Print Date & Time : 13 April 2021 Tuesday 7:13 pm

অনলাইনে নারীদের হয়রানিকারীরা সাবধান

প্রকাশ: February 20, 2021 সময়- 05:09 pm

মো. মঈনউদ্দীন: তমালিকা সেন আর সুমন মালাকার। স্কুলজীবনে তারা ছিল সহপাঠী, ভালো বন্ধু। তাদের এই বন্ধুত্ব একসময় প্রণয়ে রূপ নেয়। পড়াশোনা শেষ করে দুজনই চাকরি করছে। এবার তারা বিয়ের সিদ্ধান্ত নিল। কিন্তু বাদ সাধল তমালিকার পরিবার। সুমন চাকরি করলেও বংশমর্যাদায় আর সমাজে তার পরিবারের অবস্থানে অনেক পিছিয়ে। শেষমেষ পরিবারের সিদ্ধান্তেই তমালিকাকে ঘর বাঁধতে হলো অন্য এক পুরুষের সঙ্গে। কিন্তু এই বিচ্ছেদ মেনে নিতে পারল না সুমন। সে চেয়েছিল পরিবারের অমতে হলেও দুজনে এক হতে! একপর্যায়ে তার এই বিচ্ছেদ-বেদনা আক্রোশে রূপ নিল। দুজনের প্রেমের সময়কার কিছু ঘনিষ্ঠ ছবি ও ভিডিও সে ফেসবুক এবং ইউটিউবে ছেড়ে দিল ভুয়া আইডি খুলে। ইন্টারনেটের বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে ঘুরতে থাকা এরকম ছবি ও ভিডিও একসময় তমালিকার বন্ধুদের নজরে আসে। তমালিকা জানতে পেরে খুব ভেঙে পড়ে। ভয়, লজ্জা আর অপমানে সে আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নেয়! অকালে ঝরে পড়ে একটি তাজা প্রাণ।
প্রযুক্তির আধুনিকায়নের সঙ্গে সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে নানা ধরনের সাইবার অপরাধ, অধিকাংশ ক্ষেত্রে যার শিকার হচ্ছেন নারীরা। সাইবার জগতে নারীদের হয়রানির ক্ষেত্রটা ব্যাপক ও বিস্তৃত। কারও হয়তো ফেসবুকে আইডি হ্যাক হচ্ছে, পাসওয়ার্ড চুরি করে অ্যাকাউন্টের দখল নিয়ে সেই আইডি ঠিক করে দেয়ার কথা বলে আবার চাওয়া হচ্ছে মোটা অঙ্কের টাকা। আবার কারও নাম, পরিচয় ও ছবি ব্যবহার করে ফেক আইডি খুলে ভিকটিমের ছবি, ভিডিও প্রভৃতি প্রচার করা হচ্ছে। অনেককেই করা হচ্ছে বø্যাকমেইল। পূর্বপরিচয় বা প্রেমের সম্পর্ক বা অন্য কোনোভাবে পাওয়া ছবি, ভিডিও বা তথ্য অনলাইনে ছড়িয়ে দেয়ার ভয় দেখিয়ে কোনো অনৈতিক সুবিধা বা টাকা দাবি করা হচ্ছে। কেউ কেউ সাইবার বুলিংয়ের মুখোমুখি হচ্ছে। মোবাইল বা অন্য মাধ্যমে অশ্লীল শব্দ, লেখা, ছবি বা ভিডিও পাঠিয়েও হয়রানি করা হচ্ছে নারীদের।
কিন্তু বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, সাইবার জগতে প্রতিনিয়ত অসংখ্য নারী এ ধরনের হয়রানির শিকার হলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নারীরা তাদের ওপর ঘটে যাওয়া অপরাধ সম্পর্কে অভিযোগ করেন না। এর একটি কারণ হয়তো তারা ভয় পান যে, অভিযোগ করতে গিয়ে আবার অন্য কোনো হয়রানির শিকার হতে হয় কি না। অথবা লোকলজ্জা বা অপমানিত হওয়ার আশঙ্কা থেকেও হয়তো তারা প্রতিকার না চেয়ে নীরবে নিজেদের গুটিয়ে নেন।
