বাণিজ্য সংবাদ শিল্প-বাণিজ্য

অটোমোবাইল শিল্পের উন্নয়নে নীতি সহায়তা ও প্রণোদনা প্রয়োজন

ডিসিসিআই ওয়েবিনারে বিশেষজ্ঞরা

নিজস্ব প্রতিবেদক: উপযুক্ত নীতি সহায়তা, প্রণোদনা প্রদান ও কর সুবিধা দেয়া হলে স্থানীয় অটোমোবাইল শিল্পের উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে বলে অভিমত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। গতকাল ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) আয়োজিত ‘অটোমোবাইল শিল্পের উন্নয়ন: বর্তমান বাস্তবতা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা’ শীর্ষক ওয়েবিনারে বিশেষজ্ঞরা এ মত দেন।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে যোগ দেন শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূন। সম্মানিত অতিথি হিসেবে যোগ দেন বাংলাদেশে নিযুক্ত জাপানের রাষ্ট্রদূত ইতো নায়কি।

স্বাগত বক্তব্যে ঢাকা চেম্বারের সভাপতি রিজওয়ান রাহমান বলেন, আমাদের অটোমোবাইল শিল্পে মূলত আমদানিনির্ভর রিকন্ডিশন গাড়ির প্রাধান্যই বেশি। তবে জাপান, চীন ও ভারত থেকে কিছু নতুন গাড়িও আমদানি করা হয়, যার সংখ্যা তেমন উল্লেখযোগ্য নয়। ডিসিসিআই সভাপতি জানান, কভিড-পূর্ববর্তী সময়ে দেশের এ শিল্প খাত প্রতিবছর গড়ে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেলেও বিআরটিএর তথ্যমতে, ২০২০ সালে বাংলাদেশে মোটর ভিহিক্যালের নিবন্ধন কমেছে প্রায় ২৪ শতাংশ। তিনি আরও বলেন, দীর্ঘমেয়াদি নীতিমালার অভাব, সহায়ক শুল্ক কাঠামো না থাকা, স্থানীয়ভাবে পর্যাপ্ত কাঁচামালের জোগান না থাকা এবং দক্ষ মানবসম্পদ ও বেকওয়ার্ড লিংকেজ খাতের অনুপস্থিতির কারণে আমাদের অটোমোবাইল শিল্পে কাক্সিক্ষত প্রবৃদ্ধি অর্জন করা সম্ভব হচ্ছে না।

তিনি উল্লেখ করেন, এ খাতের সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর জন্য শিল্প মন্ত্রণালয় ১০ বছর মেয়াদি ‘বাংলাদেশ অটোমোবাইল সেক্টর রোডম্যাপ, ২০২১-২২’ এবং ‘অটোমোবাইল-ম্যানুফ্যাকচারিং ডেভেলপমেন্ট পলিসি’র খসড়া প্রস্তুত করেছে, যা দ্রুততম সময়ের মধ্যে চূড়ান্তকরণ করা একান্ত অপরিহার্য।

শিল্পমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকারের সুদক্ষ নেতৃত্বের কারণে বাংলাদেশ আগামী ২০২৬ সাল নাগাদ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হবে। তিনি জানান, বর্তমানে আমাদের মাথাপিছু গড় আয় প্রায় দুই হাজার ৬৪ মার্কিন ডলার। তিনি আশা প্রকাশ করেন, সামনের দিনগুলোয় মাথাপিছু আয় আরও বৃদ্ধি পাবে, যার ফলে দেশের মানুষের মাঝে নিরাপদ যোগাযোগমাধ্যম হিসেবে ব্যক্তিগত গাড়ির পাশাপাশি আধুনিক সুবিধাসংবলিত যানবাহন ব্যবহারের প্রবণতা বাড়বে। এটি অটোমোবাইল খাতের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।

মন্ত্রী জানান, এ খাতের সম্ভাবনা কাজে লাগানোর জন্য একটি সহায়ক নীতিমালার খসড়া প্রস্তুত করার জন্য কাজ করছে শিল্প মন্ত্রণালয়, যেটি দ্রুততম সময়ের মধ্যে চূড়ান্ত করা হবে। পাশাপাশি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোয় এ খাতের যন্ত্রাংশ উৎপাদনে শিল্প-কারখানা স্থাপনে এগিয়ে আসার জন্য দেশি-বিদেশি উদ্যোক্তাদের প্রতি আহ্বান জানান শিল্পমন্ত্রী।

