মত-বিশ্লেষণ

অগ্নিনির্বাপণে সচেতনতা এবং কিছু পদক্ষেপ

মঙ্গলবার রাজধানীর তিন জায়গায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় আমরা বিস্মিত। তিনটি ঘটনাই ঘটেছে ঘনবসতিপূর্ণ বস্তি এলাকায়। ফায়ার সার্ভিসের বক্তব্য অনুসারে শীত বা শুষ্ক মৌসুমে অসচেতনতার জেরে এই ঘটনাগুলো বেশি হয়। তাই সচেতনতার বিকল্প নেই। তবে সচেতনতার পাশাপাশি কিছু পদক্ষেপ নিলে হয়তো অগ্নিকাণ্ডের ভয়াবহতা হ্রাস করা যাবে।

আমি দুটি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছি। একটিতে সঠিক পদক্ষেপের জেরে কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি, অন্যটিতে সঠিক পদক্ষেপ না থাকায় বিশাল আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়। আমার এলাকায় ঘনবসতিপূর্ণ একটি জায়গায় হঠাৎ গ্যাস রাইজারে আগুন লেগে যায়। ওই এলাকায় একটি সামাজিক সংগঠন ছিল যারা দ্রুত তিন-চার মিনিটের মধ্যে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রের সাহায্যে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে, যার দরুন কোনো ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটেনি। আচ্ছা আগুন কি প্রথমেই ভয়ংকর হয়? অবশ্যই না, যেকোনো ভয়ংকর অগ্নিকাণ্ড প্রথমে খুবই ক্ষুদ্র ও নিয়ন্ত্রণযোগ্য থাকে। যদি ক্ষুদ্র অবস্থায় তা নিয়ন্ত্রণ করা না যায়, তবে তা ভয়ংকর আকার ধারণ করে। আমার প্রত্যক্ষ দ্বিতীয় উদাহরণ থেকে তা বুঝতে পারবেন। আমাদের পার্শ্ববর্তী এলাকায় একটি ঘনবসতি ব্যাচেলর মেস আছে, যেখানে গাদাগাদি করে প্রায় ৩০টি ঘর ও দোকান ছিল। মেসে রান্না করা পরিচারিকা জানান, রান্না করার সময় হঠাৎ চুলার সঙ্গে সংযুক্ত প্লাস্টিকের গ্যাস পাইপটি ছুটে যায়, যার দরুন আগুন চুলা থেকে কিছুটা বাইরে চলে আসে এবং বড় আকার ধারণ করে। এটি দেখে তিনি দিগি¦দিক ছোটাছুটি করে কয়েকজনকে ডেকে আনেন। তখন সবাই মগ-বালতি দিয়ে পানি ছুড়ে ১০-১৫ মিনিটে আগুন নেভানোর চেষ্টা করেন, কিন্তু কাজ হয়নি। আগুন ১৫ মিনিট নিয়ন্ত্রণেই ছিল, কিন্তু যখন পার্শ্ববর্তী ঘরে আগুন লেগে যায় তখন তা নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে যায়। এর ফলে ৩০টি ঘর পুড়ে ছাই হয়ে যায় এবং পার্শ্ববর্তী মসজিদের অর্ধেক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অথচ সেখানে একটি ভালো মানের অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র থাকলে এত ক্ষতি হতো না।

অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা দিন দিন ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। গত এক দশকে সারা দেশে এক লাখ ৬৮ হাজার ২৮টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় প্রায় দেড় হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন সাড়ে সাত হাজারের বেশি। এতে আর্থিক ক্ষতি হয়েছে চার হাজার ২৮৩ কোটি টাকা। অথচ ফায়ার সার্ভিস কিছু পদক্ষেপ নিলে হয়তো ক্ষতির মাত্রা অনেক গুণ কমিয়ে আনা যায়। প্রথমত, প্রতিটি এলাকার সামাজিক সংগঠন বা স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সদস্যদের সংক্ষিপ্ত প্রশিক্ষণ দিয়ে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র (ফায়ার এক্সটিংগুইশার) দিলে তারা দ্রুত সময়ে অগ্নিকাণ্ডের নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন। দ্বিতীয়ত, বস্তি এলাকায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা বেশি,  তাই এসব এলাকায় স্বেচ্ছাসেবী গঠন করে সংক্ষিপ্ত প্রশিক্ষণ দিয়ে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র দিলে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা কমে যাবে। তৃতীয়ত, ফায়ারসার্ভিস বস্তিগুলোয় ব্যাপকভাবে সচেতনতার বিভিন্ন অনুষ্ঠান, প্রশিক্ষণ বা ওয়ার্কশপ করলে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা কমে যাবে। চতুর্থত, গ্যাসলাইন লিকেজ ও ইলেকট্রিক কেব্লের মান যদি সরকার কঠিন নজরদারিতে আনতে পারে, তবে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা কমে যাবে। পঞ্চমত, যেহেতু অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাগুলো শহর, গিঞ্জি এলাকা বা বস্তিকেন্দ্রিক, তাই এই অঞ্চলের সাধারণ মানুষকে অগ্নিকাণ্ডের বিষয়ে সচেতনতার জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণের আওতায় আনা উচিত।

অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার বিশ্লেষণে দেখা যায় শর্টসার্কিটে ৩৭ শতাংশ, চুলার আগুন থেকে ১৮ শতাংশ এবং সিগারেট থেকে ১৫ শতাংশ ক্ষেত্রে আগুন লাগে, অর্থাৎ ৭০ শতাংশ অগ্নিকাণ্ডের কারণ এই তিনটি। অগ্নিকাণ্ডে ২০১৭ সালে মৃত্যু হয় ৪৫ জনের, ২০১৮ সালে মৃত্যু হয় ১৩০ জনের, ২০১৯ সালে মৃত্যু হয় ১৮৪ জনের আর ২০২০ সালে শুধু নারায়ণগঞ্জের ঘটনায় আজ পর্যন্ত মৃত্যু হয় ৩১ জনের। ফায়ার সার্ভিসের প্রতিবেদন থেকে তথ্যগুলো জানলাম। নারায়ণগঞ্জের গ্যাসলাইনের লিকেজ নিয়ে তৎপর হলে এত ভয়ংকর অগ্নিকাণ্ড কি ঘটত?

আমাদের দেশে অগ্নিকাণ্ডের প্রতিরোধের ব্যবস্থা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে আছে, কিন্তু সচেতনতা, প্রশিক্ষণ বা সরকারি পর্যবেক্ষণ তেমন কার্যকর নয়। আমার এক বন্ধু যুক্তরাষ্ট্রে একটি কাপড়ের গুদামের (ওয়্যারহাউস) দায়িত্বে ছিলেন। তিনি জানালেন, বিগত ২০ বছরে ওই প্রদেশে তার গুদাম ছাড়াও অন্যান্য দাহ্য গুদামেও কখনও আগুন লাগার ঘটনা নেই। কারণ তারা এ ব্যাপারে প্রস্তুতির পাশাপাশি ব্যাপকভাবে সচেতন, যেমন ওই গুদামগুলোর কোনোটিতেই বিদ্যুৎ সংযোগ নেই (বিদ্যুৎ না থাকলে শর্টসার্কিটের সুযোগ নেই)। ওই গুদামগুলোয় রাতে চার্জলাইট নিয়ে তারা কার্যক্রম পরিচালনা করেন। তাছাড়া আমাদের কেন্দ্রীয় কারাগারে অনেক কম্বল ব্যবহারের জেরে কয়েলের ব্যবহার নিষিদ্ধ থাকায় প্রায় ২০০ বছরের মধ্যে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে কি না, আমার জানা নেই। সর্বোচ্চ সচেতনতার মাধ্যমে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা রোধ করা যায়, তা প্রমাণিত। প্রতিষেধকের চেয়ে প্রতিরোধই সর্বোত্তম, অর্থাৎ সচেতনতা অগ্নিনিরোধের প্রথম পদক্ষেপ।

নাজমুল হক

প্রভাষক

বনানী বিদ্যানিকেতন কলেজ, ঢাকা

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন
ট্যাগ ➧

সর্বশেষ..