প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

অদৃশ্য সিন্ডিকেটে বাড়ছে চালের দাম

মেহেদী হাসান, রাজশাহী: গত ভরা বোরো মৌসুমে বাজারে ছিল নতুন ধানের ছড়াছড়ি, কিন্তু সে সময় দেখা মেলেনি নতুন চালের। পাইকারি থেকে খুচরা পর্যন্ত সব দোকানেই বিক্রি হচ্ছে পুরোনো চাল। তাহলে নতুন মৌসুমের নতুন চাল কোথায় গেল? খুচরা ব্যবসায়ীরা বলছেন, গুদামে ভর্তি হয়েছে এ বছরের সব ধান। বর্তমানে চালের পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকলেও গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে কেজিতে দাম বেড়েছে ছয় থেকে ৮ টাকা। ফলে ৫০ কেজির বস্তায় দাম বেড়েছে ২০০ টাকা। সবচেয়ে বেশি বেড়েছে মিনিকেট ও নাজিরশাইল চালের দাম।

শুক্রবার রাজশাহীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বাজারের প্রতিটি চালের দোকানে পুরোনো চাল। নতুন চালের দেখা নেই এখনও। পাইকারি ব্যবসায়ীরা জানান, বাজারে ধানের দাম বেড়েছে, তাই চালের দাম বাড়ছে। অপরদিকে খুচরা ব্যবসায়ীদের দাবি, সবকিছু হয় অদৃশ্য সিন্ডিকেটের মাধ্যমে। বড় বড় চালকলের মালিকরা লাখ লাখ মণ ধান-চাল মজুত করছেন। সরকার সবকিছু মনিটরিং করছে ঠিকই, কিন্তু কার্যকর কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করছে না। হাতের নাগালের বাইরে চালের সিন্ডিকেট। তাদের কারণেই চালের দাম বাড়ছে।

রাজশাহীর সাহেববাজারের পাইকারি চাল ব্যবসায়ী বদিরুল আলম শেয়ার বিজকে বলেন, সিন্ডিকেটের মাধ্যমে অতিরিক্ত দাম পাওয়ার আশায় চাল মজুত করে রাখছেন মিল মালিকরা। চালের দাম বাড়ানোর নেপথ্যে একটা অদৃশ্য সিন্ডিকেট কাজ করছে। জনগণকে জিম্মি করে একশ্রেণির অসাধু মিল মালিক মুনাফা করতে চান। এখন চলতি ধানের মৌসুমে বাজারে নতুন চাল আসেনি। এর কারণ চালের দাম আরও বাড়বে। মজুতদারদের কৈফিয়ত হিসেবে এখন জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি যোগ হয়েছে। যখন জ্বালানি তেলের দাম বাড়েনি তখন কী কারণে চালের দাম বেড়েছেÑএ প্রশ্ন রাখেন এই বিক্রেতা।

অপরদিকে এমন অভিযোগ মানতে নারাজ মিল মালিকরা। তারা বলছেন, করোনায় অনেক মিল বন্ধ হয়ে গেছে। তারা আর উৎপাদনে ফিরতে পারেনি। তাছাড়া ধানের দাম অন্যান্য দুই-পাঁচ বছরের চেয়ে বেশি। বেশি দামে ধান কেনার কারণে বেশি দামে চাল বিক্রি করতে হচ্ছে। তাছাড়া মিল মালিকদের অবৈধভাবে চাল গুদামজাত করার কোনো সুযোগ নেই।

নওগাঁ জেলা চালকল সমিতির সাধারণ সম্পাদক ফরহাদ হোসেন চাকলাদার শেয়ার বিজকে বলেন, আমাদের মিল মালিকদের কাছে যদি অতিরিক্ত কোনো ধান কিংবা চাল পাওয়া যায় তাহলে সরকার ব্যবস্থা গ্রহণ করুক। মজুত নীতিমালা অনুযায়ী সরকার অভিযান পরিচালনা করুক। আমাদের কাছে কোনো অতিরিক্ত ধান-চাল মজুত নেই। সব অভিযোগ ভিত্তিহীন। এ নেতা চালের দাম বাড়ার কারণ হিসেবে বলেন, ধানের দাম বেড়েছে তাই চালের দাম বাড়ছে। ভবিষতে চালের দাম কী হবে, তা এখনই বলা যাচ্ছে না। গত বোরো মৌসুমে ধানের উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার কারণে প্রভাব পড়েছে চালের বাজারে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মিল মালিক শেয়ার বিজকে বলেন, চালের দাম বেড়ে গেলে বিভিন্ন জায়গায় চালকল মালিকদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু হয়। বিভিন্ন জায়গায় লাখ লাখ মণ চাল বের হয়। এখন তাহলে অভিযান করা হচ্ছে না? সরকার ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের বাইরে কিছু করতে পারবে না। কোনো তদারকি নেই, বাজার মনিটরিং নেই, যা করা হয় সব লোকদেখানো। নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও দিনাজপুরের মিলগুলোয় হানা দিলে দেখা যায় দুই দিনে চালের দাম নিয়ন্ত্রণে এসেছে। মিলাররা মজুত করার কারণেই চালের দাম বাড়ছে।

