রাশেদ রুবেল : কোটি টাকার ঘুস বাণিজ্য, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগে ঢাকা কাস্টমসের সাবেক কমিশনার মুহাম্মদ জাকির হোসেনের বিরুদ্ধে তদন্ত করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। প্রায় এক বছর হলেও এখনো দুর্নীতির তদন্ত শেষ হয়নি বলে জানা গেছে। দুদকের দাবি, তদন্ত চলমান রয়েছে। তদন্ত শেষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে তার আগেই জাকির হোসেনকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সিন্ডিকেটের মাধ্যমে নিরীক্ষা, গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর, মূল্য সংযোজন কর ঢাকার মহাপরিচালক পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। অনিয়মের তদন্ত চলমান একজন কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেওয়ায় জনমনে প্রশ্ন উঠেছে।
অভিযোগ রয়েছে, পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তাদের আস্থাভাজন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর্মকর্তা জাকির ছিলেন ক্ষমতার শীর্ষে। অভিযোগ রয়েছে, সেই সময় এনবিআরের চেয়ারম্যান নজিবুর রহমানকে হাত করে ভ্যাট অনলাইন প্রকল্পে দায়িত্ব পেয়েছেন তিনি। প্রায় ২ হাজার ৬০০ কোটি টাকার ভ্যাট অনলাইন প্রকল্পে ব্যাপক নয়-ছয় করে কামিয়েছেন দুহাত ভরে। এ ছাড়া তার স্ত্রী নাছরিন আকতারের নামে একাধিক বন্ড লাইসন্সের মাধ্যমে অবৈধ ব্যবসার অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, জাকির হোসেন নামে-বেনামে প্রতিষ্ঠান খুলে ভ্যাট অনলাইন প্রকল্পের কার্যাদেশ কবজা করে তিনি আয় করেছেন শতকোটি টাকার বেশি। তবে আওয়ামী লীগ সরকারের ক্ষমতার দাপটে তার বিরুদ্ধে কেউ কিছু বলার সাহস করেনি। ওই প্রকল্পে ব্যাপক নয়-ছয়ের কারণে সবার কাছে তিনি ‘ভ্যাট জাকির’ নামে পরিচিত।
জানা যায়, ঘুস বাণিজ্যসহ ভ্যাট অনলাইন প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ তদন্ত করছে দুদক। কাজ পাইয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে তৎকালীন প্রকল্প পরিচালক মুহম্মদ জাকির হোসেনের সম্পৃক্ততা খতিয়ে দেখতে অনেক বেগ পেতে হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে তদন্তকারী সংস্থার।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে দুদকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, জাকির তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের তদন্তে কোনো সহায়তা করছেন না।
এদিকে দুদকের কাছে বিসমিল্লাহ প্যাকেজিংয়ের সত্বাধিকারী এ আর সানি স্বাক্ষরিত অভিযোগে বলা হয়, সাবেক ঢাকা কাস্টমস কমিশনার ভ্যাট প্রকল্পের দায়িত্বে থাকার সময় নিজ শ্যালকের নামে শীততাপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের (এসি) কার্যাদেশ দিয়ে সরকারি অর্থলোপাট করেছেন জাকির। অভিযোগে বলা হয়, ৪০ হাজার টাকা দামের মিডিয়া ব্র্যান্ডের এসি ১ লাখ ৩০ হাজার টাকায় টেন্ডার দিয়ে লুটপাট করেছেন। জাকিরের স্ত্রী সম্পৃক্ত থাকা ধ্রুপদী টেকনো কনস্ট্রাকশন লিমিটেডকে ভ্যাট অনলাইন প্রকল্পের দায়িত্ব দেওয়ার গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।
গত বছরের ৮ জানুয়ারি দুদকে জমা দেওয়া ওই অভিযোগে বলা হয়, মুহাম্মদ জাকির হোসেন বিদেশ ভ্রমণের নামে সিনিয়রদের প্রমোদ ভ্রমণে সরকারি লোনের টাকা খরচ করে তাদের মনোরঞ্জন করতেন। অবৈধ টাকা সাদা করার জন্য নিজের লেখা ‘বাংলাদেশের নতুন ভ্যাট’ শিরোনামে একটি বই বিক্রির অর্থকে দেখানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।
