অধিক রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় উচ্চহারে টোল আরোপ

পদ্মা সেতু

ইসমাইল আলী: পদ্মা সেতু নির্মাণে ব্যবহার করা হচ্ছে স্টিলের অবকাঠামো। তবে এ ধরনের অবকাঠামোর রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় অনেক বেশি। আবার পদ্মা সেতুর আয়ুষ্কাল ১০০ বছর ধরা হলেও নির্মাণ শেষে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মাত্র এক বছর এটি দেখাশোনা করবে। এর পর সেতুর দায়িত্ব বাংলাদেশের। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের অধীন বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

এদিকে নিজস্ব অর্থায়নে নির্মাণের পরও সেতুটিতে উচ্চ হারে টোল আরোপ করতে যাচ্ছে সেতু বিভাগ, যা সেতুটির ব্যবহারকারীদের ওপর বোঝা বাড়াবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। এছাড়া পদ্মা সেতুতে ট্রেন চলাচলের জন্য রাখা হয়েছে সিঙ্গেল লাইন রেলপথ। এতে পদ্মা সেতুতে ট্রেন চলাচলের সক্ষমতা অনেক কম হবে বলে মনে করছেন রেলওয়ের কর্মকর্তারা।

সূত্রমতে, পদ্মা সেতু নির্মাণ প্রকল্পের সার্বিক অবস্থা পর্যবেক্ষণে নিবিড় পরিবীক্ষণের উদ্যোগ নেয় আইএমইডি। এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদনটি সম্প্রতি চূড়ান্ত করা হয়েছে। এ প্রতিবেদনে পদ্মা সেতুর বিভিন্ন দুর্বল দিক তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম সেতুটির অধিক রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়। প্রতিবেদনে এ প্রসঙ্গে বলা হয়, সেতুটি স্টিল স্ট্রাকচারের হওয়ায় এর রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় তুলনামূলকভাবে বেশি, যা প্রকল্পটির দুর্বল দিক।

এ প্রসঙ্গে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ট্রেন চলাচল করে এ ধরনের সেতুতে কংক্রিটের চেয়ে স্টিলের অবকাঠামোই বেশি উপযুক্ত। কারণ ট্রেন চলাচলে সৃষ্ট কম্পনের ফলে কংক্রিটে ভাঙন সৃষ্ট হয়। এতে সেতুতে দ্রুত ফাটল ধরে, যেমনটি বঙ্গবন্ধু সেতুতে দেখা গিয়েছিল। তবে স্টিলের সেতুতে নাট-বোল্ট দ্রুত ক্ষয় হয়। বিশেষ করে ট্রেন চলাচলের ফলে সৃষ্ট কম্পনের দরুন পদ্মা সেতুতে তা আরও বেশি সমস্যা সৃষ্টি করবে। এজন্য নিয়মিত এগুলো রক্ষণাবেক্ষণ করতে হবে। এছাড়া লোহার অন্যতম শত্রু পানি। যেহেতু পানির ওপর সেতু নির্মাণ করা হয়, তাই স্টিলের অবকাঠামোয় দ্রুত জং ধরার ঝুঁকি থাকে। এজন্য সারা বছর ধরে এসব সেতু রং করতে হয়। এজন্য ব্যয়ও বেশি হয়। পাশাপাশি দক্ষ জনবলও দরকার হয়।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. শামছুল হক শেয়ার বিজকে বলেন, বাংলাদেশে অন্যতম স্টিলের সেতু হার্ডিঞ্জ রেল সেতু। এটিকে সারা বছর ধরে রক্ষণাবেক্ষণ করতে হয়। এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত পর্যন্ত রং করতে হবে। নাট-বোল্ট ক্ষয় হলে নিয়মিত প্রতিস্থাপন করতে হয়। পদ্মা সেতুর ক্ষেত্রেও এ ধরনের রক্ষণাবেক্ষণ নিয়মিত করতে হবে। এজন্য ব্যয় বেশি হওয়াটাই স্বাভাবিক। পাশাপাশি পদ্মা সেতুর রক্ষণাবেক্ষণে দক্ষ জনবলও দরকার হবে।

