মত-বিশ্লেষণ

অগ্নিদুর্ঘটনা রোধে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ জরুরি

মো. আল আমিন নাহিদ: রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে একের পর এক অগ্নিদুর্ঘটনা ঘটছে, যার ফলে ঝরছে বহু প্রাণ, ধ্বংসস্তূপে পরিণত হচ্ছে রাষ্ট্রের মূল্যবান সম্পদ। গেল মাসে বনানীর এফ আর টাওয়ার ট্র্যাজেডি বাংলাদেশের ইতিহাসে ভয়াবহ বেদনাবিধুর একটি ঘটনা। এ দুর্ঘটনায় বিশ্ববাসী কাছ থেকে দেখেছে মৃত্যু কতটা নির্মম, কতটা মর্মান্তিক হতে পারে আর এতে মানুষ কতটা অসহায় হয়ে পড়ে। আটকে পড়া মানুষগুলো আগুনের লেলিহান শিখার তাপ হতে বাঁচতে ঝুঁকি নিয়ে রেলিং বা কেব্ল বেয়ে নামছে, কেউবা বাঁচার তাগিদে লাফিয়ে পড়ে মৃত্যুবরণ করছে। নিমতলী, চকবাজার, গুলশান, বনানীর ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ভাবিয়ে তুলছে দেশবাসীকে অগ্নিদুর্ঘটনার নিরাপত্তা কতটুকু? অগ্নিদুর্ঘটনায় আমাদের প্রস্তুতি, উদ্যোগ বা সচেতনতা কতটুকু? অগ্নিকাণ্ড ঘটতেই পারে বিভিন্নভাবে। কিন্তু এ ব্যাপারে আমাদের প্রতিরোধ ব্যবস্থা কতটুকু? বিশেষজ্ঞদের মতে, আগুন লাগার পাঁচ মিনিট হচ্ছে বিপজ্জনক সময়। ছোট একটি আগুন যদি প্রথম পাঁচ মিনিটেই নেভানো সম্ভব হয়, তাহলে সেটি কোনো দুর্ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয় না। এ পাঁচ মিনিট স্থানীয়দের আগুন নেভানোর কাজ করতে হয়। এ সময় ফায়ার সার্ভিসের ওপর নির্ভর করলে চলবে না কিন্তু অগ্নিনির্বাপণে যথাযথ প্রশিক্ষণ না থাকায় ছোট আগুনেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানি ঘটছে। তাই আগুন নেভানোর কাজে শুধু ফায়ার সার্ভিসের ওপর নির্ভরতার কারণে এর ক্ষয়ক্ষতি কমানো যাচ্ছে না। তাই ভবিষ্যতে আরও বড় অগ্নিদুর্ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা থেকেই যাচ্ছে। অগ্নিনির্বাপণে সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি ও প্রশিক্ষণসহ বেসরকারি পর্যায়ে অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করতে হবে। এছাড়াও অগ্নিনির্বাপণে আমাদের বিশ্বমানের প্রযুক্তির দিকে নজর দিতে হবে। প্রতিটি বড় অগ্নিদুর্ঘটনায় আমরা প্রযুক্তির অভাব বোধ করি। আমাদের দেশে বহুতল ভবনগুলোয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা অপ্রতুল। ভবনগুলোয় অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র বলতে বুঝি ফায়ার স্টিংগুইসারÑযা অগ্নিনির্বাপণে যথেষ্ট নয়। কোনো কোনো ভবনে ফায়ার স্টিংগুইসার থাকলেও তা মেয়াদোত্তীর্ণ; আবার ভবনের বাসিন্দারা এর ব্যবহার সম্পর্কে অজ্ঞ, যার ফলে প্রয়োজনের সময় এটি কাজে আসছে না। বহুতল ভবনগুলোয় অগ্নিনির্বাপণে কয়েকটি বিষয় মেনে চলা জরুরি, যা হলো স্বয়ংক্রিয় স্প্রিংলার, আন্ডারগ্রাউন্ড পানির রিজার্ভার, তাপরোধক দরজা-জানালা, ফায়ার ফাইটিং পাম্প হাউজ, স্মোক ও হিট ডিটেকশন সিস্টেম, ফায়ার লিফট, এক্সিট ডোর, অটোমেটিক ফায়ার ডিটেকশন; যা আগুন লাগলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নেভানোর কাজ শুরু করে। উন্নত বিশ্বে বহুতল ভবনে আগুন লাগলে আটকেপড়া মানুষকে লাফিয়ে পড়ার জন্য বিশেষ ধরনের নেট বা এয়ার ব্যাগ ব্যবহার করা হয়, যাতে আটকেপড়া মানুষ লাফিয়ে পড়ে জীবন