বৃষ্টি, ব্লাস্ট ও বোরো ধানের লাভ-ক্ষতি

নিতাই চন্দ্র রায়: বাংলাদেশে উৎপাদিত চালের শতকরা ৫৪ ভাগ আসে বোরো মৌসুম থেকে। তাই বোরো মৌসুমে উৎপাদিত ধানের ওপর বহুলাংশে নির্ভর করে দেশটির খাদ্য নিরাপত্তা ও চালের বাজারমূল্য। গত বছর বোরো মৌসুমে মার্চ-এপ্রিল মাসে অকাল বন্যায় বাঁধ ভেঙে তলিয়ে যায় হাওরাঞ্চলের পাকা বোরোধান। সরকারের হিসাবমতে, ফসল রক্ষা বাঁধ ভেঙে ১৫৪ হাওরের দুই লাখ ২৩ হাজার ৮২ হেক্টর জমির বোরো ধান ডুবে যায়। ক্ষতিগ্রস্ত হয় এক লাখ ৬১ হাজার হেক্টর জমির ফসল। তবে কৃষকদের হিসাবে এ ক্ষতির পরিমাণ আরও বেশি। এছাড়া দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে অতিবৃষ্টি ও ব্লাস্ট রোগের আক্রমণে বোরোধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়। এ জন্য সারা বছরই বাজারে
ধান-চালের দাম ছিল বেশি গুনতে হয়। গত বছরের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে এ মৌসুমে নতুন উদ্যমে বোরো ধানের চাষ করেছিলেন হাওরাঞ্চলসহ সারা দেশের কৃষকেরা। চারা রোপণের শুরুতে তীব্র শীতের কারণে রোপণ করা চারা হলুদ হয়ে মারা গেলে অনেক কৃষককে মরা চারার শূন্যস্থান পূরণ করতে হয়। কিন্তু এবার দুর্ভাগ্য পিছ ছাড়েনি বোরো ধান চাষিদের। দিনে গরম, রাতে ঠাণ্ডা ও সকালে শিশির পড়ায় মৌসুমের শেষ দিকে এবারও দেখা দেয় সর্বনাশা ব্লাস্ট রোগের প্রাদুর্ভাব। ফলে এ বছরও বোরো ফসল নিয়ে আতঙ্কে দিন অতিবাহিত করছেন ধানচাষিরা।
এখন পর্যন্ত সারা দেশে ৬০ থেকে ৭০ ভাগ বোরো ধান কাটা হয়েছে। গত কয়েক দিনের অতিবৃষ্টি ও ঝোড়ো বাতাসে অধিকাংশ ধানগাছ হেলে পড়েছে। কোথাও কোথাও তলিয়ে গেছে পাকা ধান। এ অবস্থায় ধান কাটার জন্য শ্রমিকের মজুরি গেছে অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে। দৈনিক ৬০০ টাকা মজুরি ও তিন বেলা খাবার দিয়েও ধান কাটার জন্য শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, ব্লাস্টের প্রাদুর্ভাবে হাওরাঞ্চলের জেলাগুলোর মধ্যে শুধু সুনামগঞ্জেই এবার বোরোর ফলন ১০ শতাংশ নষ্ট হতে পারে। অন্যদিকে স্থানীয়দের কথা রোগটির বিস্তার ঠেকাতে না পারলে এ ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে। জানা গেছে, সিলেট বিভাগের চার জেলার হাওর অঞ্চল বিশেষ করে সুনামগঞ্জ এবং দেশের উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলের জেলাসহ ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, শেরপুর, জামালপুর, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর, সাতক্ষীরা, কুড়িগ্রাম ও দিনাজপুরসহ অনেক জেলাতে এ বছর কম-বেশি ব্লাস্টের প্রাদুর্ভার দেখা দিয়েছে। গত দু’বছর বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলসহ সারা দেশে বোরো ধানে ব্লাস্ট রোগের ব্যাপক আক্রমণ দেখা দেয়। বিশেষ করে ব্রিধান-২৮ জাতের বোরো ধানে এ রোগের আক্রমণ বেশি পরিলক্ষিত হয়। ফলন ও গুণগত মান বিবেচনায় স্বল্প জীবনকালের ধানের এ জাতটি কৃষকের কাছে খুবই জনপ্রিয় ও সমাদৃত। এক তথ্যে জানা যায়, বোরো মৌসুমে দেশের আবাদি ৪১ ভাগ জমিতে এবং আউস মৌসুমে ২৯ ভাগ জমিতে ব্রিধান-২৮-এর চাষ হয়। ব্রিধান-২৮ ছাড়াও এ বছর বিআর-২৬, ব্রিধান-২৯, ব্রিধান-৫০, ব্রিধান-৬১ ও ব্রিধান-৬৩-সহ অন্যান্য জাতের ধানেও ব্লাস্টের আক্রমণ দেখা যায়। তবে উচ্চ ফলনশীল বোরো ধানের জাতের মধ্যে ব্রিধান-৫৮ ও ব্রিধান-৬৩ জাতে