রামিসা রহমান : বাংলাদেশের পুঁজিবাজার দীর্ঘদিন ধরেই নানা ধরনের অনিয়ম, কারসাজি ও তথ্য গোপনের অভিযোগে আলোচিত। বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধারে বিভিন্ন সময় নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো নানা উদ্যোগ নিলেও মাঝেমধ্যে এমন কিছু ঘটনা সামনে আসে, যা পুরো ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। সাম্প্রতিক সময়ে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত খাদ্য ও আনুষঙ্গিক খাতের কোম্পানি গোল্ডেন হারভেস্ট অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডকে ঘিরে যে আর্থিক অনিয়ম ও জালিয়াতির অভিযোগ সামনে এসেছে, তা আবারও দেশের করপোরেট গভর্ন্যান্স ও নিরীক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা সৃষ্টি করেছে।
নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) সম্প্রতি কোম্পানিটির আর্থিক প্রতিবেদনে মিথ্যা তথ্য উপস্থাপনের অভিযোগে নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান ম্যাবস অ্যান্ড জে পার্টনার্স চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টসের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিলকে (এফআরসি) আনুষ্ঠানিকভাবে অনুরোধ জানিয়েছে। কমিশনের অনুসন্ধানে কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদনে ভয়াবহ অসংগতি ও সম্ভাব্য জালিয়াতির চিত্র উঠে এসেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
বিএসইসির অনুসন্ধান অনুযায়ী, ২০২০ থেকে ২০২২ অর্থবছর পর্যন্ত কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদনে একাধিক বিভ্রান্তিকর ও অসত্য তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে। কমিশনের পরিদর্শন দল কোম্পানির কারখানা, দপ্তর এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পরীক্ষা করে এসব অনিয়মের প্রাথমিক প্রমাণ পেয়েছে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, কোম্পানি বিভিন্ন ভুয়া ও বানোয়াট লেনদেনের মাধ্যমে তাদের আর্থিক অবস্থাকে বাস্তবের তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছে। এতে কোম্পানির প্রকাশিত আর্থিক প্রতিবেদন এমনভাবে সাজানো হয়েছে, যাতে তা বিনিয়োগকারীদের কাছে আকর্ষণীয় ও ইতিবাচক মনে হয়। কিন্তু বাস্তবে এসব তথ্যের বড় অংশই বিভ্রান্তিকর বলে কমিশনের তদন্তে উঠে এসেছে।
বিনিয়োগকারীদের আস্থা ধরে রাখতে কোম্পানি কোথাও সম্পদের মূল্য অতিরঞ্জিত করে দেখিয়েছে, আবার কোথাও এমন সম্পদকে কাগজে-কলমে দেখানো হয়েছে, যার বাস্তবে কোনো অস্তিত্ব নেই। আর্থিক প্রতিবেদনের এই ধরনের বিকৃতি কেবল কোম্পানির প্রকৃত আর্থিক অবস্থাকে আড়ালই করে না, বরং বিনিয়োগকারীদের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করে।
কোনো কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদনের নির্ভরযোগ্যতা অনেকাংশেই নির্ভর করে তার নিরীক্ষা বা অডিট প্রক্রিয়ার ওপর। কিন্তু গোল্ডেন হারভেস্টের ক্ষেত্রে নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।
বিএসইসির তদন্তে উঠে এসেছে যে, কোম্পানিটির নিরীক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করা ম্যাবস অ্যান্ড জে পার্টনার্স চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে ব্যর্থ হয়েছে। তারা আর্থিক প্রতিবেদনে থাকা গুরুত্বপূর্ণ অসংগতিগুলো শনাক্ত করতে পারেনি, অথবা তা প্রতিবেদনে যথাযথভাবে উল্লেখ করেনি।
ফলে কোম্পানির নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী বিনিয়োগকারীদের কাছে নির্ভরযোগ্য বলে প্রতীয়মান হলেও বাস্তবে তা বিভ্রান্তিকর তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এর ফলে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা কোম্পানির প্রকৃত আর্থিক অবস্থা সম্পর্কে ভুল ধারণা পেয়েছেন এবং অনেকেই অজান্তেই বড় ধরনের আর্থিক ঝুঁকির মুখে পড়েছেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের ঘটনা নিরীক্ষা ব্যবস্থার ওপর বিনিয়োগকারীদের আস্থাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
