প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি ও অর্থায়নে অবিচল থাকার পরামর্শ

নিজস্ব প্রতিবেদক : ‘দিন যতই যাচ্ছে, ততই পরিবর্তিত পৃথিবীর অর্থনীতিতে জটিল সব রূপান্তর ঘটছে। এর ফলে আমাদের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতেও নানা সামাজিক এবং আর্থিক টানাপড়েন এখন দৃশ্যমান।  অবশ্য এ সবকিছু নিয়ন্ত্রণে রেখে সামনে এগিয়ে যাওয়া কঠিন কিছু নয়। এ ক্ষেত্রে অবশ্যই আমাদের অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি ও অর্থায়নের প্রশ্নে অবিচল থাকতে হবে।’

গতকাল সোমবার নয়াদিল্লিতে বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন, ইউএস এইড, অস্ট্রেলিয়ান হাইকমিশন এবং কাট্স ইন্টারন্যাশনালের প্রতিনিধির সঙ্গে এক বৈঠকে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান এসব কথা বলেন।

বৈঠকের শুরুতেই তিনি বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যংকের উন্নয়নমুখী ভূমিকা, বিশেষ করে অধিকসংখ্যক মানুষের কাছে আর্থিক সেবা পৌঁছে দেওয়ার প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘বহুমাত্রিক রূপান্তরের কারণে সমাজকে ঐক্যবদ্ধ রেখে সবার উন্নয়ন নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকও যে সহযোগী ভূমিকা পালন করতে পারে, বিগত সাত-আট বছরে বাংলাদেশে তা লক্ষ্য করা গেছে। শুধু তাই নয়, ব্যক্তি ও সরকারি খাতের ভেতর সমন্বয় করে, নিজে সাফল্যের উদাহরণ সৃষ্টি করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সৃজনশীল মুদ্রানীতির মাধ্যমে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির এজেন্ডাকে মূলধারায় নিয়ে আসার ফলপ্রসূ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। দেশে-বিদেশে এই নতুন ধারার কেন্দ্রীয় ব্যাংকিং প্রশংসিতও হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘মুদ্রানীতির মূল কাজ হলো মূল্য স্থিতিশীল রাখা। পাশাপাশি উৎপাদন বৃদ্ধিকে সহায়তা দিয়ে বাড়তি কর্মসংস্থান তার অন্যতম আরেকটি কাজ। এসবের বাইরে গিয়েও বাংলাদেশ ব্যাংক বিগত বছরগুলোয় অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নকে এগিয়ে নেওয়ার অংশ হিসেবে সবার জন্য অর্থায়ন, সবুজ অর্থায়ন এবং সামাজিক দায়িত্ববোধের নানা উদ্যোগ সফলভাবে বাস্তবায়ন করেছে—যা বিশ্বব্যাপী সমাদৃত।’

এ সময় সবুজ অর্থায়নে একটি নীতিমালা চালুর কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘২০০ কোটি টাকার একটি পুনঃঅর্থায়ন কর্মসূচি চালু করেছিলাম। এ কর্মসূচিটি ভালোভাবেই বাস্তবায়ন করে চলেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বস্ত্র ও চামড়া খাতের জন্য আরও একটু দীর্ঘমেয়াদি দুটি ঋণ কর্মসূচি অনুমোদন দিয়ে এসেছিলাম।’

তিনি আরও বলেন, ‘পুরো আর্থিক খাত ছাড়াও সমাজ ও অর্থনীতির মূলধারায় সামাজিক দায়বদ্ধ অর্থায়নের গুরুত্ব বোঝানো সহজ হয়েছে। এর ফলে আর্থিক খাতকে আরও মানবিক ও সর্বসাধারণের উপযোগী করার জন্য ব্যাংকারদের মনের পরিবর্তনও ঘটানো সম্ভব হয়েছে। ফলে যে সমাজের অর্থ দিয়ে ব্যাংকগুলোর ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালিত হয়, সেই সমাজের জন্য অবদান রাখার এই মানসিক রূপান্তর দীর্ঘ  মেয়াদে উন্নয়নের গুণগত মানোন্নয়নেও অবদান রেখে চলেছে। ব্যাংকিং সেক্টরে নিঃসন্দেহে এটি একটি বড় ধরনের পরিবর্তন। যার সুফল ইতোমধ্যেই সেবাবঞ্চিতদের কাছে যাচ্ছে।’

