গ্যাসের মূল্য ৭৫% ও বিতরণ চার্জ ১১৫% বৃদ্ধির প্রস্তাব তিতাসের

নিজস্ব প্রতিবেদক: ভোক্তা পর্যায়ে গড়ে প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের মূল্যহার ৭৫ শতাংশ বৃদ্ধির প্রস্তাবের পক্ষে নিজেদের যুক্তি উপস্থাপন করেছে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড। সে সঙ্গে বিতরণ চার্জ ঘনমিটার প্রতি ২৩ টাকা ১৬ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৪৯ টাকা ৮৭ পয়সা করার প্রস্তাব দেওয়া হয় শতাংশের হিসাবে যা ১১৫ শতাংশ। তবে বাণিজ্যিক ও গৃহস্থালি পর্যায়ের গ্রাহকদের ক্ষেত্রে গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধির কোনো প্রস্তাব করেনি তিতাস।
তিতাসের প্রস্তাবনায় দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটি ভোক্তা পর্যায়ে সর্বনি¤œ ২৫ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ ৩৭২ শতাংশ বৃদ্ধির প্রস্তাব করেছে। এর মধ্যে বিদ্যুতে প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম তিন দশমিক ১৬ টাকা থেকে ২০৬ শতাংশ বাড়িয়ে ১০ টাকা, সারে দুই দশমিক ৭১ টাকা থেকে ৩৭২ শতাংশ বাড়িয়ে ১২ দশমকি ৮০ টাকা, সিএনজিতে ৩২ টাকা থেকে ২৫ শতাংশ বাড়িয়ে ৪০ টাকা, ক্যাপটিভ পাওয়ারে ৯ দশমিক ৬২ টাকা থেকে ৬৬ শতাংশ বাড়িয়ে ১৬ টাকা এবং শিল্পে প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের বর্তমান মূল্য সাত দশমিক ৭৬ টাকা থেকে ৯৩ শতাংশ বাড়িয়ে ১৫ টাকা করার প্রস্তাবের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরা হয়।
বিভিন্ন কোম্পানির গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধির আবেদনের প্রেক্ষিতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) চলমান গণশুনানির দ্বিতীয় দিনে গতকাল কমিশনের কাছে মূল্য বৃদ্ধির এসব প্রস্তাব তুলে ধরে প্রতিষ্ঠানটি।
গণশুনানিতে উপস্থিত ছিলেন কমিশনের চেয়ারম্যান মনোয়ার ইসলাম, সদস্য আবদুল আজিজ খান, মিজানুর রহমান, রহমান মুর্শেদ ও মাহমুদ উল হক ভুঁইয়া। এছাড়া কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানিবিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক শামসুল আলম, জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক বদরুল ইমাম ও অধ্যাপক নুরুল ইসলম, তিতাস গ্যাস, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড, পেট্রোবাংলা ও বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠনের প্রতিনিধিসহ বিভিন্ন কোম্পানির কর্মকর্তারাও উপস্থিত আছেন।
যদিও বিইআরসির কারিগরি মূল্যায়ন কমিটি তিতাসের প্রস্তাব যাচাই-বাচাই করে ঘনমিটার প্রতি তিন দশমিক ৭০ পয়সা বাড়িয়ে ২৬ দশমিক ৮৬ পয়সা করার সুপারিশ করেছে।