ব্লাস্ট রোগ পরিলক্ষিত হয়নি। এ ছাড়া যেসব কৃষক রোগ প্রতিরোধের জন্য অনুমোদিত ছত্রাকনাশক ব্যবহার করেছেন তাদের জমিতে এ রোগের আক্রমণ কম হয়েছে। পাতা ব্লাস্ট, গিঁট ব্লাস্ট ও শিষব্লাস্টের মধ্যে নেক বা শিষব্লাস্ট ধানের সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করে। এ রোগের আক্রমণে শতকরা ৮০ ভাগ এমনকি শতভাগ পর্যন্ত ফলন নষ্ট হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে এ রোগের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হওয়ায় গত দু’বছর ধানে ব্লাস্ট রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। দিনের বেলা গরম, রাতে ঠাণ্ডা ও ভোরে শিশির, জমিতে অতিরিক্ত ইউরিয়া সারের ব্যবহার এবং প্রয়োজনের তুলনায় কম পটাশ সার ব্যবহারের কারণে এ রোগের প্রকোপ বেড়েছে। ধান বিজ্ঞানীদের মতে এ রোগ দমনে জমিতে জৈব সার ব্যবহার করতে হবে। জমিতে পানি ধরে রাখতে হবে। রোগমুক্ত জমি থেকে বীজ সংগ্রহ করতে হবে। রোগসহনশীল জাতের চাষ করতে হবে। সুষম মাত্রায় সার প্রযোগ করতে হবে। আক্রান্ত জমিতে ইউরিয়া সারের প্রয়োগ সাময়িক বন্ধ রেখে প্রতি হেক্টরে ৪০০ গ্রাম ট্রুপার বা নেটিভো নামক ছত্রাকনাশক ১০-১৫ দিনের ব্যবধানে দুবার স্প্রে করতে হবে। কোনো এলাকায় রোগের অনুকূল আবহাওয়া অর্থাৎ কুয়াশাচ্ছন্ন মেঘলা আকাশ ও গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি দেখা দিলেই ধানে থোড় আসার পর একবার এবং ফুল আসার পর আরেকবার অনুমোদিত মাত্রায় নির্দিষ্ট ছত্রাকনাশক শেষ বিকালে স্প্রে করতে হয়, কিন্তু এটি ব্যয়বহুল হওয়ায় অনেক কৃষক তা করতে চান না।
বিশ্বব্যাংকের ‘কমোডিটি আউট লুক: ২০১৮’-তে বাংলাদেশে চাল উৎপাদন-সংক্রান্ত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, দুই দফা বন্যায় গত বছর দেশের চাল উৎপাদন বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হয়। এতে চালের উৎপাদন কমে যায় ১৯ লাখ মেট্রিক টন। এর প্রভাবে দেশের প্রধান খাদ্যশস্যটির উৎপাদন ছয় বছরের মধ্যে সর্বনি¤œ পর্যায়ে নেমে আসে। উৎপাদন ঘাটতি মেটাতে সরকার চাল আমদানিতে শুল্ক তুলে দেওয়াসহ নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করে, যার ফলে চালের আমদানি বেড়ে যায় ৩৬ গুণ। তবে আমদানির উল্লেখযোগ্য কোনো প্রভাব চালের বাজারে দেখা যায়নি। ফলে প্রায় এক বছর ধরেই অস্থির ছিল দেশের চালের বাজার। প্রতিবেদনে উল্লেখ, ২০১৫ ও ২০১৫ সালে দেশটিতে চালের উৎপাদন ছিল যথাক্রমে তিন কোটি ৪৫ লাখ ও তিন কোটি ৪৬ লাখ মেট্রিক টন। দুই দফা বন্যায় গত বছর চালের উৎপাদন কমে দাঁড়ায় তিন কোটি ২৭ লাখ মেট্রিক টন। অর্থাৎ উৎপাদন প্রায় সাড়ে পাঁচ শতাংশ কম। এর আগে ২০১০ সালে দেশে চালের উৎপাদন ছিল তিন কোটি ১৭ লাখ মেট্রিক টন। পরের বছর তা বেড়ে দাঁড়ায় তিন কোটি ৩৮ লাখ মেট্রিক টনে। এ ছাড়া ২০১২ সালে দেশে চালের উৎপাদন ছিল তিন কোটি ৪৪ লাখ মেট্রিক টন। এ হিসাবে চালের উৎপাদন গত ছয় বছরের মধ্যে সর্বনি¤œ পর্যায়ে নেমে আসে।
