ইতিকাফ ভঙ্গের কারণ

হাফেজ মাওলানা নাসির উদ্দিন:  ইতিকাফকারী ব্যক্তি অন্য মসজিদে খতমে তারাবির জন্য গেলে ইতিকাফ ভেঙে যাবে এবং বিনা প্রয়োজনে মসজিদের বাইরে গেলে, যদিও তা অল্প সময়ের জন্য হয়, তাহলেও ইতিকাফ ভেঙে যাবে। (ফাতওয়ায়ে আলমগীরী ১/২১২)। কোনো কারণে রোজা ভেঙে গেলে বা রোজা রাখতে না পারলে ইতিকাফ ভেঙে যাবে। কারণ সুন্নত ও ওয়াজিব ইতিকাফের জন্য রোজা জরুরি। (ফাতওয়ায়ে শামি ২/৪৪২)। জানাজার জন্য মসজিদ থেকে বের হলে ইতিকাফ ভেঙে যাবে। (ফাতওয়ায়ে আলমগীরী ১/২১২)। কোনো মানুষের কোনো নেতার ভয়ে নয়, ‘আল্লাহ আমাকে নিষেধ করেছেন’ এই ভয়ে কোনো কাজ থেকে বিরত থাকার নাম হচ্ছে ‘তাকওয়া’। আর এই গুণ যারা অর্জন করতে পারে, তাদের বলা হয় ‘মুত্তাকি’। সিয়াম সাধনার মাধ্যমে আল্লাহ আমাদের তাকওয়ার প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। পিপাসার্ত, ক্ষুধার্ত ঘরেও খাবারের আয়োজন আছে। ইচ্ছা করলেই খাবার বা পানাহার করা যায়। কেউ দেখবেন না; কিন্তু আল্লাহ দেখবেন এই ভয় ভেতরে কাজ করে যে আল্লাহর নিষেধ আছে, এটাই তাকওয়া। এ জন্য সিয়াম সাধনা করতে হয় একমাত্র আল্লাহকে খুশি করার জন্য। এভাবে কোনো বান্দা যদি ৩০ দিন তাকওয়ার প্রশিক্ষণ নেয়, তাহলে সে পরিপূর্ণ মুত্তাকি হয়ে যাবে ইনশাল্লাহ। এটাই হচ্ছে রমজানের সবচেয়ে বড় উদ্দেশ্য। মুত্তাকি ব্যক্তিই আল্লাহ কাছে সবচেয়ে বেশি প্রিয়। এ সম্পর্কে ইরশাদ হচ্ছে, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে সে-ই সর্বাধিক প্রিয়, যে সর্বাধিক মুত্তাকি বা পরহেজগার।’ (সুরা হুজুরাত, আয়াত ১৩) ইতিকাফের গুরুত্ব ও ফজিলত আল্লাহতায়ালার নৈকট্য লাভ ও সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য নির্দিষ্ট সময় মসজিদে (নারীদের জন্য স্বীয় ঘরে নামাজের স্থানে) অবস্থান করাকে ইতিকাফ বলে। ইতিকাফ তিন প্রকার। (ক) ওয়াজিব ইতিকাফ: কোনো কাজের ওপর ইতিকাফ মান্নত করলে সেই ইতিকাফ ওয়াজিব হয়। যেমন কেউ যদি বলে আমার এ কাজটি হয়ে গেলে আমি এত দিন ইতিকাফ করব। (খ) সুন্নত ইতিকাফ: রমজানের শেষ ১০ দিনের ইতিকাফকে সুন্নত বলা হয়। নবী করিম (সা.) প্রতি বছর রমজানের শেষ ১০ দিন ইতিকাফে বসতেন। (গ) নফল ইতিকাফ: এই ইতিকাফের জন্য কোনো দিন বা সময় নির্দিষ্ট নেই। যতক্ষণ বা যতদিন ইচ্ছা করা যাবে। এমনকি কেউ সারা জীবনের ইতিকাফের নিয়ত করলেও তা জায়েজ হবে। পুরুষের জন্য ইতিকাফের সর্বোত্তম স্থান হলো মক্কার মসজিদে হারাম। তারপর মসজিদে নববী। তারপর বাইতুল মুকাদ্দাস। এরপর জামে মসজিদ বা মহল্লার মসজিদ। ইতিকাফ একটি মহান ইবাদত। মদিনায় অবস্থানকালীন সময়ে নবী করিম (সা.) প্রতিবছরই ইতিকাফ পালন করতেন। দাওয়াত, তরবিয়ত, শিক্ষা ও জিহাদে ব্যস্ত থাকা সত্ত্বেও রমজান মাসে তিনি ইতিকাফ ছাড়েননি। ইতিকাফ ঈমানি তরবিয়তের একটি পাঠশালা এবং নবী করিম (সা.)