নারীদের সেই লোকলজ্জা কিংবা ভয়ের দিন এবার শেষ হতে যাচ্ছে। তেমনিভাবে শেষ হতে যাচ্ছে সাইবার জগতে নারী হয়রানিকারীদের দিন। সাইবার স্পেস যেন নারীদের জন্য নিরাপদ হয়, তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ পুলিশ ২০২০ সালের ১৬ নভেম্বর চালু করেছে ‘পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন’ নামের একটি সেবা। ওইদিন রাজারবাগের বাংলাদেশ পুলিশ অডিটোরিয়ামে এই সেবার উদ্বোধন করেন ইন্সপেক্টর জেনারেল অব পুলিশ (আইজিপি) ড. বেনজীর আহমেদ। তিনি তার উদ্বোধনী বক্তৃতায় এই সেবা চালুর উদ্দেশ্য পরিষ্কার করে বলেন, সাইবার হয়রানির শিকার নারীরা যেন ভয়-ভীতির ঊর্ধ্বে উঠে নির্দ্বিধায় অভিযোগ করতে পারেন, সেজন্য আমরা এই ইউনিট চালু করছি। আমরা এই ইউনিটকে বলছি অল-উইমেন ইউনিট, কারণ এখানে কাজ করা ও সেবাদানকারীদের সবাই নারী।
বাংলাদেশের নারীরা যত ধরনের সাইবার অপরাধের শিকার হন, তার প্রতিটি ব্যাপারে এই সেবার আওতায় অভিযোগ জানানো যাবে। এই ইউনিটের দেয়া তথ্যমতে, যেসব বিষয়ে দ্রæততম সময়ের মধ্যে ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলা হচ্ছে, তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ইন্টারনেটে ব্যক্তিগত ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে দেয়া, কিংবা ছড়িয়ে দেয়ার হুমকি, ফেসবুক বা অন্য কোনো সোশ্যাল মিডিয়ার আইডি হ্যাক, পর্নোগ্রাফিক কন্টেন্ট ছড়ানো, ব্যাকমেইলিং, ছবি বা ভিডিও এডিট করে ছড়িয়ে দেয়া, ফেক আইডি তৈরি, হয়রানিমূলক অশ্লীল এসএমএস, মেইল বা লিংক পাঠানো, মোবাইলের মাধ্যমে সাইবার বুলিং প্রভৃতি।
পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন মূলত একটি ফেসবুক পেজভিত্তিক সেবা। পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স পরিচালিত চড়ষরপব ঈুনবৎ ঝঁঢ়ঢ়ড়ৎঃ ভড়ৎ ডড়সবহ (চঈঝড) ফেসবুক পেজে ম্যাসেজ দিয়ে সংঘটিত অপরাধের বিস্তারিত জানাতে হবে। দায়িত্বরত নারী পুলিশকর্মীরা দ্রততম সময়ে সাড়া দিয়ে ঘটনার সত্যতা যাচাই করে দেখবেন এবং তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা নেবেন। এক্ষেত্রে তারা মূলত দুটি কাজ করছেনÑভিকটিমকে বিভিন্ন ধরনের কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে মানসিকভাবে সুস্থ রাখছেন, অন্যদিকে প্রযুক্তি ব্যবহার করে হয়রানিকারী বা অপরাধীকে শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনছেন। কিছু কিছু ক্ষেত্রে ভিকটিমকে নিকটস্থ থানায় গিয়ে আইনি প্রক্রিয়া অবলম্বন করতে হচ্ছে। সেক্ষেত্রেও পরিপূর্ণ সহায়তা করছে পুলিশের এই নারী সেবা ইউনিট। ম্যাসেজ ছাড়াও পুনবৎংঁঢ়ঢ়ড়ৎঃ.ড়িসবহÑঢ়ড়ষরপব.মড়া.নফ ঠিকানায় ইমেইল করে কিংবা পুলিশ সদর দপ্তরের ০১৩২০০০০৮৮৮ নম্বরে ফোন করেও অভিযোগ জানানো যাবে। তবে অভিযোগ যেভাবেই জানানো হোক না কেন, ভিকটিমের পরিচয় বা তথ্য সম্পূর্ণ গোপন রেখে প্রয়োজনীয় সেবা দিচ্ছে ইউনিটটি।
যাত্রা শুরুর পর থেকে ভিকটিম নারীদের অভাবনীয় সাড়া পাচ্ছে ‘পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন’ ইউনিট। মাত্র দু’সপ্তাহে এই পেজের ফলোয়ার ৭৫ হাজার ছাড়িয়েছে। বিভিন্ন ধরনের অভিযোগ নিয়ে যোগাযোগ করেছেন তিন হাজার ৫৬৫ জন, যার মধ্যে ৯৪৬ জনকে প্রয়োজনীয় সেবা দেয়া হয়েছে, ৮৮৭ জনের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য বা ডকুমেন্টস চাওয়া হয়েছে, অবশিষ্ট এক হাজার ৭৩২ জনের সঙ্গে কথা বলার পর স্ক্রিনিং প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন সূত্রে জানা গেছে, ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত প্রাপ্ত অভিযোগের মধ্যে মিথ্যা আইডি বা বেনামে আইডি খুলে ভিকটিমের ছবি, ভিডিও বা তথ্য প্রচারসংশ্লিষ্ট অভিযোগ ৮১৯টি (২৩ শতাংশ), বিভিন্ন লিংক বা অ্যাপস ব্যবহার করে পাসওয়ার্ড চুরির মাধ্যমে আইডি হ্যাকের অভিযোগ ৫৪৩টি (১৫ শতাংশ), পূর্বপরিচয় বা সম্পর্কের জের ধরে বা অন্য কোনোভাবে প্রাপ্ত ছবি, ভিডিও বা তথ্য ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেয়ার ভয় দেখিয়ে কোনো অনৈতিক সুবিধা বা টাকা দাবি করার ঘটনা ৩২২টি (৯ শতাংশ), মোবাইল ফোনের মাধ্যমে বুলিংয়ের অভিযোগ ৩৩৮টি (৯ দশমিক পাঁচ শতাংশ), বিভিন্ন মাধ্যমে অশ্লীল এসএমএস, ছবি, ভিডিও বা অশ্লীল কনটেন্টের লিংক পাঠিয়ে হয়রানি ৩১০টি (আট দশমিক সাত শতাংশ) এবং অন্যান্য অভিযোগ ২৭২টি (আট শতাংশ)। এছাড়া অনেক নারী ও পুরুষ নন-সাইবার অপরাধের কথা জানিয়েও এই ইউনিটের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। তাদের প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে নিকটস্থ থানা বা সংশ্লিষ্ট আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেয়া হচ্ছে।
‘নারীর জন্য নিরাপদ সাইবার স্পেস’ এই মূলমন্ত্রকে সামনে রেখে পুলিশের এই সেবাটি চালু হয়েছে। যে কোনো ধরনের সাইবার অপরাধের শিকার হয়েছেন, এমনটা বোঝার সঙ্গে সঙ্গেই ভীত বা লজ্জিত না হয়ে ‘পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন’ ইউনিটে অভিযোগ করার কথা বলছেন এখানকার সেবাদানকারীরা। একইসঙ্গে তারা কিছু বিষয়ে সতর্ক ও সচেতন হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। যেমনÑব্যক্তিগত বা স্পর্শকাতর কোনো ছবি, ভিডিও বা তথ্য সাইবার স্পেসের মাধ্যমে আদান-প্রদান না করা, এমনকি যার সঙ্গে আদান-প্রদান করা হচ্ছে, তিনি বিশ্বস্ত হলেও তা প্রদান করতে নিরুৎসাতিহ করা হচ্ছে। এতে প্রযুক্তিগত সমস্যায় নিরাপত্তা ক্ষুণœ হতে পারে। দ্বিতীয়ত, কোনোভাবেই একান্ত ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও কাউকে না দেয়া, কিংবা এ ধরনের ভিডিও ধারণ করতে অনুমতি না দেয়া আবশ্যক। কারণ আজকে হয়তো সে আপনার সবচেয়ে কাছের মানুষ, কিন্তু সময়ের সঙ্গে এই সুন্দর সম্পর্ক একই রকম নাও থাকতে পারে, কিংবা আপনার বা তার আইডি হ্যাক হতে পারে। তৃতীয়ত, ডিভাইস, ই-মেইল ও সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্টের নিরাপত্তা ফিচারগুলো জোরদার করাÑশক্তিশালী পাসওয়ার্ড ব্যবহার ও নিয়মিত তা পরিবর্তন, টু ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন চালু, ইনবক্সে বা ই-মেইলে কোনো লিংক পাঠানো না হলে নিশ্চিত না হয়ে ক্লিক না করা প্রভৃতি।
বাংলাদেশে পুরুষদের পাশাপাশি নারীরা যেমন সব ক্ষেত্রে এগিয়ে যাচ্ছে, তেমনি সাইবার জগতে নিরাপদে বিচরণ করার অধিকার রয়েছে নারীদের। সাইবার ক্রিমিনালরা নানা ধরনের হয়রানিমূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে নারীদের সেই অধিকারকে ক্ষুণœ করে আসছিল, কিন্তু সেদিন তো আর নেই। সাইবার স্পেসে নারীদের হয়রানি করে সহজে পার পাওয়া যাবে না। সরকার সবসময় পাশে আছে নারীদের।

পিআইডি নিবন্ধ