অন্তঃসারশূন্য অ্যাসাইনমেন্ট পদ্ধতি

বিশ্বব্যাপী চলমান কভিভ-১৯ পরিস্থিতিতে করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধে দীর্ঘ ১৮ মাস ধরে বন্ধ রয়েছে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। সংক্রমণ ও শনাক্তকরণের হার বিবেচনায় নিয়ে দেশের অন্যান্য সব ক্ষেত্রগুলো ক্রমান্বয়ে সীমিত বা সম্পূর্ণ পরিসরে সচল করা হলেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে পূর্বাবস্থায়ই বহাল রয়েছে।

অন্যদিকে চলমান পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের সম্পূর্ণভাবে পড়াশোনা থেকে বিচ্ছিন্ন না রাখা এবং পরবর্তী শ্রেণিতে উত্তীর্ণ করার তাগিদে পরিচালিত হচ্ছে অ্যাসাইনমেন্ট নির্ভর মূল্যায়ন কার্যক্রম।

সম্পূর্ণভাবে পড়াশোনা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে অটোপাসের মাধ্যমে পরবর্তী শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হওয়ার চেয়েও গৃহীত এই পদক্ষেপটি নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী ও প্রশংসনীয়। উল্লেখ্য, অ্যাসাইনমেন্ট কার্যক্রম আমাদের দেশের উচ্চশিক্ষার স্বীকৃত একাডেমিক বিষয় হলেও স্কুল-কলেজে এই কার্যক্রম সম্পূর্ণ নতুন।

সরকারি নির্দেশনায় পরিচালিত এরূপ মূল্যায়নের উদ্দেশ্য হচ্ছে, অ্যাসাইনমেন্ট থেকে অর্জিত শিখনফলের সবলতা বা দুর্বলতা  নিরূপণের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা। কিন্তু এ বিষয় নিয়ে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে পরিলক্ষিত হচ্ছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। কেউ একে আপদকালীন সর্বোত্তম উপায় বলে মেনে নিলেও কেউবা একে অটোপাসের নামান্তর বলেই বিবেচনা করছেন। তাছাড়া বিনা প্রস্তুতিতে সরবরাহকৃত উত্তরপত্র অনুকরণে লিখিত এসব অ্যাসাইমেন্ট মেধা যাচাইয়ের মানদণ্ড হিসেবে কতটা যথার্থ, তা নিয়েও রয়েছে নানা মতবিরোধ।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক প্রফেসর ড. সৈয়দ গোলাম ফারুক স্বাক্ষরিত, গত ৩১ অক্টোবর দেশের প্রতিটি বিদ্যালয়ে প্রেরিত অ্যাসাইনমেন্ট-সংক্রান্ত এক চিঠিতে ওই পদ্ধতিটি ৪টি ক্যাটাগরিতে (অতি উত্তম, উত্তম, ভালো ও অগ্রগতি প্রয়োজন) মূল্যায়নের কথা উল্লেখ আছে। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হচ্ছে মুখস্থ নির্ভরতা ও পরীক্ষা ভীতি কাটিয়ে সূক্ষ্ম ও সৃজনশীল চিন্তার ক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে গৃহীত এ পদক্ষেপটির কার্যকারিতা অনেকাংশেই প্রশ্নবিদ্ধ। যার অন্যতম কারণ হচ্ছে শিক্ষকদের অসচেতনতা, অ্যাসাইনমেন্ট মূল্যায়নে উদাসীনতা, নতুন পদ্ধতি সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের অজ্ঞতা এবং বিভিন্ন ইউটিউব চ্যানেলগুলোতে সরকার প্রদত্ত অ্যাসাইনমেন্ট সমাধানের সহজলভ্যতা। এতে করে শিক্ষার্থীরা তাদের পাঠ্যপুস্তক সম্পূর্ণ অধরা রেখেই বিভিন্ন ইউটিউব ভিডিওতে সরবরাহকৃত সমাধান কপি করার সুযোগ পাচ্ছে। এছাড়া অনেক শিক্ষার্থীই অ্যাসাইনমেন্ট সম্পন্ন করার জন্য বিভিন্ন ব্যক্তির শরণাপন্ন হচ্ছে, কেউবা টাকার বিনিময়ে অন্যকে দিয়েও অ্যাসাইনমেন্ট করিয়ে নিচ্ছে। এভাবে শিক্ষার্থীরা অ্যাসাইনমেন্ট  পদ্ধতির কতটা সুফল পাচ্ছে তা সম্পূর্ণই অনিশ্চিত। তাছাড়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, কম্পিউটারের দোকান কিংবা ইউটিউব চ্যানেলে সরবরাহকৃত এসব উত্তরপত্র শিক্ষার্থীদের পাঠ্যবই পর্যালোচনা করে লেখার সুফল থেকে বঞ্চিত করার পাশাপাশি সৃজনশীলতার বিকাশ ব্যাহত করছে। ফলে সাপ্তাহিক এসব অ্যাসাইনমেন্ট সম্পন্ন করেও শিক্ষার্থীরা প্রকৃতপক্ষে কোনো সুফল পাচ্ছে না।