দুদকের কাছে অভিযোগে আরও বলা হয়, বেনাপোল কাস্টম হাউসে ফেব্রিক্স চালানের জালিয়াতি থেকে শুরু করে চট্টগ্রাম ভ্যাটে অডিট প্রতিষ্ঠান অন্তর্ভুক্তিতে ভয় দেখানো-সবই করেছেন এই কাস্টমস কর্মকর্তা। মুহাম্মদ জাকির হোসেনের স্ত্রীর নামে একাধিক বন্ড প্রতিষ্ঠানও রয়েছে। যশোর ভ্যাট কমিশনার থাকাকালে তার স্ত্রী নাসরিন আকতার স্বর্ণবারসহ চোরাচালানে গোয়েন্দা সংস্থার হাতে ঢাকা বিমানবন্দরের অভ্যন্তরীণ আগমন হলে আটকের বিষয়টি খতিয়ে দেখার দাবি করেন তিনি।
অভিযোগ রয়েছে, পারটেক্স গ্রুপের ভ্যাট নথিতে সুবিধার বিনিময়ে বনানী ক্লাবের সদস্যপদ দিতে বাধ্য করা হয়। তবে ২০২২ সালে বনানী ক্লাবের সদস্যপদ নেওয়ার ৩০ লাখ টাকা জমা দেওয়ার অর্থ ২০২৩-২৪ করবর্ষে প্রদর্শন করেননি সাবেক ঢাকা কাস্টমস কমিশনার জাকির। ঘুস বাণিজ্যসহ একাধিক অভিযোগে দুদকে তলব করা হলে জাকির হোসেন গত ২২ মে দুদকে হাজিরা দিয়েছেন। তবে এরপর আর তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি। জাকিরের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের তদন্ত করছেন দুদকের সহকারি পরিচালক আবু বক্কর সিদ্দিক।
এমন অভিযোগে কোনো সাংবাদিক সংবাদ করতে গেলে জাকিরের সন্ত্রাসী বাহিনী তাদের হত্যার হুমকি-ধামকি দিয়ে নিউজ বন্ধ করার পাশাপাশি ক্ষমতার অপব্যবহার করে সাংবাদিককে চাকরিচ্যুত করার হুশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
এসব অভিযোগে মুহাম্মদ জাকির হোসেনের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি অস্বীকৃতি জানান।
আইন ও জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, অপরাধ প্রমাণিত হলে তাকে আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তি দেয়া উচিত। ভ্যাট অনলাইন প্রকল্পের মতো গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগের ব্যর্থতা শুধু আর্থিক ক্ষতির কারণ নয়; বরং এটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি জনগণের আস্থা ক্ষুণ্ন করে। তাই এ ধরনের দুর্নীতির ঘটনায় উদাহরণমূলক ব্যবস্থাগ্রহণ জরুরি, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের কর্মকাণ্ড রোধ করা সম্ভব হয়।
এ বিষয়ে দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. আকতারুল ইসলাম শেয়ার বিজকে জানান, ঢাকা কাস্টমসের সাবেক কমিশনার মুহাম্মদ জাকির হোসেনের বিরুদ্ধে একটি অভিযোগের তদন্ত করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তদন্ত শেষে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
দুদকের তদন্ত ও সুশাসন নিয়ে প্রশ্নে সিপিডির সিনিয়র রিসার্চ ফেলো তৌফিকুল ইসলাম খান শেয়ার বিজকে বলেন, দুর্নীতি বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে। এর ফলে দুর্নীতিবাজদের আমাদের সমাজের প্রতিটি স্তরে তাদের কালোটাকার জন্য তোয়াজ করে। দুদক ব্যবস্থা নিলেও অন্য সংস্থাগুলো তাদেরকে সহায়তা করে। তাই দুদকের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন সমাজের দুর্নীতি প্রতিরোধে মুখ্য ভূমিকা পালন করতে পারে।
উল্লেখ্য, ছাত্র-জনতার তীব্র আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর চট্টগ্রামের কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট থেকে বদলি হয়ে ঢাকায় আসেন মুহম্মদ জাকির হোসেন। বর্তমানে তিনি নিরীক্ষা, গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর, মূল্য সংযোজন কর ঢাকার মহাপরিচালক পদে আছেন।
প্রিন্ট করুন











Discussion about this post