দক্ষ জনবলের বিষয়টি আইএমইডির প্রতিবেদনেও উঠে এসেছে। এতে বলা হয়েছে, নিয়মিত ও প্রয়োজনীয় রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সেতু কর্তৃপক্ষকে দক্ষ জনবল, যন্ত্রপাতি ও প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ করে ডিজাইন লাইফ (১০০ বছর) সময়ে সেতুটি সচল রাখার বিষয়ে প্রয়োজনীয় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

সেতুটির রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব মাত্র এক বছর পালন করবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশন লিমিটেড। এ প্রসঙ্গে আইএমইডির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘প্রকল্পের বাস্তবায়ন সমাপ্ত হলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সেতু কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে প্রকল্প সমাপ্তির প্রত্যয়নপত্র গ্রহণ করবে এবং প্রকল্পের কাজ সমাপ্তির তারিখ থেকে পরবর্তী এক বছর সম্পাদিত কাজের রক্ষণাবেক্ষণ করবে। সম্পাদিত কাজের কোনো ত্রুটি থাকলে তা সমাধান করবে। এক বছর পর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সমাপ্ত কাজগুলো সেতু কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করবে।’

এদিকে নিজস্ব অর্থায়নে নির্মাণ হলেও চালু হওয়ার পর পদ্মা সেতু পার হতে মোটা অঙ্কের টোল দিতে হবে। এক্ষেত্রে বর্তমানে পদ্মা নদী ফেরিতে (শিমুলিয়া-কাওড়াকান্দি) পারাপার হতে যে টাকা লাগে, সেতুতে তার দেড় গুণ বেশি টাকা খরচ করতে  হবে। আর বঙ্গবন্ধু সেতুর টোলের সঙ্গে তুলনায় তা হবে দ্বিগুণেরও বেশি।

সূত্রমতে, বর্তমানে ফেরিতে একটি বড় বাসের পদ্মা নদী পার হতে লাগে এক হাজার ৫৮০ টাকা। পদ্মা সেতু হলে টোল দিতে হবে দুই হাজার ৩৭০ টাকা। আর বঙ্গবন্ধু সেতু পার হওয়ার জন্য বড় বাসের টোল ৯০০ টাকা।

পদ্মা সেতু চালুর পর ১৫ বছরের জন্য একটি টোল হারের তালিকা করেছে সেতু বিভাগ। তালিকা অনুসারে, ছোট ট্রাকের জন্য এক হাজার ৬২০ টাকা, মাঝারি ট্রাকের জন্য দুই হাজার ১০০ টাকা, বড় ট্রাকের জন্য দুই হাজার ৭৭৫ টাকা ও চার এক্সেলের ট্রেইলারের জন্য চার হাজার টাকা টোল প্রস্তাব করা হয়েছে এবং ট্রেইলারের ক্ষেত্রে চার এক্সেলের পর প্রতি এক্সেলে দেড় হাজার টাকা টোল যোগ হবে।

টোলের হার বেশি হওয়া প্রসঙ্গে সেতু বিভাগের কর্মকর্তা বলেন, পদ্মা সেতু নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়ন করা হলেও এজন্য ব্যয়িত অর্থ ঋণ হিসেবে দিচ্ছে অর্থ মন্ত্রণালয়। এ ঋণ সুদসহ ৩৫ বছরে সেতু বিভাগকে ফেরত দিতে হবে। গত বছর ২৯ আগস্ট অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সেতু বিভাগের এ নিয়ে চুক্তি হয়। এই চুক্তিতে পদ্মা সেতুতে চলাচলকারী যানবাহনের টোলের হার কী হবে, কত বছরে টোল আদায় হবে, টোলের টাকা কীভাবে পরিশোধ করতে হবেÑএর বিস্তারিত উল্লেখ রয়েছে। এ ঋণ শোধের খরচ জোগাড় করা ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় মেটানোর জন্য টোলের হার কিছুটা বেশি ধরা হয়েছে। তবে সরকার চাইলে তা আরও কম নির্ধারণ করতে পারে।