স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশে চালের উৎপাদন বাড়তে থাকে। ১৯৭০-৭১ সালে দেশে চালের উৎপাদন ছিল এক কোটি ১১ লাখ মেট্রিক টন। পরের ১০ বছরে দেশে চালের উৎপাদন বেড়েছে ২৮ লাখ মেট্রিক টন। ফলে সে বছর ১৯৮০-৮১ সালে দেশে চাল উৎপাদিত হয় এক কোটি ৩৯ লাখ মেট্রিক টন। একইভাবে পরবর্তী তিন বছরে চালের উৎপাদন বেড়েছে যথাক্রমে ৪০ লাখ, ৭২ লাখ ও ৬৬ লাখ মেট্রিক টন। এতে ২০১০-১১ সালে উৎপাদন বেড়ে দাঁড়ায় তিন কোটি ১৭ লাখ মেট্রিক টনে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের হিসাবেও গত অর্থবছরে দেশে ধানের উৎপাদন কমেছে। সংস্থাটির মতে, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে দেশে মোট চাল উৎপাদিত হয় তিন কোটি ৪৭ লাখ মেট্রিক টন এবং ২০১৬-১৭ অর্থবছরে উৎপাদন কমে দাঁড়ায় তিন কোটি ৩৮ লাখ মেট্রিক টন। অর্থাৎ এক বছরে উৎপাদন হ্রাস পায় ৯ লাখ মেট্রিক টন।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, গত বছর কয়েক মাসের ব্যবধানে দুটি বন্যার প্রভাব পড়ে চালের বাজারে, যদিও বন্যা বেশি স্থায়ী না হওয়ায় চালের ক্ষতি হয় তুলনামূলকভাবে কম। তবে এর সঙ্গে যুক্ত হয় সরকারের মজুদ কমে যাওয়ার বিষয়টি। আর এর সুযোগ নেন কিছু ব্যবসায়ী। ফলে আমদানি দ্রুত বাড়লেও চালের দামে কোনো প্রভাব পড়েনি। গত বছর দেশে চালের আমদানি বেড়ে দাঁড়ায় ৩৬ লাখ মেট্রিক টন। অথচ এর আগের বছর দেশে চাল আমদানি হয়েছিল মাত্র এক লাখ মেট্রিক টন। এ হিসাবে এক বছরে চালের আমদানি বেড়ে দাঁড়ায় ৩৬ গুণ। এর আগে ২০১০ সালে সর্বোচ্চ ১৩ লাখ টন চাল আমদানি করা হয়েছিল।
চলতি বছর বোরো মৌসুমে ১০ লাখ মেট্রিক টন ধান-চাল সংগ্রহ করবে সরকার। এ বছর সরকারিভাবে ধানের কেজিপ্রতি দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ২৬ টাকা এবং চালের কেজিপ্রতি দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৮ টাকা। ২ মে থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত সরকারিভাবে এই ধান-চাল সংগ্রহ করা হবে। এবার বোরো চালের কেজিপ্রতি উৎপাদন খরচ ধরা হয়েছে ৩৬ টাকা এবং ধানের উৎপাদন খরচ ধরা হয়েছে কেজিপ্রতি ২৪ টাকা। গত বছর ২৪ টাকা কেজি দরে সাত লাখ টন ধান এবং ৩৪ টাকা কেজি দরে আট লাখ টন চাল সংগ্রহ করা হয় সরকারিভাবে।
ত্রিশাল চরপাড়া গ্রামের কৃষক মো. আবদুল মতিন মুন্সী এবার এক একর জমিতে ব্রিধান-২৮ চাষ করেন। তিনি জানান, প্রতি বিঘা জমিতে তার ধান উৎপাদিত হয়েছে ১৫ মণ। ধান রোপণ থেকে মাড়াই ও শুকানো পর্যন্ত প্রতি বিঘায় তার খরচ হয়েছে সাড়ে সাত হাজার টাকা। বর্তমানে প্রতি মণ ধান বিক্রি হচ্ছে ৬০০ টাকায়। সে হিসাবে ১৫ মণ ধানের বিক্রয় মূল্য ৯ হাজার টাকা। নিট লাভ দেড় হাজার টাকা, যা অন্য ফসলের তুলনায় অত্যন্ত কম। তার মতে, বাজারে প্রতি মণ ধানের দাম হওয়া উচিত কমপক্ষে নয়শ থেকে এক হাজার টাকা। তা হলে কৃষক ধান চাষে আগ্রহী হবেন এবং দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। গতবছর থেকে দেখা যাচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে বৈশাখের শুরু থেকেই সারা দেশে অতিবৃষ্টি ও ঝোড়ো হাওয়ার জন্য কৃষক সময়মতো বোরো ধান কেটে শুকাতে পারছেন না। অনেক সময় শিলাবৃষ্টির কারণেও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বোরো ধান। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সংগতি রেখে বোরো মৌসুমে আমাদের এমন জাত উদ্ভাবন করতে হবে, যেগুলো ফাল্গুনের শেষে পাকে এবং কৃষক চৈত্র মাসের মধ্যে মাড়াই করে ও শুকিয়ে নিরাপদে গোলাজাত করতে পারেন। তবে জাতগুলো হতে হবে ব্লাস্ট রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন।

সাবেক মহাব্যবস্থাপক (কৃষি)
নর্থবেঙ্গল সুগার মিলস্
netairoy18Ñyahoo.com