মত-বিশ্লেষণ

অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের অন্যতম শর্ত প্রতিবন্ধীবান্ধব সমাজ

উম্মে ফারুয়া: বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও ২৮তম আন্তর্জাতিক ও ২১তম জাতীয় প্রতিবন্ধী দিবস যথাযোগ্য মর্যাদায় পালন করা হচ্ছে। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে গৃহীত রেজুলেশনের মাধ্যমে ১৯৯২ সালে ৩ ডিসেম্বরকে আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিবন্ধী দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। সেই থেকে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো আমাদের দেশেও দিবসটি উৎসবমুখর পরিবেশে পালন করা হয়। এবারের ২৮তম আন্তর্জাতিক প্রতিবন্ধী দিবসের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে প্রতিবন্ধী ও তাদের নেতৃত্বকে এগিয়ে নিতে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ বাড়াতে ২০৩০ সালের উন্নয়ন অভীষ্টে ব্যবস্থা নেওয়া (Promoting the participation of persons with disabilities and their leadership : taking action on the 2030 Development Agenda)|

উল্লেখ্য, ১৯৯৯ সাল থেকে ৩ ডিসেম্বরকে জাতীয় প্রতিবন্ধী দিবস হিসেবেও একইভাবে পালন করা হয়। অবশ্য সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত অনুসারে আমাদের দেশে এ বছর দিবসটি পালিত হবে ৫ ডিসেম্বর।

সরকার অসহায় পিছিয়ে পড়া মানুষগুলোকে সামনে এগিয়ে নিতে বদ্ধপরিকর। ২০০৮-০৯ অর্থবছরে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জনপ্রতি মাসিক ভাতা ছিল ২৫০ টাকা। বর্তমানে ২০১৯-২০ অর্থবছরে এই ভাতা হয়েছে ৭৫০ টাকা। গত ১০ বছরে এই খাতে মোট তিন হাজার ২৬৭ কোটি টাকা প্রদান করা হয়েছে।

২০১৯-২০ অর্থবছরে এক লাখ প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীর উপবৃত্তির জন্য বাজেট দেওয়া হয়েছে ৯৫ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। ২০০৮-০৯ অর্থবছরের তুলনায় এ খাতে বাজেট বৃদ্ধি করা হয়েছে প্রায় ১৪ গুণ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হলো রাষ্ট্র কর্তৃক সরাসরি ব্যক্তির কাছে (জিটুপি-গর্ভনমেন্ট টু পারসন) ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতে ভাতা দেওয়া। এটি গত বছরের জুলাই থেকে শুরু হয়েছে। ১৬ লাখ বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিকে নির্বাচিত করে তাদের ডেটাবেজ সংরক্ষণ করা এবং শনাক্তকৃত প্রতিবন্ধীদের পরিচয় প্রদান করা হয়েছে সমাজসেবা অধিদপ্তরের মাধ্যমে। অনলাইনে যে কোনো প্রতিবন্ধী বা তার অভিভাবক প্রতিবন্ধী সনদপ্রাপ্তির আবেদন করতে পারছে। চলতি অর্থবছরে ১৫ লাখ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে ভাতা প্রদানের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে এক হাজার ৩৯০ কোটি ৫০ লাখ টাকা।

দেশব্যাপী ১০৩টি প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্র স্থাপন এবং প্রতিটি কেন্দ্রে অটিজম রিসোর্স সেন্টার চালু হয়েছে, যা থেকে বছরে প্রায় চার লাখ প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সরাসরি সেবা পাচ্ছে। প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের চিকিৎসাসেবা প্রদান করা হচ্ছে ৩২টি মোবাইল থেরাপি ভ্যানের মাধ্যমে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে কক্লিয়ার ইমপ্লান্ট সেবা প্রদানের মাধ্যমে মেধাবী গরিব শ্রবণ প্রতিবন্ধী শিশুদের সেবা প্রদান করা হচ্ছে। ২০১০ সাল থেকে ২০১৯ পর্যন্ত মোট ৩৭২ জনকে কক্লিয়ার ইমপ্লান্ট সেবা প্রদান করা হয়েছে।

নির্মিত হয়েছে আটটি সরকারি শিশু পরিবারের হোস্টেল ভবন। দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের জন্য ৩৭টি হোস্টেল নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে এবং তাদের জন্য আরও ৩৭টি হোস্টেলের নির্মাণকাজ চলমান রয়েছে।

