বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ ও করণীয়

সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা ও এসডিজি বাস্তবায়ন

গতকালের পর…..

বর্তমানে দেশে ব্যবসা পরিবেশ ও প্রতিযোগী সক্ষমতার বিষয়ে কিছুটা উন্নতি হয়েছে। তথাপি বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ ও এফডিআই’র লক্ষ্য অর্জন করতে হলে আরও অনেক উদ্যোগ নিতে হবে। শিক্ষাব্যবস্থা সংস্কারের লক্ষ্যে গত দু’দশকে দেশে বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো হয়েছে। কিন্তু গুণগত শিক্ষা নিশ্চিতে এ ব্যবস্থায় আবারও সংস্কারের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।

টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন একটি বড় নির্ধারক হিসেবে কাজ করে। তাই বর্তমান ডিজিটাল যুগে বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করে সরকার তথ্যপ্রযুক্তি খাতে (আইসিটি) উন্নয়নের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। একই সঙ্গে আইসিটি খাতের ক্রমবর্ধমান প্রবেশের উন্নতি সাধনে সহায়তা করে যাচ্ছে। আইসিটি খাতের উন্নয়নের ক্ষেত্রে সরকারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে এক ডজনের মতো হাইটেক পার্ক, ডিজিটাল ল্যাব, আউটসোর্সিং কেন্দ্র ও সিলিকন সিটি স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আগামী দিনে দারিদ্র্য দূরীকরণ, রফতানি আয় বৃদ্ধি ও মানব উন্নয়নের ক্ষেত্রে আইসিটি নিয়ামক ভূমিকা রাখবে। বর্তমানে দেশে অসমতা বৃদ্ধির প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। বিশেষ করে ১৯৯০ সালের পর অঞ্চলভেদে এ অসমতার ভিন্নতা দেখা যাচ্ছে। বৈশ্বিক বিবেচনায় স্বাস্থ্যসেবা খাতে বাংলাদেশের মাথাপিছু ব্যয় অনেক কম। এ ক্ষেত্রে সরকার সবার জন্য সহনীয় ব্যয়ের মধ্যে মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে চ্যালেঞ্জ অর্জনের উদ্যোগ নিয়েছে। সেজন্য সব ধরনের সংক্রামক ও অ-সংক্রামক রোগ নিয়ে নীতিনির্ধারকরা ভাবতে শুরু করেছেন।

অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে গ্রাম থেকে শহরে মানুষের অভিবাসন ক্রমাগত বাড়তে থাকবে। ২০২৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা (এলডিসি) থেকে উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় উন্নীত হওয়ার কথা। তবে এ উত্তরণের ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট রূপরেখা প্রণয়ন জরুরি। বিশেষ করে উত্তরণের ফলে বাংলাদেশ বিশ্ববাণিজ্যে কী ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হবে, তার পাশাপাশি এক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ব্যয়ের প্রাক্কলন করা প্রয়োজন। আর ২০৩০ সাল পর্যন্ত এসডিজির অর্থায়নের মতো একটি বড় ইস্যু রয়েছে। এ অভীষ্ট অর্জনে অংশীজনদের (স্টেকহোল্ডার) ভূমিকা কী হবে এবং চূড়ান্ত বিচারে আমরা কতটা সফল হব তা মূল্যায়ন প্রয়োজন।

সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার অগ্রাধিকার

তিনটি প্রতিপাদ্যের ওপর ভর করে সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছে। এক. জিডিপি প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিতকরণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও দ্রুততম সময়ে দারিদ্র্য নিরসন; দুই. উন্নয়ন প্রক্রিয়া থেকে প্রত্যেক নাগরিকের সুফল প্রাপ্তি ও তাদের ক্ষমতায়নে মোটাদাগে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক কৌশল নির্ধারণ এবং তিন. জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ ও দুর্যোগ-সহনশীল টেকসই উন্নয়ন গতিধারা নিশ্চিত করা।

সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার জাতীয় অগ্রাধিকারসমূহ:

এক. প্রবৃদ্ধি বাড়াতে বাণিজ্য ও ব্যক্তি খাতের উন্নয়নের সমন্বয়ে সহায়ক সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিবেশ নিশ্চিত করা; দুই. সব অঞ্চল ও সম্প্রদায়ের মধ্যে দারিদ্র্য ও অসমতা দূরীকরণ; তিন. টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির জন্য উৎপাদনশীল ও শোভন কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধিকরণ; চার. প্রবৃদ্ধির গতি বাড়ানো ও দারিদ্র্য কমাতে সবার জন্য গুণগত শিক্ষা

