হোম মতামত-বিশ্লেষণ ভালো উদ্যোক্তাদের উৎসাহ দিলে খেলাপি ঋণ এমনিতেই কমবে

ভালো উদ্যোক্তাদের উৎসাহ দিলে খেলাপি ঋণ এমনিতেই কমবে


Warning: date() expects parameter 2 to be long, string given in /home/sharebiz/public_html/wp-content/themes/Newsmag/includes/wp_booster/td_module_single_base.php on line 290

এম খালেক: ব্যাংক সেক্টরে খেলাপি ঋণ নিয়ে নানা আলোচনা চলছে অনেক দিন ধরেই। কীভাবে খেলাপি ঋণ কমানো যায় বা কী করে এ সমস্যা হতে মুক্তি পাওয়া যাবে এ নিয়ে বিস্তর আলোচনা হচ্ছে। মাঝেমধ্যে সভা-সেমিনারে এসব নিয়ে গুরুগম্ভীর আলোচনা হয়। অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞানের আলোকে সমাধান বাতলে দেন অনেকেই। কিন্তু কোনো পরামর্শেই খেলাপি ঋণ কমছে না। খেলাপি ঋণ ব্যাংক ব্যবস্থার জন্য ‘দুরারোগ্য ক্যানসারে’ পরিণত হয়েছে। স্মর্তব্য, এ ঋণ কখনই কেবল ঋণগ্রহীতা ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কারণে সৃষ্টি হয় না। এজন্য ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ সুশাসনের অভাবও সমভাবে দায়ী। ব্যাংক কর্মকর্তারা শতভাগ নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করলে খেলাপি ঋণের শঙ্কা অনেকাংশে কমে যাবে। প্রচলিত আইনি ব্যবস্থায় ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে খেলাপি হওয়া খুব একটা সহজ নয়, যদি ব্যাংক কর্মকর্তারা অনৈতিকভাবে ঋণগ্রহীতাকে সহায়তা না করেন। ঋণখেলাপি সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে একশ্রেণির দুষ্ট ঋণগ্রহীতা ও অসৎ ব্যাংকারের কারসাজিতে। অবশ্য সব ধরনের ঋণখেলাপিকে একই পাল্লায় পরিমাপ করার সুযোগ নেই। ঋণখেলাপি দুই শ্রেণির। এক শ্রেণির ঋণগ্রহীতা আছেন, যারা নানা প্রতিকূলতার কারণে ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও নিয়মিত ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে পারেন না। এরাই প্রকৃত ঋণখেলাপি। আর এক শ্রেণির ঋণখেলাপি আছেন, যারা সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও ইচ্ছা করে ঋণের কিস্তি আটকে রাখেন বা পরিশোধ করেন না। এদের মধ্যে অনেকেই আছেন, যারা ঋণ নেওয়ার আগেই পরিকল্পনা করে রাখেন কীভাবে অর্থ আটকে রাখা যায় বা পরিশোধ না করে পার পাওয়া যায়। এরা ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি ও ব্যাংক সেক্টরের জন্য বিপদের কারণ। ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপকে ‘ক্রিমিনাল অফেন্স’ হিসেবে ঘোষণা দিয়ে কঠোর শাস্তির আওতায় নিয়ে আসা প্রয়োজন।

দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সম্প্রতি ব্যাংক সেক্টরের দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের কাছে সাত দফা সুপারিশ পাঠিয়েছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছেÑঋণখেলাপিদের তালিকা প্রকাশ, ভুয়া দলিলে ঋণগ্রহীতার বিরুদ্ধে ফৌজদারি ব্যবস্থা গ্রহণ, মন্দ ঋণকে বিশেষ অডিট ব্যবস্থার আওতায় নিয়ে আসা, ঋণ পুনঃতফসিলীকরণের আগে যৌক্তিক জামানত নিশ্চিতকরণ, ব্যাংকের ঝুঁকি শনাক্তকরণে আগাম সমীক্ষা পরিচালনা, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শনে প্রাপ্ত অনিয়মের বিরুদ্ধে দ্রুত ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদকে মনিটরিংয়ের আওতায় নিয়ে আসা। দুদকের এসব সুপারিশ যৌক্তিক ও সময়োপযোগী, এতে সন্দেহ নেই। কিন্তু এগুলো কতটা বাস্তবায়ন হবে বা বাস্তবায়ন সম্ভবÑতা নিয়ে সংশয় রয়েছে। আমরা অতীতে দেখেছি, যত আইন বা সুপারিশ প্রণয়ন করা হয়, তার বেশিরভাগই অবাস্তবায়িত থেকে যায়। ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিরা অত্যন্ত শক্তিশালী। তারা যে কোনো পরিস্থিতি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে। বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারির জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে এখনও তেমন কোনো কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। আমরা দেখেছি, কীভাবে ব্যক্তি বা গোষ্ঠীস্বার্থে প্রচলিত আইনের পরিবর্তন ঘটানো হয়। কয়েক বছর আগে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার অজুহাতে ৫০০ কোটি টাকা ও তদূর্ধ্ব অঙ্কের খেলাপি ঋণ পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হলে অনেকেই এর বিরোধিতা করেছিলেন। কিন্তু সে আপত্তি কানে তোলা হয়নি। সে সময় অভিযোগ উঠেছিল, একটি বিশেষ উদ্যোক্তা গোষ্ঠীকে সুবিধা দেওয়ার জন্যই এ আইন প্রণীত হয়েছে। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে যদি ঋণখেলাপিকে কোনো সুবিধা দিতে হয়, তাহলে তা সবার জন্যই অবারিত করা প্রয়োজন। কারণ যিনি ৫০০ কোটি টাকার ঋণখেলাপি, তিনি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। যিনি ৪৯৯ কোটি টাকার খেলাপি, তিনি কি ক্ষতিগ্রস্ত হননি? ৪৯৯ কোটি টাকার ঋণখেলাপি পুনর্গঠন সুবিধা পাওয়ার আশায় আরও এক কোটি টাকা খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি করলে কি তাকে দোষ দেওয়া যাবে? এখন শোনা যাচ্ছে, যাদের ঋণ হিসাব পুনর্গঠন করা হয়েছিল,