রক্ষা করতে পারে। যা বনানী ট্র্যাজেডিতে ছিল অনুপস্থিত। এর ফলে জীবন বাঁচাতে লাফিয়ে পড়ে অনেকের মৃত্যু হয়। অগ্নিদুর্ঘটনা রোধে আরেকটি কার্যকর ব্যবস্থার নাম ‘ফায়ার হাইড্রেন্ট’। বিশ্বের প্রায় সবগুলো বড় শহরে এই ফায়ার হাইড্রেন্ট ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে; কিন্তু অপরিকল্পিত ঢাকাসহ দেশের বড় শহরগুলোয় হাইড্রেন্ট ব্যবস্থা এখনও গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। যার ফলে প্রয়োজনীয় পানি সরবরাহের অভাবে দ্রুত আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হচ্ছে না। এতে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বেশি হচ্ছে। ফায়ার হাইড্রেন্ট হচ্ছে পানির একটি সংযোগ উৎস, যা পানির প্রধান উৎসের সঙ্গে সংযুক্ত থাকে; যে কোনো জরুরি প্রয়োজনে এ উৎস থেকে পানি ব্যবহার করা হয়। ফায়ার হাইড্রেন্টের বড় সুবিধা হলো, পাইপ যুক্ত করে যে কোনো দূরত্বে ইচ্ছেমতো পানি নিয়ন্ত্রণ করে ব্যবহার করা যায়। আরেকটি ব্যবস্থা হলো, ঢাকাসহ বড় শহরগুলোয় পানির জলাধার, ছোট ছোট জলাশয় বা খালসহ পানির রিজার্ভার তৈরি করতে হবে, যেন অগ্নিনির্বাপণে এই জলাধারগুলো পানির উৎস হিসেবে ব্যবহার করা যায়। ঢাকাসহ বাংলাদেশের প্রায় সব বিভাগীয় শহরে নতুন নতুন সুউচ্চ ভবন নির্মিত হচ্ছে। এসব ভবন মালিক যতটা তাদের ভবনের সৌন্দর্য বৃদ্ধিতে সচেতন, ততটাই অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থায় অসচেতন, যার ফলে অগ্নিদুর্ঘটনায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে। হংকং, দুবাই, সিঙ্গাপুর অঞ্চলে সুউচ্চ ভবন অনেক বেশি। হংকংয়ে বেশিরভাগ ভবন ৫০ তলাবিশিষ্ট; সেগুলোতে অগ্নিনিরাপত্তা ও ভূকম্পন প্রতিরোধ ব্যবস্থা সঠিকভাবে গড়ে তোলা হয়েছে, তাই সেখানে আমাদের দেশের মতো এমন দুর্ঘটনার খবর পাওয়া যায় না। অথচ আমাদের দেশে এফ আর টাওয়ারের মতো ভবন কতটা অনিরাপদ? আমাদের দেশে ৮০ ভাগ অগ্নিদুর্ঘটনা ঘটে বিদ্যুতের শর্টসার্কিট থেকে, যার অন্যতম কারণ নিম্নমানের কেব্ল ও ইলেকট্রিক সামগ্রী ব্যবহার। বাংলাদেশে যে পরিমাণ নিম্নমানের কেব্ল বা ইলেকট্রিক সামগ্রী ব্যবহার করা হয়, তা অন্য কোনো দেশে ব্যবহৃত হয় না। আমাদের এ বিষয়ে অধিক সচেতন হতে হবে। আমাদের দেশে একের
পর এক বহুতল ভবন গড়ে উঠছে; কিন্তু সেগুলো ইমারত বিধিমালা বা বিল্ডিং কোড না মেনেই এবং অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা ছাড়াই নির্মিত হচ্ছে। যার ফলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের অগ্নিঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে। আমাদের দেশে বাস্তবটা হচ্ছে একের পর এক দুর্ঘটনা ঘটে চলেছে, ব্যাপক সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানি ঘটছে; কিন্তু কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেই বললেই চলে। এর সঙ্গে দায়ী ব্যক্তিরা শাস্তি পাচ্ছে না, তাই একের পর এক দুর্ঘটনা ঘটে চলেছে। এমন দুর্ঘটনা রোধে সাধারণ জনগণের মাঝে সচেতনতা বাড়াতে হবে, তেমনি সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে কার্যকর উদ্যোগ জরুরি।

ফ্রিল্যান্স লেখক
[email protected]

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..