পাঁচ. স্বাস্থ্যসেবার টেকসই উন্নয়ন; বিশেষ করে অর্থনৈতিকভাবে ভঙ্গুর জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার পাশাপাশি পরিবার পরিকল্পনা ও পুনরুৎপাদী স্বাস্থ্যসেবা বৃদ্ধিকরণ; ছয়. সবার জন্য নিরাপদ সুপেয় পানির পর্যাপ্ততা ও স্যানিটেশন নিশ্চিত করা; সাত. উচ্চ প্রবৃদ্ধির জন্য অবকাঠামো উন্নয়ন; আট. জ্বালানি ও খনিজসম্পদের উৎপাদন, ভোগ ও ব্যবহারে টেকসই অবস্থান নিশ্চিত করা; নয়. জেন্ডার অসমতা দূর করার পাশাপাশি সব নারী ও কন্যার ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করা; দশ. অবনতি রোধ করে পরিবেশ সংরক্ষণ, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের সঙ্গে খাপ খাওয়ানো ও কার্বন নিঃসরণের মতো বিষয় প্রশমনের বিষয়টি নিশ্চিত করা এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা; এগারো. টেলিফোন ও ব্রডব্যান্ড সেবার মাধ্যমে ডিজিটাল যোগাযোগব্যবস্থায় অভিগম্যতা বাড়ানো; বারো. উন্নত নগর ব্যবস্থাপনা ও বিভিন্ন পরিষেবার উন্নয়ন ঘটিয়ে নগর অঞ্চলে দারিদ্র্য কমানোর পাশাপাশি বসবাস ব্যবস্থার উন্নয়ন; তেরো. সবার জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক, স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও কার্যকর গণতান্ত্রিক শাসন পদ্ধতির উন্নয়ন ও ন্যায়বিচার নিশ্চিতকরণ; চৌদ্দো. টেকসই

উন্নয়নের জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও অংশীদারিত্ব শক্তিশালীকরণ। সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার উন্নয়ন অগ্রগতি সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছয় শতাংশ প্রবৃদ্ধির বৃত্ত ভেঙে গড়ে সাত দশমিক চার শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন। এ পরিকল্পনার অন্তর্ভুক্ত সময়ের মধ্যে গত দুই অর্থবছরে ধারাবাহিকভাবে এ লক্ষ্য অর্জন হয়েছে। সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার অগ্রগতি তিন পর্যায়ে ভাগ করা যেতে পারে। প্রথমত, যেসব লক্ষ্য অর্জিত হয়েছেÑসেগুলোকে ‘ভালো’ অর্জন হিসেবে চিহ্নিতকরণ; দ্বিতীয়ত, যেসব লক্ষ্য অর্জনের পর্যায়ে রয়েছে এবং তৃতীয়ত, যেসব লক্ষ্য অর্জনে বাংলাদেশ এখনও অনেক পিছিয়ে রয়েছে। তৃতীয় ভাগকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। আর এ ক্ষেত্রে একমাত্র নির্দেশক হালনাগাদ উপাত্ত যে বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন অধিকতর।

সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় যেসব লক্ষ্য অর্জনে সাফল্য এসেছে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে

ক. জিডিপি প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যের চেয়ে বেশি হয়েছে। বিশেষ করে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে সাত দশমিক দুই শতাংশ লক্ষ্যের বিপরীতে সাত দশমিক ২৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে; খ. সেবা খাতে স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধি হয়েছে; গ. ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ ঘাটতি পূরণ করতে সক্ষম হয়েছে সরকারি বিনিয়োগ এবং সার্বিক বিনিয়োগ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে তা সহায়ক হয়েছে; ঘ. দুবছরের বড় সাফল্য হলো মূল্যস্ফীতি ছয় শতাংশের নিচে রাখা সম্ভব হয়েছে; ঙ. কারিগরি ও ভোকেশনাল পদ্ধতির শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষার্থীর হার উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে ১৪ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। তবে এ ক্ষেত্রে নারী শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ এখনও সন্তোষজনক নয়; চ. ১৫ বছরের বেশি বয়সী জনগোষ্ঠীর মধ্যে সাক্ষরতার হার ৬৬ দশমিক ৯ শতাংশ লক্ষ্যের বিপরীতে ৭২ দশমিক তিন শতাংশ অর্জিত হয়েছে; ছ. পাঁচ বছরের নিচের বয়সী শিশু ও নবজাতক মৃত্যুহার কমার ক্ষেত্রে ব্যাপক অগ্রগতি হয়েছে। ২০১৬ সালে পাঁচ বছরের নিচের শিশুমৃত্যুর হার কমে নেমে এসেছে প্রতি হাজারে ৩৫ জন। আর নবজাতক মৃত্যুহার নেমে এসেছে ২৮ জনে। এক্ষেত্রে লক্ষ্যের চেয়ে ভালো করেছে বাংলাদেশ। লক্ষ্য ছিল প্রতিহাজারে যথাক্রমে ৪৩ ও ৩২ জন; জ. ২০১৪ সালে নারীপ্রতি শিশুর সংখ্যা ছিল দুই দশমিক তিনজন। ২০১৬ সালে তা দুই দশমিক একজনে নেমে এসেছে; ঞ. প্রত্যাশিত আয়ুষ্কাল ক্রমাগত হারে বাড়ছে। ২০১৬ সালে এটি ৭১ দশমিক ছয় বছরে উন্নীত হয়েছে; ট. বর্তমানে মোট জনগোষ্ঠীর বৃহৎ অংশই স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগার ব্যবহারের সুবিধা পাচ্ছে। ২০১৫ সালে এ হার ছিল ৬৪ দশমিক দুই শতাংশ। এক বছরের ব্যবধানে তা বেড়ে ২০১৬ সালে ৭৫ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।

যেসব লক্ষ্য অর্জন প্রক্রিয়াধীন, সেগুলো হলো

ক. শিল্প খাতে দুই অংকের প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্য রয়েছে। এ লক্ষ্য অর্জনের খুব কাছাকাছি পর্যায়ে রয়েছে; খ. বাজেট ঘাটতি মোটামুটি জিডিপির পাঁচ শতাংশের মধ্যে রয়েছে, যা লক্ষ্যের মধ্যেই আছে; গ. রফতানি ও আমদানি দক্ষতা যথাযথ পথেই রয়েছে; ঘ. লক্ষ্যের সঙ্গে সংগতি রেখে সামাজিক সুরক্ষা খাতে সরকারি বিনিয়োগ বাড়ছে; ঙ. প্রাথমিক ও নি¤œমাধ্যমিকে মেয়ে শিক্ষার্থীর নিট ভর্তির হার লক্ষ্যের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ; চ. প্রাথমিক শিক্ষা স¤‹ন্ন করার হার ভিত্তি বছরের তুলনায় বেড়েছে। তবে তা লক্ষ্যের চেয়ে কিছুটা পিছিয়ে; ছ. গ্রাম ও শহরে মানুষের নিরাপদ সুপেয় পানি প্রাপ্যতার হার অনেক বেড়েছে। তবে এখনও এ ক্ষেত্রে লক্ষ্য অর্জন হয়নি; জ. বর্তমানে ৮৭ শতাংশ খানায় বিদ্যুৎ সংযোগ রয়েছে। এটি শতভাগে উন্নীত হতে আরও সময় লাগবে;

যেসব ক্ষেত্রে বেশি মনোযোগ প্রয়োজন, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে

ক. ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ আশানুরূপ বৃদ্ধি না পাওয়া একটি উদ্বেগের বিষয়। ২০১৬ সালে ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ ছিল মোট জিডিপির ২২ দশমিক ৯৯ শতাংশ, যা দেশের মোট বিনিয়োগের ৭৭ দশমিক ৫৪ শতাংশ। যদিও ওই সময় ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগের লক্ষ্য ছিল ২৩ দশমিক সাত শতাংশ। বিনিয়োগ ঘাটতির এ ধারা ২০১৭ সালেও অব্যাহত ছিল। বছরটিতে ২৩ দশমিক ৯ শতাংশ লক্ষ্যের বিপরীতে বিনিয়োগ হয়েছে জিডিপির অনুপাতে ২৩ দশমিক এক শতাংশ, যা মোট বিনিয়োগের ৭৫ দশমিক ৭১ শতাংশ। সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় এ খাতের লক্ষ্য ছিল ৭৭ দশমিক ২৭ শতাংশ; খ. কৃষি খাতে প্রত্যাশার তুলনায় প্রবৃদ্ধির গতি কিছুটা শ্লথ রয়েছে; গ. গত বছর প্রবাসী-আয় (রেমিট্যান্স) আগের বছরের তুলনায় কম ছিল। ২০১৬ সালে দেশে আসা রেমিট্যান্সের হার ছিল জিডিপির ছয় দশমিক সাত শতাংশ। ২০১৭ সালে তা কমে নেমে আসে পাঁচ দশমিক এক শতাংশে। যদিও ওই দুই বছরে রেমিট্যান্সের লক্ষ্য ছিল জিডিপির আট শতাংশ। এটি একটি চ্যালেঞ্জ। তবে আশার কথা, চলতি বছর থেকে আবার রেমিট্যান্স প্রবাহ ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে; ঘ. আরেকটি চ্যালেঞ্জের বিষয় হলো বিশ্বের যেসব দেশে কর-জিডিপি অনুপাত সবচেয়ে কম, বাংলাদেশ সেগুলোর অন্যতম। গত দুবছরে প্রত্যাশিত লক্ষ্যের চেয়ে অনেক কম ছিল এ অনুপাত। তথাপি দুবছরে রাজস্ব আহরণে যথাক্রমে ১৭ দশমিক ৯ ও ২৬ দশমিক ছয় শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে; ঙ. যদিও সাম্প্র্রতিক সময়ে সরকারি বিনিয়োগ অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে, তবুও মাথাপিছু রাষ্ট্রীয় ব্যয় আরও বাড়ানো দরকার; চ. শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাতের দিক থেকেও আমরা পিছিয়ে। আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী প্রতি ৪৬ শিক্ষার্থীর বিপরীতে একজন শিক্ষক থাকবেন। কিন্তু এ ক্ষেত্রে ৬১ দশমিক আট শতাংশ লক্ষ্য অর্জিত হয়েছে। যদিও লক্ষ্য ছিল ৭০ শতাংশ; ছ. একটি বিষয় নতুন করে উদ্বেগের জš§ দিয়েছে। তা হলোÑপ্রসবকালীন মাতৃমৃত্যু। ২০১৩ সালে প্রতি লাখে এ হার ছিল ১৭০। ২০১৬ সালে তা বৃদ্ধি পেয়ে ১৭৮ জনে পৌঁছায়, জ. এ ছাড়া জš§হার নির্দিষ্ট সীমায় রাখা ও প্রসূতিসেবা ব্যবস্থাপনায় জোর মনোযোগ দিতে হবে।

জাতিসংঘ ঘোষিত ২০৩০ এজেন্ডা বাস্তবায়নে বাংলাদেশ: সরকার ঘোষিত সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা (২০১৬-২০) দলিলে টেকসই উন্নয়ন অভীষ্টগুলো সংযুক্ত করার মাধ্যমে এসডিজি অর্জনের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এ দিক থেকে বাংলাদেশ এসডিজি অর্জনের প্রক্রিয়া অনেকের চেয়ে আগে শুরু করেছে। বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় গতি আনতে এসডিজি কর্মপরিকল্পনা (অ্যাকশন প্ল্যান) প্রণয়ন করা হয়েছে। এ কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে ‘এসডিজি বাস্তবায়ন ও পর্যবেক্ষণ কমিটি’ গঠন করা হয়েছে। দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য এসডিজি বাস্তবায়ন কৌশল ও পরিকল্পনা প্রণয়নে সরকারের ফোকাল পয়েন্ট হিসেবে কাজ করছে পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি)।

এসডিজি অর্জনে সবাইকে সম্পৃক্তকরণ

এমডিজির তুলনায় এসডিজি অনেক ব্যাপক একটি আন্তর্জাতিক এজেন্ডা ও এতে উন্নয়নের সব দিক অন্তর্ভুক্ত । ফলে কেবল সরকারের পক্ষে এ এজেন্ডা অর্জন সম্ভব নয়। এসব দিক বিবেচনায় সরকার এসডিজি অর্জনে ‘সমগ্র সমাজ’ভিত্তিক উদ্যোগ নেওয়ার প্রক্রিয়া হাতে নিয়েছে। যাতে সমাজের সব স্তরের মানুষকে এসডিজি অর্জনে ভূমিকা রাখার অংশীদার করা যায়। এ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে সমাজের বিভিন্ন স্তরের প্রতিনিধির সঙ্গে বেশ কয়েকটি পরামর্শ সভা করা হয়েছে। পরামর্শ সভায় অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ছিলেন সংসদ সদস্য, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার (এনজিও) প্রতিনিধি, সুশীল সমাজ, ব্যবসায়ী সম্প্রদায়, উন্নয়ন সহযোগী, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, পেশাজীবী, শ্রমিক সংগঠন, নারী প্রতিনিধি ও গণমাধ্যম।

