনীতিসহ প্রতিটি খাতে উন্নতি হয়েছে অভাবনীয়। এর স্বীকৃতি হিসেবে ২০১৮ সালে বাংলাদেশ অর্জন করে স্বল্পোন্নত হতে উন্নয়নশীল দেশের স্ট্যাটাস লাভের সব যোগ্যতা। দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতিতে যোগাযোগব্যবস্থা ও জ্বালানি খাতের উন্নয়ন প্রয়োজন সর্বাগ্রে। সে কারণে সরকার বিশেষ অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে উপরোক্ত ১০ মেগা প্রকল্প হাতে নিয়েছে। আশা করা যায়, প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন হলে বাংলাদেশের উন্নয়নের গতি ত্বরান্বিত হবে এবং বাংলাদেশ ২০৩০ সালের মধ্যে এসডিজির সব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সক্ষম হবে। সে সঙ্গে ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ হবে একটি সমৃদ্ধ ও উন্নত দেশ।

পিআইডি প্রবন্ধ

সর্বশেষ..



/* ]]> */