সম্প্রতি বিএসইসির চিফ অ্যাকাউন্ট্যান্ট ডিভিশন থেকে এফআরসির চেয়ারম্যান বরাবর একটি চিঠি পাঠানো হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। ওই চিঠিতে কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদনে মিথ্যা তথ্য উপস্থাপন এবং নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানের সম্ভাব্য অবহেলার বিষয়টি বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, কমিশন তার নিয়ন্ত্রক ক্ষমতা প্রয়োগের অংশ হিসেবে গোল্ডেন হারভেস্ট অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের কারখানা ও দপ্তর পরিদর্শন করেছে। সেই পরিদর্শনে কোম্পানির হিসাবপত্র ও অন্যান্য নথিপত্রে গুরুতর অসংগতি এবং সম্ভাব্য আর্থিক বিকৃতির প্রমাণ পাওয়া গেছে।
চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, কোম্পানিটি সংশ্লিষ্ট ও অ-সংশ্লিষ্ট পক্ষের সঙ্গে মিথ্যা ও মনগড়া লেনদেন সম্পাদন করেছে এবং আর্থিক বিবরণীতে বিভ্রান্তিকর সম্পদ অবস্থান উপস্থাপন করেছে। একই সঙ্গে আইনগত নিরীক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করা সত্ত্বেও নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান এসব গুরুত্বপূর্ণ বিকৃতি শনাক্ত করতে ব্যর্থ হয়েছে।
এই ধরনের ঘাটতি নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণীর বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে এবং পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারী ও অংশীজনদের আস্থাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
চিঠিতে সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ রুলস ২০২০-এর বিধি ১৪(৫) অনুযায়ী গোল্ডেন হারভেস্ট-সংক্রান্ত পরিদর্শন প্রতিবেদন সংযুক্ত করে এফআরসির কাছে পাঠানো হয়েছে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট ফার্ম এবং তাদের অংশীদারদের বিরুদ্ধে যথাযথ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানানো হয়েছে। চিঠিতে বলা হয়েছে, ওই রেফারেন্সের তারিখ থেকে ৬০ দিনের মধ্যে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করে কমিশনকে অবহিত করতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং বিভাগের অধ্যাপক আল-আমিন শেয়ার বিজকে বলেন, নিরীক্ষকের প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকা এই ঘটনার সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক। ‘কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদনের ওপর বিনিয়োগকারীরা নির্ভর করেন নিরীক্ষার কারণে। যদি নিরীক্ষকের ভূমিকাই প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তাহলে পুরো ব্যবস্থার ওপরই আস্থা কমে যায়।’
তিনি আরও বলেন, অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। একই সঙ্গে এফআরসিকেও নিরীক্ষা তদারকিতে আরও কঠোর ভূমিকা পালন করতে হবে। এ ধরনের ঘটনায় শুধু নিরীক্ষকের দায়ই নয়, কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদেরও দায় রয়েছে। তাই করপোরেট গভর্ন্যান্স জোরদার করতে স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগের ক্ষেত্রেও নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে আরও সতর্ক হতে হবে।
পুঁজিবাজার বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের ঘটনা বিনিয়োগকারীদের আস্থাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। কারণ সাধারণ বিনিয়োগকারীরা কোম্পানির আর্থিক বিবরণীর ওপর নির্ভর করেই বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেন। যদি সেই আর্থিক বিবরণীই বিভ্রান্তিকর বা অসত্য তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়, তাহলে বিনিয়োগকারীরা অজান্তেই ক্ষতির ঝুঁকিতে পড়ে যান।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে অতীতে একাধিকবার আর্থিক তথ্য বিকৃতি ও নিরীক্ষা ত্রুটির ঘটনা সামনে এসেছে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। বিগত সরকারের আমলে আইন বা বিধি-বিধান লঙ্ঘন করা কোম্পানি ও তাদের নিরীক্ষকদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নজির তুলনামূলকভাবে কম ছিল বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন। তবে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর পুনর্গঠিত বিএসইসির চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদের নেতৃত্বাধীন নতুন কমিশন এ ধরনের অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে বলে জানা গেছে।