উপাত্তের ঘাটতি বিশ্লেষণ: এসডিজি অর্জনের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের জন্য যেসব উপাত্ত দরকার, সেটির বিষয়ে একটি সমন্বিত বিশ্লেষণ সম্পন্ন করে উপাত্তের ঘাটতিগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে। সে বিশ্লেষণ প্রতিবেদনের নাম দেওয়া হয়েছে ‘টেকসই উন্নয়ন অভীষ্টের (এসডিজি) জন্য উপাত্তের ঘাটতি বিশ্লেষণ: বাংলাদেশ প্রেক্ষিত’। ওই বিশ্লেষণে দেখা যায়, এসডিজির অগ্রগতি পর্যালোচনার ক্ষেত্রে যেসব উপাত্ত দরকার, তার উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ঘাটতি রয়েছে। এসডিজির মোট ১৬৯টি লক্ষ্যের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণের জন্য ২৪১টি সূচক (কিছু সূচক একাধিকবার ব্যবহার করা হয়েছে) নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৭০টি  সূচকের জন্য প্রয়োজনীয় উপাত্ত প্রস্তুত আছে, ১০৮টির ক্ষেত্রে আংশিক ও ৬৩ সূচকের জন্য প্রয়োজনীয় কোনো উপাত্ত নেই।

এসডিজি অর্থায়ন কৌশল: বাংলাদেশ প্রেক্ষিত: ‘এসডিজি অর্থায়ন কৌশল: বাংলাদেশ প্রেক্ষিত’ শিরোনামে একটি গবেষণা সম্পন্ন করেছে জিইডি। এতে এসডিজির সফল বাস্তবায়নে বাংলাদেশের কী পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন হবে এবং কোন উৎস থেকে তার জোগান পাওয়া যাবে সে বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে। ২০১৫-১৬ অর্থবছরের স্থিরমূল্যের ভিত্তিতে প্রতিটি অভীষ্ট ও লক্ষ্যভিত্তিক প্রয়োজনীয় অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ের কাঠামো বর্ণনা করা হয়েছে। এর মাধ্যমে ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের গড় জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৯ শতাংশে উন্নীত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। আর সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় লক্ষ্য ধরা হয়েছে সাত শতাংশের ওপরে বার্ষিক গড় প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য।

গবেষণা প্রতিবেদনে এসডিজি অর্জনের যে ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে, তাতে দেখা যায়Ñবিদ্যমান বিনিয়োগের বাইরে ২০১৭ থেকে ২০৩০ সাল পর্যন্ত মোট ৯২৮ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত অর্থায়ন প্রয়োজন হবে। সরকারি, বেসরকারি খাত ও আন্তর্জাতিক উৎস থেকে এ অর্থের জোগান নিশ্চিত করতে হবে। ২০১৫-১৬ ভিত্তি বছরে এ প্রাক্কলন করা হয়েছে। সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় যে সম্প্রসারিত প্রবৃদ্ধি প্রাক্কলন করা হয়েছে, তার ভিত্তিতে হিসাব করা মোট পুঞ্জীভূত জিডিপির ১৯ দশমিক ৭৫ শতাংশের সমান এ অর্থ। এসডিজি অর্জনে বার্ষিক অতিরিক্ত অর্থ দরকার হবে ৬৬ দশমিক ৩২ বিলিয়ন ডলার। (চলবে)

 

লেখক: বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) সদস্য (জ্যেষ্ঠ সচিব) ও দারিদ্র্য বিমোচন বিষয়ে সরকারের ফোকাল পয়েন্ট

 

গত ১৭ জানুয়ারি বাংলাদেশ উন্নয়ন ফোরামের বৈঠকে ইংরেজিতে উপস্থাপিত প্রধান প্রতিবেদন

ভাষান্তর: মাসুম বিল্লাহ