সারা বাংলা

অগ্নিঝুঁকিতে ফেনীর শতাধিক বহুতল ভবন

শাহাদত হোসেন তৌহিদ, ফেনী: ভয়াবহ অগ্নিঝুঁকিতে রয়েছে ফেনী শহরের শতাধিক বহুতল ভবন। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে শহরের বড় বাজার ও সুলতান মাহমুদ পৌর হকার্স মার্কেট (রেলগেট বাজার)। যে কোনো মুহূর্তে ঘটতে পারে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি। এসব ভবনে শিগগিরই ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। এ বিষয়ে গতকাল মঙ্গলবার অগ্নিদুর্ঘটনা প্রতিরোধে ফেনী শহরের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে মতবিনিময় করেছে ফেনী ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স।
ফেনী ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা যায়, শহরে ছোট-বড় ১০০ থেকে দেড়শ বহুতল ভবন রয়েছে। ফেনীতে ৮০ ভাগ ভবনে অগ্নিনির্বাপণের কোনো ব্যবস্থা নেই। ভবনের নকশার মধ্যে একতলা থেকে ১০ তলা পর্যন্ত আবাসিক কাম বাণিজ্যিক ভবনের জন্য তিনটি সিঁড়ি, দুটি লিফট ও বাণিজ্যিক ভবনের জন্য দুটি সিঁড়ি ও দুটি লিফট এবং ১০ তলার অধিক হলে আরও বেশি সিঁড়ি ও লিফট থাকার কথা থাকলেও ভবন মালিকরা কেউ এসবের তোয়াক্কা করেননি।
জানা গেছে, পৌরসভার নিয়ম অনুযায়ী একটি ভবনের চারপাশে তিন মিটার পরিমাণ জায়গা খালি থাকতে হবে। এক ভবন থেকে আরেক ভবনের দূরত্ব হবে চার থেকে পাঁচ মিটার। অধিকাংশ ভবন মালিক এ আইন মানছেন না। এছাড়া শহরের ভবনগুলোয় নেই রিজার্ভ পানির ট্যাংক, পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা। বহুতল ভবনগুলোয় হাইড্রেন ব্যবস্থা, লিফট, বিকল্প সিঁড়ি ও জরুরি সিঁড়িও রাখা হয়নি। ভবনে আগুন লাগলে মানুষ দ্রুত নামার কোনো ব্যবস্থাও নেই।
এদিকে ফেনী শহরে বেশ কয়েকটি পুকুর ছিল। পুকুরগুলো ভরাট করে মার্কেট নির্মাণ করা হয়। ফায়ার সার্ভিসের নিয়ম অনুযায়ী মার্কেট ও ভবনে পানির ট্যাংক করার বিধান থাকলেও ফেনী শহরে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও ভবনগুলোয় এর কোনো ব্যবস্থা নেই। শহরে একমাত্র পানির উৎস রাজাঝির দিঘি। এ দিঘি থেকে ফায়ার সার্ভিসকর্মীরা পানির ব্যবস্থা করতে গেলে অগ্নিকাণ্ড ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
শহরের শহীদ শহীদুল্লাহ কায়সার সড়কের করিম টাওয়ার, মাস্টার টাওয়ার, কুমিল্লা বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন লতিফ টাওয়ার, মিজান রোডের গ্র্যান্ড হক টাওয়ারসহ বেশ কয়েকটি টাওয়ারে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা রয়েছে। শহীদ শহীদুল্লাহ কায়সার সড়কের শাহ আলম টাওয়ারসহ কয়েকটি ভবনে মাত্র একটি সিঁড়ি রয়েছে। শহরের জালালিয়া সুইটস, শরীফ মিষ্টিমেলা, বিসমিল্লাহ সুইটসসহ অনেকগুলো ভবনের ভেতরে সরু ও খাড়া সিঁড়ি রয়েছে। আগুন লাগলে এসব ভবনে ব্যাপক হতাহতের আশঙ্কা করছে ফায়ার সার্ভিস।
এদিকে শহরের ডাক্তারপাড়া, মাস্টারপাড়া কানন সিনেমা হলের সামনে, পাঠানবাড়ি রোড, পুরাতন রেজিস্ট্রি অফিস, পুরাতন পুলিশ কোয়ার্টারসহ বিভিন্ন আবাসিক এলাকায় সড়কগুলো সরু ও আঁকাবাঁকা হওয়ায় ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে পারে না।
অপরদিকে ফেনী শহরে আবাসিক ভবনের অনুমোদন নিয়ে বাণিজ্যিকভাবে প্রাইভেট ক্লিনিকের কাছে ভাড়া দেওয়া হয়। ক্লিনিক করার মতো পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই সেসব ভবনে। অনেকগুলো ক্লিনিকে অগ্নিনির্বাপণের কোনো ব্যবস্থা নেই।
গত বছরের ৪ জুন ফেনী শহরের ট্রাংক রোডে বড় মসজিদের বিপরীতে ছেরাজ হার্ডওয়্যারে সিলিন্ডার বিস্ফোরণে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ফায়ার সার্ভিসকর্মীরা বড় মসজিদের ট্যাংক থেকে পানি ব্যবহার করে। পরে পানি শেষ হয়ে গেলে রাজাঝির দিঘি থেকে পানির ব্যবস্থা করা হয়। ততক্ষণে দোকান কর্মচারী নূরুল আলম দগ্ধ হয়ে মারা যান।
ফেনী ফায়ার সার্ভিসের সিনিয়র স্টেশন অফিসার কবির হোসেন জানান, শহরের বড় বাজার ও রেলগেট বাজার সবচেয়ে ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এখানে পানির কোনো উৎস নেই। বড় বাজারে রাস্তার ওপর পণ্য ও গাড়ি থাকার কারণে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি যথাসময়ে পৌঁছাতে পারে না। কয়েক দিনের মধ্যে এসবের বিরুদ্ধে জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দিয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হবে বলে জানা যায়। ফেনী ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা সুনিশ্চিতের জন্য ব্যবসায়ীদের নোটিস করা হচ্ছে।
ফেনী ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম ভূঞা জানান, ফেনীতে ৭০ ভাগ বহুতল ভবনের ফায়ার সার্ভিসের অনুমোদন ও অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা নেই। অগ্নিনির্বাপণের জন্য নেই সিঁড়িও। ফেনী ফায়ার সার্ভিসে আগুন নেভানোর জন্য দক্ষ জনবল থাকলেও সরু রাস্তার কারণে তারা দ্রুত সময়ে পৌঁছাতে পারে না।

সর্বশেষ..