তারা বলছেন, এখন পর্যন্ত পদ্মা সেতু প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে অনুদান রয়েছে ৩০০ কোটি টাকা। এই অর্থ পরিশোধ করতে হবে না। ফলে সেতু বিভাগকে আসল হিসেবে ২৯ হাজার ৯০০ কোটি টাকা সরকারকে ফেরত দিতে হবে। এর সঙ্গে বাড়তি এক শতাংশ হারে সুদ গুনতে হবে। অর্থাৎ সুদে-আসলে পরিশোধ করতে হবে ৩৬ হাজার ৪০৩ কোটি টাকা।

এদিকে টোল আদায়ের হার ঠিক করা হয়েছে যানবাহন চলাচলের পূর্বাভাস ধরে। ২০২১ সালে পদ্মা সেতু দিয়ে দৈনিক প্রায় আট হাজার যানবাহন চলাচল করবে ধরা হয়েছে। ৩৫ বছর পর এ সংখ্যা দিনে ৭১ হাজার ছাড়িয়ে যাবে। ব্যয় বৃদ্ধি বা যানবাহন কম চললে টোলের হার নিয়ে আবার ভাবতে হবে বলে মনে করেন তারা।

এগুলোর বাইরেও পদ্মা সেতুর আরেকটি দুর্বল দিক রয়েছে বলে মনে করেন রেলওয়ে সংশ্লিষ্টরা। তারা বলেন, পদ্মা সেতু দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে রাজধানীকে যুক্ত করবে। এতে ওই অঞ্চলের জেলাগুলোর সঙ্গে রেল সংযোগ স্থাপনে এরই মধ্যে প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। এছাড়া বরিশাল হয়ে পায়রা বন্দর পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণের জন্য সম্ভাব্যতা যাচাই চলছে। পায়রা সমুদ্র বন্দর চালু হলে ওই রুটে পণ্যবাহী ট্রেন চলাচলও বাড়বে। পাশাপাশি বর্তমানে অনেকটা ঘুর পথে চলা মৈত্রী ট্রেনও এ সেতু দিয়ে সহজে চলাচল করতে পারবে। তাই পদ্মা সেতুতে ডাবল লাইন রেলপথ নির্মাণ করা দরকার ছিল। এজন্য কয়েক দফা আপত্তি তোলে রেলওয়ে, কিন্তু তা বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। ফলে আগামীতে এ সেতুটি ট্রেন চলাচলের ক্ষেত্রে কম কার্যকর হবে।

জানতে চাইলে অধ্যাপক ড. শামছুল হক বলেন, স্বাভাবিকভাবে চার লেনের সেতুর জন্য যতটুকু জায়গা লাগে ট্রেনের দুই লেনের জন্য তার চেয়ে কিছুটা কম জায়গা লাগে। কারণ মোটরযানের জন্য রাইট অব ওয়ে যতটুকু দরকার, ট্রেনের দুই লেনের জন্য ততটা লাগে না। আর পদ্মা সেতু যেহেতু দুই তলার এবং ওপরতলায় যানবাহন চলাচলের জন্য চার লেনের ব্যবস্থা আছে, তাই নিচতলায় ডাবল লাইন রেলপথ নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় জায়গা থাকার কথা। তবে সম্ভাবতা যাচাই ও বিস্তারিত নকশায় কেন বিষয়টি রাখা হয়নি তা সংশ্লিষ্টরাই ভালো বলতে পারবেন।

এ বিষয়ে সেতু বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, ডাবল লাইন রেলপথের জন্য সেতুটির ভারবাহী সক্ষমতা আরও বাড়াতে হতো। এতে সেতু নির্মাণব্যয় আরও বেড়ে যেত। তাই সিঙ্গেল লাইন রেলপথই রাখা হয়। প্রধানমন্ত্রীও বিষয়টি অনুমোদন দেন। তাই এখন এ বিষয় নিয়ে বিতর্কের কোনো সুযোগ নেই।

সর্বশেষ..