-এর হিদায়েতি আলোর একটি প্রতীক। ইতিকাফ অবস্থায় বান্দা নিজেকে আল্লাহর ইবাদতের জন্য দুনিয়ার অন্যান্য সব বিষয় থেকে নিজেকে আলাদা করে নেয়। ঐকান্তিকভাবে মশগুল হয়ে পড়ে আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের নিরন্তর সাধনায়। ইতিকাফ ঈমান বৃদ্ধির একটি মুখ্য সুযোগ। সবার উচিত এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে নিজের ঈমানি চেতনাকে শাণিত করে তোলা ও উন্নততর পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করা। পবিত্র কোরআনে ইতিকাফ সম্পর্কে বর্ণনা এসেছে: হজরত ইবরাহিম (আ.) ও হজরত ইসমাইল (আ.)-এর কথা উল্লেখ করে এরশাদ হচ্ছে, ‘এবং আমি ইবরাহিম ও ইসমাইলকে আদেশ করলামÑতোমরা আমার গৃহকে তাওয়াফকারী, ইতিকাফকারী ও রুকু-সেজদাকারীদের জন্য পবিত্র করো।’ (সুরা বাকারাহ, আয়াত ১২৫)। ইতিকাফ তো কোরআনে উল্লেখ আছে, তা এক ধরনের (আল্লাহর হুকুম বললেও চলে); এমনকি কোনো মসজিদ ইতিকাফশূন্য থাকলে পুরো এলাকাবাসী গুনাহগার হবে। হাদিস শরিফে আছে, ‘নবী করিম (সা.) রমজানের শেষ ১০ দিন ইতিকাফ করতেন।’ (বুখাীি শরিফ, ২০২১; মুসলিম শরিফ ১১৭১)। যে ব্যক্তি রমজানের (শেষ) ১০ দিন ইতিকাফ করবে, তার জন্য দুটি হজ ও দুটি ওমরার সমতুল্য সওয়াব হবে। (বায়হাকি শরিফ)
ইতিকাফের উপকারিতা
ইতিকাফকারী অবসর সময়ে কোনো আমল না করলেও তার দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা ইবাদত হিসেবেই গণ্য হবে। ইতিকাফের বদৌলতে অনেক গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা যায়। পাপাচারের সয়লাব থেকে বেঁচে থাকার জন্য আল্লাহতায়ালার ঘর যেন একটি প্রকৃত দুর্গ। ইতিকাফ দ্বারা দুনিয়ার বহু ঝামেলা থেকে মুক্ত করে নিজেকে পুরোপুরি আল্লাহতায়ালার কাছে সঁপে দেওয়া হয়। রোজার কারণে পুরো দিন ফেরেশতাদের সঙ্গে (পানাহার ও যৌনকর্ম বর্জন দ্বারা) সামঞ্জস্য হয়। আর ইতিকাফ দ্বারা ২৪ ঘণ্টা ফেরেশতাসুলভ আচরণের ওপর অবিচল থাকার চমৎকার প্রশিক্ষণ অর্জন হয়। রোজার যাবতীয় আদব ও হক যথাযথ আদায় করে পরিপূর্ণ রোজা আদায়ের জন্য ইতিকাফ যথেষ্ট কার্যকর। আল্লাহতায়ালার মেহমান হয়ে তাঁর সঙ্গে মহব্বত ও ভালোবাসা সৃষ্টির অন্যতম মাধ্যম। মসজিদে অবস্থান করায় ইতিকাফকারী যেসব আমল করতে অক্ষম, যেমন জানাজায় শরিক হওয়া, অসুস্থদের সেবা করা এসব আমল না করেও তার সওয়াব পেতে থাকে।