রাশেদ রুবেল : রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ব্যাংকের নীলফামারীর সৈয়দপুর শাখায় বড় ধরনের আর্থিক কেলেঙ্কারির অভিযোগ উঠে এসেছে। ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ বিশেষ নিরীক্ষা ও তদন্ত প্রতিবেদনে জাল ভাউচার, আরটিজিএস, চেক ক্লিয়ারিং এবং কৃত্রিম লেজার এন্ট্রির মাধ্যমে প্রায় ৬৬ কোটি টাকা আত্মসাৎ ও পাচার করার সুস্পষ্ট তথ্য উঠে এসেছে। তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, এই অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় ব্যাংকের রংপুর সৈয়দপুর শাখার সিনিয়র অফিসার মো. আলিমুল আল রাজি তমাল এবং সার্কেলের তৎকালীন জেনারেল ম্যানেজার (জিএম) স্বপন কুমার ধর পরিকল্পিতভাবে এই লুটপাট করেছেন। তবে ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আনোয়ারুল ইসলাম অগ্রণী ব্যাংকে যোগদানের পরই লুটপাটের সিংহভাগ টাকা উত্তোলন করা হয়েছে।
এ ঘটনায় শাখা ও বিভাগীয় পর্যায়ের মোট ১৩ কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংশ্লিষ্টতার তথ্য উঠে এসেছে। অর্থ আত্মসাৎ নিয়ে চলতি বছরের ১৫ জানুয়ারি ছয় সদস্যের একটি বিশেষ তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি গত ২৫ জানুয়ারি তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করে। প্রতিবেদনে সৈয়দপুর শাখা থেকে সংঘটিত অনিয়মকে ‘গভীর পরিকল্পিত ও দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক জালিয়াতি’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে মো. আলিমুল আল রাজি তমাল জানুয়ারি মাসের শুরু থেকে বিনা অনুমতিতে কর্মস্থলে অনুপস্থিত রয়েছেন এবং বর্তমানে পলাতক। তবে তদন্ত প্রতিবেদনে নাম থাকা সত্ত্বেও তার বিরুদ্ধে এখনো মামলা না হওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়া নিয়ে। এদিকে অগ্রণী ব্যাংকের রংপুর সার্কেলের মহাব্যাবস্থাপক সুধীর রঞ্জন বিশ্বাস এই অর্থ কেলেঙ্কারির ঘটনায় মামলা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন।
অগ্রণী ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত একাধিক ধাপে প্রায় ৬০ কোটি টাকা সরানো হয়। এর আগে লুটপাটের পরিমাণ পাঁচ থেকে ১০ কোটি টাকা। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সিনিয়র অফিসার মো. আলিমুল আল রাজি তমাল শাখার এনজি, আরটিজিএস, ইএফটি, ফরেন রেমিট্যান্স ও ব্যাচ ক্লিয়ারিংসহ গুরুত্বপূর্ণ ডেস্কের দায়িত্বে ছিলেন। তিনি শাখার বিভিন্ন কর্মকর্তার আইডি ও পাসওয়ার্ড গোপনে ব্যবহার করে ভুয়া লেনদেন সৃষ্টি ও সমন্বয়ের মাধ্যমে দীর্ঘদিন অনিয়ম আড়াল করে রাখেন।
কীভাবে এমন লুটপাট হয়েছে, তা নিয়ে তদন্ত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ভুয়া লেজার ও কৃত্রিম লেনদেন ছিল পরিকল্পিতভাবে। তমাল সিএনজি লেজারে ১৩২ কোটি টাকার বেশি ডেবিট ও ক্রেডিট লেনদেন সৃষ্টি করেন, যার বড় অংশ ছিল সম্পূর্ণ কাল্পনিক বা ভুয়া (ফিকটিশাস)। এর মধ্যে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে একাধিক ভুক্তির মাধ্যমে প্রায় ৪২ কোটি ৮৫ লাখ টাকা হিসাববহির্ভূত স্থিতি তৈরি করা হয়, যা পরবর্তী সময়ে আর সমন্বয় করা সম্ভব হয়নি। তদন্ত দলের বিশ্লেষণে প্রতীয়মান হয়, এই পুরো অর্থ ইতোমধ্যে আত্মসাৎ করা হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন ভাউচার ও চেক ক্লিয়ারিংয়ের মাধ্যমে আরও প্রায় ২৪ কোটি টাকা সরানোর তথ্য পেয়েছে তদন্ত কমিটি। সব মিলিয়ে আত্মসাৎকৃত অর্থের মোট অঙ্ক দাঁড়ায় প্রায় ৬৬ কোটি টাকা।