মূল্য বৃদ্ধির প্রস্তাবের পক্ষে বলা হয়, ১ মার্চ ২০১৭ ও ১ জুন ২০১৭ হতে গ্যাসের মূল্য পুনর্নির্ধারণ হলেও বিতরণ মার্জিন বৃদ্ধি না পাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে কোম্পানির কর পূর্ববর্তী ও কর পরবর্তী মুনাফা হ্রাস, গ্রাহক কর্তৃক গ্যাস বিল পরিশোধকালে উৎসে আয়কর কর্তনের সঙ্গে কোম্পানির আয়কর দায়ের ভারসাম্যহীনতার ফলে আর্থিক তারল্যে নেতিবাচক প্রভাব, কোম্পানির পরিশোধিত মূলধনের মধ্যে ২৫ শতাংশ সাধারণ শেয়ারহোল্ডারগণের বিনিয়োগ, কোম্পানির ভবিষ্যৎ উন্নয়নমূলক কার্যক্রমে নিজস্ব অর্থ জোগানসহ আর্থিক সব ক্ষেত্রের বাস্তবায়ন বিষয়াদি বিবেচনায় নিয়ে বিতরণ মার্জিন পুনর্নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে।
আর কমিশনের কারিগরি মূল্যায়ন কমিটির সুপারিশে বলা হয়, তিতাস গ্যাসের রেট বেজের ওপর রিটার্ন বিবেচনায় ২০১৮-১৯ অর্থবছরে নিট রাজস্ব চাহিদা ইউনিট প্রতি তিন দশমিক ৭০ পয়সা। সে হিসেবে বিতরণ চার্জ বর্তমান ২৩ দশমকি ১৬ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ২৬ দশমিক ৮৬ পয়সা করা যেতে পারে।
তবে গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধির তিতাসের প্রস্তাবের বিরাধিতা করে ভোক্তা অধিকার সংগঠন ও বিভিন্ন ব্যবসায়িক সংগঠন। ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক শামসুল আলম বলেন, তিতাস গ্যাস দেওয়ার নামে জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করছে। আবাসিক চুলায় গ্যাস পাওয়া যায় না। গ্রাহকরা নিয়মিত গ্যাসের বিল পরিশোধ করলেও নিয়মিত প্রয়োজন অনুযায়ী গ্যাস পাচ্ছেন না।
তিনি বলেন, ঢাকা ও চট্টগ্রামে প্রতিদিন ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস চুরি হয়। কিন্তু তিতাস চুরি রোধে কিছুই করছে না। কারণ তিতাসের কর্মকর্তারাই এসব চুরির সঙ্গে জড়িত। তিনি বলেন, দুর্নীতিবাজরা জ্বালানি খাতকে তলাবিহীন ঝুড়িতে পরিণত করছে।
এ সময় তিনি প্রশ্ন তুলেন, গণশুনানি না করে কেন এলএনজির দাম নির্ধারণ করা হয়েছে। এলএনজি সরবরাহ না করে কমিশন দাম বাড়াতে পারে কি-না এমন প্রশ্নও জুড়ে দেন তিনি। এসব প্রশ্নের উত্তরে কমিশনরে সদস্য রহমান মোর্শেদ বলেন, দাম নির্ধারণ করা হয় আগের বছরের ভিত্তিতে। এর ভিত্তিতেই রাজস্ব চাহিদা নির্ধারিত হয়। এটা আইনসিদ্ধ ব্যাপার। পাইপলাইনে আসলেই দাম বৃদ্ধি কার্যকর হবে।
সিএনজি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মাসুদ খান সিএনজির দাম না বাড়ানোর আহ্বান জানান। তিনি বলেন, সিএনজির সঙ্গে পরিবেশ ও স্বাস্থ্যের সংযোগ রয়েছে। এটার মূল্য বৃদ্ধি কোনোভাবেই যৌক্তি নয়। কারণ এটা সাধারণ মানুষের স্বার্থসংশ্লিষ্ট। এর দাম বাড়বে সাধারণ মানুষ অসন্তুষ্ট হবে।
ঈদের আগে আর গণশুনানি নেই। ঈদের পর আগামী ১৯ জুন মঙ্গলবার কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড, ২০ জুন বুধবার পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড ও বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পনি এবং সর্বশেষ ২১ জুন বৃহস্পতিবার জালালাবাদ গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেম লিমিটেড ও সুন্দরবন গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের দাম বাড়ানোর প্রস্তাবের ওপর গণশুনানি অনুষ্ঠিত হবে।