তাই এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের কঠোর হতে হবে। গতানুগতিক পরীক্ষার বিকল্প পদ্ধতি হিসেবে অ্যাসাইনমেন্ট মূল্যায়নে শিক্ষকদের আরও বেশি যত্নশীল ও সচেতন হওয়া জরুরি। আর এরই লক্ষ্যে নিন্মোক্ত বিষয়গুলোকে প্রাধান্য দিতে হবে। যথা

ক. অ্যাসাইনমেন্টের সঙ্গে পাঠ্যপুস্তকের সম্পৃক্ততার বিষয়ে গুরুত্বারোপ করতে হবে; খ. পাঠ্যপুস্তক পর্যালোচনার আলোকে সম্পাদিত অ্যাসাইনমেন্টের সুফল তুলে ধরতে হবে; গ. ইউটিউব ভিডিও দেখে হুবহু সম্পাদিত অ্যাসাইনমেন্ট নিষিদ্ধকরণ করতে হবে; ঘ. শিক্ষার্থীর স্বহস্তে অ্যাসাইনমেন্ট সম্পাদনা নিশ্চিত করতে হবে; ঙ. অনলাইন ক্লাসে অ্যাসাইনমেন্টের জন্য নির্ধারিত টপিকের ওপর সাপ্তাহিকভাবে মৌখিক পরীক্ষার ব্যবস্থা গ্রহণ; চ. এছাড়া এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের অ্যাসাইনমেন্টগুলো তাদের পরীক্ষার প্রস্তুতি সহায়ক হিসেবে  বিশেষ গুরুত্বারোপ করা; ছ. প্রয়োজনে অভিভাবকদের সঙ্গে অনলাইন কনফারেন্সের মাধ্যমে ওই পদ্ধতির গুরুত্ব আলোচনা করতে হবে; জ. অ্যাসাইনমেন্ট পদ্ধতিকে ফলপ্রসূ করে তুলতে শিক্ষকদের সক্রিয়তা ও যথাযথ তদারকির ব্যবস্থা করা।

সর্বোপরি, পাঠ্যপুস্তকের আলোকে শিক্ষার্থীর নিজের মেধা, মনন ও সৃজনশীলতাকে কাজে লাগিয়ে অ্যাসাইনমেন্ট সম্পন্ন করার মাধ্যমে আপদকালীন এ পদ্ধতিটির যথার্থতা ও সুফল নিশ্চিত করা সম্ভব। অন্যথায় পদ্ধতিটি নিছক নিরর্থক ও অন্তঃসারশূন্যতায় পর্যবসিত হবে।

রেহেনুমা সেহেলী কবির

শিক্ষার্থী, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ

বশেমুরবিপ্রবি, গোপালগঞ্জ

সর্বশেষ..