ধান-চাল মজুতের কথা স্বীকার করেছেন খোদ খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার। বোরোর চলতি মৌসুমে অভ্যন্তরীণ সংগ্রহ ও বাজার মনিটরিং-সংক্রান্ত অনলাইন মতবিনিময় সভায় খাদ্যমন্ত্রী বলেন, অধিকাংশ মিল মালিক বাজার থেকে ধান কিনলেও তারা উৎপাদনে যাচ্ছেন না। বাজারে নতুন চাল এখনও আসছে না। এখন বাজারে যে চাল পাওয়া যাচ্ছে, তা গত বছরের পুরোনো চাল। তাহলে নতুন ধান যাচ্ছে কোথায়?

শুক্রবার সাহেববাজারের এক চালের আড়তের মালিক রুবেল হোসেন বলেন, তেলের দাম বাড়ার পর থেকেই চালের দাম বাড়তে শুরু করেছে। প্রতিদিন মিলগেটে চালের দাম বস্তাপ্রতি ৩০ থেকে ৪০ টাকা বাড়ছে। তিন-চার দিনের ব্যবধানে সেটা ৩০০ টাকা ছাড়িয়ে গেছে।

দেশের চালের মোকামে সব ধরনের চালের দাম কেজিতে ছয় থেকে ১০ টাকা বাড়িয়েছেন মিলাররা। চলতি সপ্তাহে তেলের দাম বাড়াতে উৎপাদন খরচ বাড়াতে বাজারে চালের দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন। আর এতেই বস্তায় ৩০০-৭০০ টাকা বেড়েছে।

রাজশাহী বাজারে চলতি সপ্তাহে ৫০ কেজি ওজনের স্বর্ণা-৫ চালের বস্তা গত সপ্তাহে দুই হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি হলেও এ সপ্তাহে তা দাম বেড়ে দুই হাজার ৭০০ টাকায় দাঁড়িয়েছে। জিরাশাইলের দাম তিন হাজার ৪০০ থেকে বেড়ে তিন হাজার ৬০০ টাকা, কাটারি স্টার তিন হাজার ৪০০ থেকে বেড়ে তিন হাজার ৫৫০ টাকা এবং মিনিকেট ৫০ কেজির বস্তার দাম তিন হাজার ২০০ টাকা থেকে বেড়ে তিন হাজার ৩৫০ টাকায় উঠে গেছে। আঠাশের দাম দুই হাজার ৯০০ থেকে বেড়ে তিন হাজার ১০০ টাকা, পোলাওয়ের চাল হিসেবে খ্যাত চিনিগুঁড়া চাল পাঁচ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি হলেও সপ্তাহে বেড়েছে ৭০০ টাকা, বিক্রি হচ্ছে ছয় হাজার টাকায়।

হঠাৎ চালের দাম বাড়ায় নি¤œ আয়ের মানুষ বিপাকে পড়েছে। ক্রেতাদের অভিযোগ, অধিক মুনাফার সুযোগ নিচ্ছেন মিল মালিকরা। খুচরা বাজারে প্রতি কেজিতে ছয় থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত বেশি দিয়ে চাল কিনতে গিয়ে আয়-ব্যয়ের হিসাব মেলাতে হিমশিম খাচ্ছেন ক্রেতারা। সংসার চালানো খুব কষ্টকর। এক কেজি চালে ছয় টাকা বেড়ে যাওয়া মানে মাসে এক হাজার টাকা বাড়তি গুনতে হচ্ছে।

মাস্টারপাড়া কাঁচাবাজারের চাল ব্যবসায়ী সুশীল কুমার বলেন, ‘চালের দাম বাড়ছে। আমরা আড়তে গিয়ে চাল পাচ্ছি না। ধানের দাম বাড়ার কারণে চালের দাম বাড়তি। এক সপ্তাহ আগের চেয়ে বর্তমানে প্রতিকেজি চালে বেড়েছে আট থেকে ১০ টাকা।

এপি চাল ভাণ্ডারের মালিক ও চাল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি শেয়ার বিজকে বলেন, চালের মোকাম ও মিলগুলোয় কারসাজি করে চালের দাম নির্ধারণ করা হয়। খুচরা ব্যবসায়ীদের পকেটে লাভের টাকা আসে না, যা যায় সিন্ডিকেট আর পাইকারি ব্যবসায়ীদের পকেটে।