তার বেশিরভাগ ইতোমধ্যেই নতুন করে

খেলাপি হয়ে পড়েছেন।

দেশে ব্যাংক সেক্টরের বিদ্যমান আইন আন্তর্জাতিক মানের। কিন্তু এগুলোর যথাযথ প্রয়োগ নেই। বরং অপপ্রয়োগই হচ্ছে। ফলে এসব আইন সুফল দেওয়ার পরিবর্তে ব্যাংক সেক্টরের জন্য ডেকে আনছে বিপর্যয়। বিদ্যমান আইনগুলো বাস্তব ক্ষেত্রে ভালো ঋণগ্রহীতার কোনো কাজে আসছে না। বরং এগুলো ইচ্ছাকৃত খেলাপি ও দুষ্ট লোকের স্বার্থ রক্ষা করে চলেছে। একটি আইনের সঠিক প্রয়োগ হলে তা সুফল দিতে পারে। ঠিক একইভাবে অপপ্রয়োগ হলে তা সমাজের জন্য বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। প্রচলিত ব্যবস্থায় ভালো উদ্যোক্তা ও নিয়মিত ঋণের কিস্তি পরিশোধকারীরা হতাশ হচ্ছেন। তারা নিয়মিত কিস্তি পরিশোধে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন। কারণ তারা দেখতে পাচ্ছেন, নিয়মিত ঋণের কিস্তি পরিশোধ করলে কোনো আর্থিক লাভ নেই; বরং যারা ইচ্ছে করে কিস্তি আটকে রাখেন, তারাই আর্থিক সুযোগ-সুবিধা পেয়ে থাকেন। এ অবস্থা নিশ্চিতভাবেই নিয়মিত কিস্তি পরিশোধকারীকে হতাশ করছে। ব্যাংকগুলো তাদের পরিচালনা বোর্ডের অনুমোদনসাপেক্ষে দণ্ডসুদের শতভাগ ও সাধারণ সুদের ৫০ ভাগ পর্যন্ত মওকুফ করতে পারে। এ সুবিধা কারা পাচ্ছেন? যেসব ঋণগ্রহীতা ঋণ নেওয়ার পর নিয়মিত কিস্তি পরিশোধ করছেন না, তারাই মূলত নানা প্রক্রিয়ায় এ সুবিধা পেয়ে থাকেন। যারা নিয়মিত কিস্তি পরিশোধ করেন, তারা কিন্তু মওকুফ সুবিধা পান না। কেউ যদি বুঝতে পারেনÑতিনি ১০ বছর ঋণের কিস্তি পরিশোধ না করে আটকে রাখলে সুদ মওকুফ সুবিধা পাবেন, তাহলে কেউই কিস্তি নিয়মিত পরিশোধ করবেন না। যারা নিয়মিত কিস্তি পরিশোধ করতেন, তারাও ভাবতে পারেনÑআমি যদি কিস্তি পরিশোধ না করে আটকে রাখতাম, তাহলে মওকুফ সুবিধা পেতাম। এছাড়া ১০ বছর ঋণের কিস্তি আটকে রাখলে টাকার অবমূল্যায়নের সুবিধাও তিনি ভোগ করতে পারতেন। ঋণ হিসাব ‘পুনঃতফসিলীকরণ’ বলে একটি পদ্ধতি চালু আছে। যারা ঋণের কিস্তি নিয়মিত পরিশোধ করতে পারেন না, নির্ধারিত হারে ডাউন পেমেন্ট প্রদানের শর্তে তাদের ঋণ হিসাব পুনঃতফসিলীকরণ করে দেওয়া হয়। কোনো নিয়মিত ঋণের কিস্তি পরিশোধকারী কিন্তু পুনঃতফসিলীকরণের সুযোগ পান না। প্রথমবার ঋণ হিসাব পুনঃতফসিলীকরণ করতে হলে মোট পাওনা ঋণের ১০ শতাংশ অথবা মোট খেলাপি ঋণের ১৫ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট হিসেবে দিতে হয়। ব্যাংকগুলো তাদের বিশাল অঙ্কের খেলাপি ঋণকে নিয়মিত দেখানোর জন্য যেনতেনভাবে ঋণ হিসাব পুনঃতফসিলীকরণ করে দিচ্ছে। এ সুবিধা তিনবার পর্যন্ত নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, অতীতে কোনো কোনো ঋণগ্রহীতা তিনবারেরও বেশি এ সুবিধা নিয়েছেন। একটি ঋণ হিসাব ১২-১৩ বার পুনঃতফসিলীকরণের কথাও শোনা যায়। এমন সুবিধা কিন্তু কোনো নিয়মিত ঋণের কিস্তি পরিশোধকারী বা উদ্যোক্তা পাচ্ছেন না। এরপর রয়েছে ঋণ হিসাব অবলোপন নীতিমালা। কোনো ঋণ হিসাব মন্দ ঋণ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে পড়ার পর পাঁচ বছর অতিক্রান্ত হলে ও ব্যাংক যদি মনে করে, সে ঋণ আর আদায় হওয়ার সম্ভাবনা নেই, তাহলে উপযুক্ত আদালতে উদ্যোক্তার বিরুদ্ধে মামলাপূর্বক কতিপয় শর্তসাপেক্ষে ঋণ হিসাবটি অবলোপন করতে পারে। ‘ঋণ হিসাব অবলোপন’ কথাটি উচ্চারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মনে হতে পারে, ব্যাংক হয়তো সংশ্লিষ্ট ঋণটি মাফ করে দিয়েছে। আসলে ঋণ হিসাব অবলোপনের অর্থ ঋণ মাফ বা দাবি ত্যাগ করা নয়। শুধু ব্যাংকের মূল লেজার থেকে ঋণটি অন্যত্র সরিয়ে রাখা হয়। মূলত খেলাপি ঋণের পরিমাণ কম দেখানোর জন্যই করা হয় এটি। এটি অনেকটা সে অভিভাবকের মতোÑযার তিন সন্তানের মধ্যে দুজন সুস্থ-স্বাভাবিক; অন্যজন অসুস্থ। বাড়িতে কোনো অতিথি এলে তিনি সুস্থ ছেলে দুটিকেই পরিচয় করিয়ে দেন; অসুস্থটিকে লুকিয়ে রাখেন। তার অর্থ এ নয় যে, অসুস্থ ছেলেটি অস্তিত্বহীন। সে অস্তিত্ববান; কিন্তু দৃশ্যমান নয়। ঋণ অবলোপনও ঠিক তেমনই। এ ঋণ অস্তিত্ববান, ব্যাংকের জন্য বোঝা; কিন্তু অপ্রদর্শিত।