ইতো নায়কি বলেন, অনেক দেশের শিল্পায়নে অটোমোবাইল খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বিশেষ করে জাপানে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে অটোমোবাইল শিল্প উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করছে এবং বাংলাদেশের সেই উদাহরণ অনুসরণের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। এ লক্ষ্যে একটি সমন্বিত নীতিমালা অপরিহার্য বলে তিনি মত প্রকাশ করেন এবং সেইসঙ্গে সরকারি ও বেসরকারি খাতকে একযোগে কাজ করার জন্য আহ্বান জানান। রাষ্ট্রদূত বলেন, বাংলাদেশের অটোমোবাইল খাতের বিকাশ ত্বরান্বিত করতে হালকা প্রকৌশল শিল্পকে এগিয়ে আসতে হবে।

মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ইফাদ গ্রুপ অব বাংলাদেশের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক তাসকিন আহমেদ। মূল প্রবন্ধে তিনি বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বাংলাদেশ অবকাঠামো খাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি লাভ করছে এবং বিশেষ করে পদ্মা সেতু পুরোদমে চালু হলে স্থানীয় পর্যায়ে বাণিজ্যিক যানবাহনের চাহিদা বৃদ্ধির ভালো সম্ভাবনা রয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, ‘বিবিআইএন মোটর ভিহিক্যাল এগ্রিমেন্ট’-এর কারণে এ অঞ্চলে বাণিজ্যিক যানবাহনের চাহিদাও বাড়বে। তিনি বলেন, খসড়া আটোমোবাইল নীতিমালায় সরকার ব্যবহƒত গাড়ি আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের পরিকল্পনা নিয়েছে, যা আমাদের স্থানীয় অটোমোবাইল খাতের সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

ওয়েবিনারের নির্ধারিত আলোচনায় বাংলাদেশস্থ মার্কিন দূতাবাসের ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্দো-প্যাসিফিক অ্যাফেয়ার্স ইউনিটের প্রধান জন ডি ডানহাম, প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. তৌহিদুজ্জামান, উত্তরা গ্রুপ অব কোম্পানিজের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাতিউর রহমান এবং বারভিডা’র সভাপতি আব্দুল হক অংশগ্রহণ করেন।

মাতিউর রহমান বলেন, দেশের অবকাঠামো উন্নয়নের কারণে অটোমোবাইল খাতের উন্নয়নের প্রচুর সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে এবং স্থানীয় উদ্যোক্তাদের সঙ্গে পর্যালোচনার মাধ্যমে খসড়া অটোমোবাইল নীতিমালা বাস্তাবয়নের আহ্বান জানান। এছাড়া তিনি অটোমোবাইল খাতের শিল্পায়নকে আরও সম্প্রসারণের লক্ষ্যে সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে সহযোগিতার মনোভাব নিয়ে এগিয়ে আসার ওপর জোরারোপ করেন।

তৌহিদুজ্জামান বলেন, সিবিও ভিহিক্যালের মাধ্যমে আমাদের দেশের যানবাহনের চাহিদা মেটানো হয়, তবে আমাদের লক্ষ্য হলো নিজস্ব গাড়ির ব্র্যান্ড তৈরি করা। তিনি জানান, আমরা বর্তমানের অ্যাসেম্বলিং থেকে প্রগ্রেসিভ ম্যানুফ্যাকচারার্স হিসেবে রপান্তরিত হতে যাচ্ছি। এজন্য খুচরা যন্ত্রপাতি তৈরির ক্ষেত্রে নিজস্ব সক্ষমতা বাড়াতে হবে। এর পাশাপাশি গবেষণা কার্যক্রম বাড়নোর ওপর তিনি জোরারোপ করেন।

বারভিডা’র সভাপতি আব্দুল হক বলেন, অটোমোবাইল খাতের বিকাশে আমাদের নিজস্ব বাজার তৈরিই বড় চ্যালেঞ্জ এবং নিজস্ব বাজার সম্প্রসারণে সরকারকে সহায়তা প্রদানের পাশাপাশি শিল্প মন্ত্রণালয়কে এ ব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে।

সৈয়দ ইমতিয়াজ আহমেদ গাড়িতে ব্যবহƒত ‘ইলেকট্রনিক কন্ট্রোল ইউনিট (ইসিইউ)’ উৎপাদনেও এটি ব্যবহারের ক্ষেত্রে সফটওয়্যার তৈরিতে দক্ষ মানবসম্পদের জন্য বাংলাদেশকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান এবং এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়কে সহায়তা প্রদানে সরকারের সহযোগিতার ওপর জোরারোপ করেন।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..