বিএসইসি’র মুখপাত্র ও পরিচালক মো. আবুল কালাম শেয়ার বিজকে বলেন, ‘বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষা এবং বাজারে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এমন অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। এ কারণেই বিষয়টি এফআরসির নজরে আনা হয়েছে।’
গোল্ডেন হারভেস্টের কোম্পানি সচিব মো. ইব্রাহিম হোসাইন শেয়ার বিজকে বলেন, আমি এক বছর হলো কোম্পানিতে এসেছি। এই অডিট জালিয়াতি আমার আসার আগে হয়েছে। এই বিষয়ের কোনো চিঠি আমার কাছে নেই। এ কারণে আমি কোনো মন্তব্য করতে পারছি না।
গোল্ডেন হারভেস্ট অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড ২০১৩ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়। ‘বি’ ক্যাটেগরির এ কোম্পানির পরিশোধিত মূলধন বর্তমানে প্রায় ২৭২ কোটি ৯১ লাখ ৬০ হাজার টাকা।
কোম্পানিটির মোট শেয়ারসংখ্যা প্রায় ২৭ কোটি ২৯ লাখ ১৬ হাজার ৪৮৩টি। সর্বশেষ ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তথ্য অনুযায়ী, কোম্পানিটির ৩০ দশমিক ৪২ শতাংশ শেয়ার উদ্যোক্তাদের হাতে রয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের কাছে রয়েছে ৩৭ দশমিক ১১ শতাংশ শেয়ার। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের হাতে রয়েছে মাত্র শূন্য দশমিক ২২ শতাংশ শেয়ার এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে রয়েছে প্রায় ৩২ দশমিক ২৫ শতাংশ শেয়ার।
কোম্পানিটির উল্লেখযোগ্য অংশের শেয়ার সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে রয়েছে। ফলে আর্থিক প্রতিবেদনে কোনো ধরনের অসঙ্গতি বা জালিয়াতির প্রভাব সরাসরি সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ওপর পড়তে পারে। গোল্ডেন হারভেস্টকে ঘিরে এই ঘটনা দেশের করপোরেট গভর্ন্যান্স কাঠামোর কার্যকারিতা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেবল নিয়ন্ত্রক সংস্থার তদারকি বাড়ালেই হবে না, বরং কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদ, নিরীক্ষা কমিটি এবং বাহ্যিক নিরীক্ষকদের মধ্যেও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়া নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাজের মান তদারকি করতে এফআরসিকে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। এখন সব নজর রয়েছে এফআরসির পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে। কমিশনের চিঠি পাওয়ার পর এফআরসি যদি বিষয়টি তদন্ত করে নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানের অবহেলা বা সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পায়, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী বিভিন্ন ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। এর মধ্যে থাকতে পারে জরিমানা, লাইসেন্স স্থগিত বা বাতিল, কিংবা সংশ্লিষ্ট অংশীদারদের বিরুদ্ধে পেশাগত নিষেধাজ্ঞা।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনায় কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হলে তা পুঁজিবাজারে একটি ইতিবাচক বার্তা দেবে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের অনিয়ম কমাতে সহায়তা করবে। বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনতে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার বিকল্প নেই। গোল্ডেন হারভেস্টকে ঘিরে সাম্প্রতিক অভিযোগগুলো শুধু একটি কোম্পানির অনিয়মের বিষয় নয়, বরং পুরো ব্যবস্থার দুর্বলতাকেই সামনে নিয়ে এসেছে।
প্রিন্ট করুন










Discussion about this post