তদন্ত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, সৈয়দপুর শাখার ক্লিয়ারিং সাসপেন্স হিসেব থেকে ডেবিট করে অগ্রণী সুপার হিসেবে ৯ কোটি ৪৫ লাখ এবং নিলুফা আক্তারের অগ্রণী সুপার অ্যাকাউন্টে ৭ কোটি ২৮ লাখ, রোদেলা আক্তারের অ্যাকাউন্টে ৫ কোটি ২০ লাখ টাকা হস্তান্তর করে এবং পরে তা তমাল নিজের সিন্ডকেটের মাধ্যমে তুলে নেয় এবং পাচার করে। এ ছাড়া সৈয়দপুর শাখার ক্লিয়ারিং সাসপেন্সে হিসেব থেকে ইসলামি ব্যাংকিং উইন্ডো, রংপুর বাস টার্মিনাল শাখায় ১৫ কোটি ২৯ লাখ এবং একইভাবে আরটিজিএস (বিডিটির) মাধ্যমে ৮ কোটি ৭৭ লাখ টাকা আত্মসাৎ করা হয়।
অনিয়ম ও অর্থ লুটপাটের ঘটনায় তদারকির ঘাটতি ও ব্যবস্থাপনাগত ব্যর্থতা ছিল বলে তদন্তে উঠে আসে। জানা যায়, দৈনিক ভিত্তিতে এনজি রিকনসিলিয়েশন না করা, মাসিক সমন্বয়ের ওপর নির্ভরতা এবং কোর ব্যাংকিং সফটওয়্যারে বাধ্যতামূলক নিয়ন্ত্রণের অভাবকে অনিয়মের প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এছাড়া আঞ্চলিক ও প্রধান কার্যালয়ের একাধিক পরিদর্শনের কথা নথিতে উল্লেখ থাকলেও সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনের পূর্ণাঙ্গ দালিলিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এর ফলে রংপুর আঞ্চলিক কর্মকর্তাদের জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেছে। তবে সেসব কর্মকর্তার মধ্যে রংপুর অঞ্চলের তৎকালীন কর্মকর্তা ডিজিএম মোস্তাফা ই কাদের, এজিএম মো. জাহাঙ্গীর আলম, ডিজিএম ইকবাল করিম আকন্দ জিড়ত থাকার কথা বলেছেন তদন্তকারী দল।
এছাড়া আরও যারা এর সঙ্গে রয়েছেন, তারা হলেনÑসৈয়দপুর শাখার এসপিও মনিরুজ্জামান, পিও জায়েম, এসও (সুপারনিউমেরারি) আব্দুল খালেক সরকার, সিনিয়র অফিসার শাহনাজ বেগম, অফিসার (ক্যাশ) তমাল চন্দ্র রায়, সিনিয়র অফিসার (অব.) আব্দুল ওয়াজেদ, সিনিয়ন অফিসার (সুপার নিউমেরারি) মো. তাইজুল ইসলাম, সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার মো. আব্দুল লতিফ, অফিসার (ক্যাশ) মো. মাইদুল ইসলাম, সিনিয়র অফিসার মো. আমিরুল ইসলাম ও এসও মো. আক্তারুজ্জামান।
ব্যাংকের একাধিক সূত্র দাবি করেছে, ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনোয়ারুল ইসলাম দায়িত্ব গ্রহণের পর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে পছন্দের কর্মকর্তাদের বদলি ও পদায়ন করেন। তদন্ত প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, রংপুর সার্কেলের জিএম স্বপন কুমার ধর এই অনিয়ম সম্পর্কে অবগত ছিলেন এবং আত্মসাতের অর্থের একটি অংশ নিজে আত্মসাৎ করেছেন বলে এমন অভিযোগও নথিতে উঠে এসেছে। অন্যদিকে তদন্তে সংশ্লিষ্ট হিসেবে চিহ্নিত ১৩ কর্মকর্তাকে বিভিন্নভাবে বদলি ও বিভাগীয় শাস্তির আওতায় আনা হয়েছে বলে জানা গেছে।
এ বিষয়ে অগ্রণী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনোয়ারুল ইসলামের সঙ্গে কথা বলার জন্য শেয়ার বিজের প্রতিনিধি যোগাযোগ করলেও তিনি কথা বলেননি। তবে একাধিক গণমাধ্যম প্রতিনিধিকে জানান, সৈয়দপুর শাখার অর্থ আত্মসাতের বিষয়টি তিনি ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে অবগত হন। বিষয়টি জানার পরপরই তিনি বিশেষ নিরীক্ষার নির্দেশ দেন এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ও বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ শেয়ার বিজকে জানান, অর্থ আত্মসাতের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, দ্রুত সময়ের মধ্যে প্রকৃত চিত্র উদ্ঘাটন করে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উল্লেখ্য, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের মধ্যে অগ্রণী ব্যাংকে একের পর এক আর্থিক কেলেঙ্কারির অভিযোগ নতুন নয়। তবে অগ্রণী ব্যাংকের সৈয়দপুর শাখায় সংঘটিত এই ৬৬ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে আবারও প্রশ্ন উঠেছে ব্যাংক খাতের তদারকি, জবাবদিহিতা ও শাসনব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে।
প্রিন্ট করুন









Discussion about this post