প্রচ্ছদ প্রথম পাতা

অগ্নিঝুঁকিতে বিএসআরএমের রড উৎপাদন কারখানা

সাইদ সবুজ, চট্টগ্রাম: দেশের স্টিল খাতের জায়ান্ট প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ স্টিল রি-রোলিং মিলস (বিএসআরএম)। তবে এর রড উৎপাদন কারখানা রয়েছে অগ্নিঝুঁকিতে। অনুমোদিত ফ্লোর প্ল্যান অনুযায়ী কারখানা ভবনের স্থায়ী অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থাদি নেই। তাই কারখানাটির ফায়ার সেফটি প্ল্যান অনুমোদনের জন্য আবেদন করলেও ছাড়পত্র দেয়নি ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদফতর। ফলে শত শত শ্রমিক জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছেন কারখানাটিতে।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স চট্টগ্রাম সূত্রে জানা যায়, প্রতিটি বহুতল বা বাণিজ্যিক ভবনে অগ্নিপ্রতিরোধ, অগ্নিনির্বাপণ ও অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক হলেও চট্টগ্রামের বেশিরভাগ বাণিজ্যিক ভবনে সে ব্যবস্থা নেই। প্রতিষ্ঠানগুলো চলছে অগ্নিঝুঁকি নিয়েই। দেশের বৃহৎ রড উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান বিএসআরএমও এর বাইরে নয়।
অনুমোদিত ফ্লোর প্ল্যান অনুযায়ী ফায়ার সার্ভিসের অনুমোদন পেতে হলে ২১টি নিরাপত্তা ব্যবস্থা ঠিক থাকতে হয়। এর মধ্যে ফ্যাক্টরিতে ভূগর্ভস্থ জলাধারে প্রায় দুই লাখ গ্যালন পানি মজুতের ধারণক্ষমতা থাকার পাশাপাশি তিন ধরনের পাম্প থাকতে হয়। এর মধ্যে মেইন পাম্প, স্ট্যান্ডবাই পাম্প ও জকি পাম্প থাকতে হবে। পাশাপাশি অটো ট্রান্সফার সিস্টেমও থাকতে হবে। কিন্তু বিএসআরএম ফ্যাক্টরিতে তাদের নিজেদের মতো সামান্য কিছু অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা থাকলেও এর একাধিক শর্ত মানা হয়নি। আর যেটুকু ব্যবস্থা আছে, তাও প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। ফলে যে কোনো দুর্ঘটনা মোকাবিলায় তাদের কোনো সক্ষমতা নেই। তাই কারখানার জন্য ফায়ার সেফটি প্ল্যান অনুমোদনের আবেদন করেও ছাড়পত্র পায়নি প্রতিষ্ঠানটি।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের কাপ্তাই ও চট্টগ্রাম জোন-৩-এর উপপরিচালক পূর্ণ চন্দ্র মুৎসুদ্দী শেয়ার বিজকে বলেন, বিএসআরএম মিলস লিমিটেড বায়েজিদ বোস্তামি রোডের অক্সিজেন এলাকায় অবস্থিত। কারখানাটিতে ৩৩৪ শ্রমিক কাজ করেন। এ কারখানায় প্রতি ফ্লোরে দুই হাজার ৫০০ বর্গফুট করে ছয়তলাবিশিষ্ট অফিস ভবন রয়েছে। ওই কারখানা পরিদর্শন করে দেখা যায়, পর্যাপ্ত পানি মজুত রাখার ভূগর্ভস্থ রিজার্ভার নেই। তাদের যে রিজার্ভার আছে, তার পানি ধারণক্ষমতা মাত্র ৫০০ ঘনমিটার, যা কোনো অবস্থাতেই ঝুঁকি এড়াতে পারবে না। এছাড়া ফায়ার ব্রিগেড কানেকশন ও ইন্টারনাল হাইড্রেন্ট ডায়া আড়াই ইঞ্চি থাকার কথা থাকলেও তা রয়েছে তুলনামূলক কম ব্যাসের, যা সিভিল ডিফেন্স বিভাগের সঙ্গে সমাঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাছাড়া কারখানায় রাইজার ও স্প্রিংকলার দেখা যায়নি। ফায়ার কন্ট্রোলরুম, স্ট্রোবলাইট, পিএ সিস্টেম, ইমার্জেন্সি লাইট, এক্সিট সাইনেজ, বৈদ্যুতিক সাবস্টেশন, চার ঘণ্টা ফায়ার রেটেড ওয়াল ও দুই ঘণ্টা রেটেড দ্বারা সেপারেটেড ব্যবস্থা এবং রেজিস্টারগুলোর সংরক্ষণ নেই। ফলে প্রতিষ্ঠানটি ছাড়পত্রের জন্য আবেদন করলেও তা দেয়নি ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স কর্তৃপক্ষ।
তিনি আরও বলেন, তাদের ফায়ার ফাইটিং ফ্লোর প্ল্যান অনুযায়ী কারখানার অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা আধুনিকায়নের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। আর যতদিন ফ্লোর প্ল্যান অনুযায়ী ফায়ার সেফটি প্ল্যান বাস্তবায়ন করা না হবে, ততদিন পর্যন্ত তা অনুমোদন দেওয়া হবে না।
এদিকে বায়েজিদ বোস্তামির শেরশাহ এলাকায় অবস্থিত বিএসআরএমের পুরোনো ফ্যাক্টরি ও ফৌজদারহাট এলাকার কারখানাগুলোও অগ্নিঝুঁকিতে রয়েছে বলে জানিয়েছেন স্ব-স্ব এলাকার ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অফিসের কর্মকর্তারা। শেরশাহ এলাকায় অবস্থিত বিএসআরএম পুরাতন ফ্যাক্টরির বিষয়ে কথা জানতে ওই এলাকার ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অফিসের ইনচার্জ এনামুল হকের সঙ্গে কথা বললে তিনি জানান, বিএসআরএমের ফ্যাক্টরিগুলো অন্যান্য ফ্যাক্টরি থেকে আধুনিক। এরপরও পর্যাপ্ত পরিমাণে অগ্নিনিরোধক ও নির্বাপণের ইকুইপমেন্ট নেই। এরই মধ্যে অনেকগুলো ইকুইপমেন্ট স্থাপন করেছে বলে জানা গেছে। কিন্তু এর মধ্যে ওই ফ্যাক্টরি ভিজিট না করায় বর্তমান অবস্থার কথা বলতে পারছি না।
সম্প্রতি কারখানাটিতে গেলে এর ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আমাদের কারখানায় যথেষ্ট পরিমাণে অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা রয়েছে।
তবে এ দাবি সঠিক নয় বলে জানান ফৌজদারহাট ফায়ার স্টেশনের কর্মকর্তা শাহাদাত হোসেন। তিনি বলেন, ‘আমরা যখন বিএসআরএমের ফ্যাক্টরি ভিজিট করছিলাম, তখন ফ্লোর প্ল্যান অনুযায়ী ফায়ার ফাইটিং ইনস্ট্র–মেন্ট সবকিছু ছিল না। আমরা পরামর্শ দিয়েছিলাম ফ্লোর প্ল্যান অনুযায়ী ফায়ার সেফটি প্ল্যান করার জন্য। শুনেছি, এর মধ্যে কিছু কিছু বাস্তবায়ন করা হয়েছে।’
এ বিষয়ে জানতে বিএসআরএমের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক তপন সেনগুপ্তের সঙ্গে কথা হলে তিনি অগ্নিঝুঁকির বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, ‘আমাদের সবগুলো কারখানায় ফায়ার ফাইটিং ফ্লোর প্ল্যান অনুযায়ী ফায়ার সেফটি প্ল্যান করা আছে। আর ফায়ার সেফটি প্ল্যানের ছাড়পত্র পাইনি তথ্যটা সঠিক নয়। আপনাকে কে এমন তথ্য দিয়েছে, তার নাম বলুন, তাকে দেখে নেব। আমরা আগে আমাদের শ্রমিকদের নিরাপত্তা দেখি। এরপর ব্যবসার কথা আসবে।’

সর্বশেষ..