ব্যাংক সেক্টরের যেসব আইন নিয়ে আলোচনা করা হলো, তার কোনোটিই নিয়মিত ঋণের কিস্তি পরিশোধকারী গ্রাহকের অনুকূলে নয়। বিদ্যমান বাস্তবতায় নিয়মিত ঋণ পরিশোধকারীরা নানাভাবে হতাশ হচ্ছেন। তাদের ঋণ পরিশোধের আগ্রহ দিন দিন কমে যাচ্ছে। প্রশ্ন হলো, যারা নিয়মিত ঋণের কিস্তি পরিশোধ করছেন, তাদের জন্য কি কোনো প্রণোদনামূলক সুবিধার ব্যবস্থা করা যায় না? তাদের নতুন করে ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে জামানতের শর্ত শিথিল করা যেতে পারে। তাদের ক্ষেত্রে সুদহারও কিছুটা কমানো যেতে পারে। সাধারণভাবে সুদহার যদি ১২ শতাংশ হয়, তাহলে নিয়মিত ঋণের কিস্তি পরিশোধকারীর ক্ষেত্রে ৯ বা ১০ শতাংশ সুদ আরোপ করা যেতে পারে। এ-ছাড়া নতুন ঋণের ক্ষেত্রে তাদের দেওয়া যেতে পারে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার । মনে রাখতে হবে, বাঁধের উজানে যদি কেউ পানি ঘোলা করে, তাহলে ভাটিতে ঘোলা পানিই আসবে। কাজেই এমন একটি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে, যাতে কোনো ঋণ হিসাব খেলাপি না হয়। রোগ সৃষ্টি হওয়ার পর চিকিৎসার চেয়ে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণই উত্তম।

 

অর্থনীতিবিষয়ক কলাম লেখক