অন্যদিকে, প্রতিবন্ধী ক্রীড়াবিদদের উৎসাহিত করতে সাভার থানাধীন বারইগ্রাম ও দক্ষিণ রামচন্দ্রপুর মৌজার ১২ দশমিক শূন্য এক একর খাসজমির ওপর প্রায় ৩০০ কোটি টাকা ব্যয়ে জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মানের প্রতিবন্ধী ক্রীড়া কমপ্লেক্সের নির্মাণ প্রকল্প অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। স্পেশাল অলিম্পিকে প্রতিবন্ধী ক্রীড়াবিদরা বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়েছে। বাংলাদেশের দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ক্রিকেটদল নতুন হলেও আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ভালো অবস্থান সৃষ্টি করেছে। ভারতের কেরালা রাজ্যে ‘টি টোয়েন্টি ব্লাইন্ড ক্রিকেট এশিয়া কাপ’-এ বাংলাদেশ ব্লাইন্ড ক্রিকেট দল তৃতীয় স্থান অধিকার করেছে। রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী তাদের সংবর্ধনা দিয়েছেন এবং পুরস্কার প্রদানের মাধ্যমে উৎসাহ জুগিয়েছেন।

অটিজমসহ সব প্রতিবন্ধী ব্যক্তির উন্নয়নে বেশ কিছু আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। এর মধ্যে ‘প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন ২০১৩’ এবং নিউরো ডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধী সুরক্ষা ট্রাস্ট আইন ২০১৩’ আইন দুটি অন্যতম। এই আইন দুটির মাধ্যমে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার আইন দ্বারা স্বীকৃত হয়েছে। এছাড়া ‘বাংলাদেশ রিহ্যাবিলিটেশন কাউন্সিল আইন ২০১৮’ পাস করা হয়েছে। এই আইনের আওতায় প্রতিবন্ধী ব্যক্তির কিংবা দুর্ঘটনার ফলে পঙ্গুত্ববরণকারী ব্যক্তির চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি পুনর্বাসন প্রক্রিয়া গ্রহণ করা হবে।

সরকার সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি যেমন অসচ্ছল প্রতিবন্ধী ভাতা, প্রতিবন্ধী শিক্ষা উপবৃত্তি এবং প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্রসহ অন্যান্য কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব মতে, বিশ্বের ১৫ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনো ধরনের প্রতিবন্ধিতা সম্পন্ন। বাংলাদেশেও এর চিত্র মোটামুটি অভিন্ন। এ বিপুলসংখ্যক জনগোষ্ঠীকে বাদ দিয়ে মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে স্বীকৃত হওয়া বাংলাদেশের জন্য বেশ কঠিন হবে।

সরকার সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির মাধ্যমে উপকার ভোগী প্রতিবন্ধীর সংখ্যা ও তাদের জন্য অর্থ সহায়তার পরিমাণ বৃদ্ধি করেছে। ২০০৮-০৯ অর্থবছরে যেখানে প্রতিবন্ধী ভাতাভোগীর সংখ্যা ছিল দুই লাখ জন, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে উপকারভোগীর সংখ্যা ১০ লাখ জনে এসে দাঁড়িয়েছে। সংশ্লিষ্ট এ খাতে ২০০৮-০৯ অর্থবছরে বরাদ্দ ছিল ছয় কোটি টাকা (২০১৮-১৯) অর্থবছরে তা হয়েছে ৮৪০ কোটি টাকা।

সাম্প্রতিক বছরগুলোয় দেখা গেছে, প্রতিবন্ধী শিশুর অন্তর্ভুক্তি সাধারণ বিদ্যালয়ে বেশ বেড়েছে। বিশেষ শিক্ষা এবং সমন্বিত শিক্ষা পদ্ধতিতে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিশুদের সংখ্যাও বাড়ছে। একই সঙ্গে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের ব্রেইল বই, অডিও বুকসহ যাবতীয় সহায়ক শিক্ষা উপকরণ বিনামূল্যে বিতরণ করা হচ্ছে। অটিস্টিক ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা আমাদের সমাজেরই অংশ। তাদের বাদ দিয়ে কোনো উন্নয়ন পরিকল্পনা গৃহীত হলে রাষ্ট্রের সামগ্রিক উন্নয়ন হবে না। এই বাস্তবতাকে সুবিবেচনা করে বর্তমান সরকার প্রতিবন্ধিতা ইস্যুটিকে অগ্রাধিকার খাত বিবেচনা করে যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে তাতে করে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা উপকৃত হচ্ছে। পাশাপাশি সরকার প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য বেসরকারি খাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য প্রতি বছর প্রতিবন্ধীদের জন্য চাকরির মেলা আয়োজন করছে। এতে করে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের মধ্যে কর্মচঞ্চলতা এসেছে। সমৃদ্ধ সোনার বাংলা গড়তে হলে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করে সবাই মিলে কাজ করতে হবে। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা থাকলে বাংলাদেশ ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশ ও ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারবে।

পিআইডি নিবন্ধ

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..