সামাজিক সংহতি বৃদ্ধি এবং বর্তমান সার্বিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতার লক্ষণ হিসেবে তিনি বলেন, আর্থিক অন্তর্ভুক্তির ঢেউ সরকারের বাজেট ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় প্রভাব রাখছে। পরিকল্পনা দলিলগুলোতে এই প্রভাব বেশ স্পষ্ট। বিশ্বব্যাপী টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা প্রণয়নের সময়ও বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অন্তর্ভুক্তি টেকসই উন্নয়নধর্মী নীতিমালার কথা অনেকেই মাথায় রেখেছেন।’

তিনি বলেন, ‘আমার সময়কালে কৃষিঋণ, বিশেষ করে বর্গাচাষিদের জন্য বিশেষ ঋণ, ক্ষুদ্র ঋণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অংশীদারিত্ব বাড়িয়ে দুর্গম গ্রামীণ পরিবারকে ব্যাংক ঋণ পৌঁছে দেওয়া, ১০ টাকা জমা নিয়ে দেড় কোটিরও বেশি হিসাব খোলা, সহজ রেগুলেশনের মাধ্যমে ব্যাংক পরিচালিত বাজারবান্ধব মোবাইল ব্যাংকিং চালু করে গরিব-দুঃখীকে আর্থিক সেবা প্রদান, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (বিশেষ করে নারী উদ্যোক্তা) জন্য ঋণের সুযোগ সৃষ্টি করা, তরুণ প্রজন্মকে আউটসোর্সিং ও ই-কমার্সের সঙ্গে যুক্ত করা, রফতানিকারকদের বিদেশি মুদ্রায় স্বল্প খরচের ঋণের ব্যবস্থা করা এবং ঋণ ও আর্থিক সেবা গ্রহণে বাধা-বিপত্তি দূর করার জন্য গ্রাহকস্বার্থ সংরক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন (হটলাইনসহ) এবং মানবসম্পদ প্রশিক্ষণে মানবিকতার অবগাহনের মতো যুগান্তকারী ও সৃজনশীল নানা উদ্যোগ নেওয়ার ফলে বাংলাদেশের আর্থিক খাত এক নবরূপে আবির্ভূত হয়েছে।’

ড. আতিউর বলেন, ‘নতুন ধারার কেন্দ্রীয় ব্যাংকিং ও আর্থিক সেবার সুফল হচ্ছে দারিদ্র্য নিরসন, স্থিতিশীল জিডিপি প্রবৃদ্ধি, স্থিতিশীল মূল্য পরিস্থিতি, সাধারণ মানুষের সন্তানদের শিক্ষা সহায়তা লাভের মতো সাফল্যের সূচক অবয়ব সবাই অনুভব করতে পারছেন। আমাদের দেশে একদিকে প্রবৃদ্ধি বাড়ছে, অন্যদিকে বৈষম্য সে হারে বাড়ছে না। এই দুই কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতি আজ বিশ্বব্যাংক, এডিবিসহ অনেকেরই দৃষ্টি কাড়তে সক্ষম হচ্ছে।’

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রেখেই বৃহত্তর সমাজ ও পরিবেশের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থায়নের কাজ এগিয়ে নিতে হবে বলেও বক্তব্যে উল্লেখ করেন তিনি।

উল্লেখ্য, গত কয়েক মাসে বিশ্বের নানা প্রান্তে বাংলাদেশের উন্নয়নসহায়ক কেন্দ্রীয় ব্যাংকিংয়ের নানা দিক নিয়ে ধারাবাহিকভাবে বক্তব্য দিচ্ছেন আতিউর রহমান। বর্তমানে ভারতে বড় মূল্যের নোট বাতিলের পরিপ্রেক্ষিতে ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংকিংয়ের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা যখন তুঙ্গে, সে প্রেক্ষাপটে গতকাল তার এই বক্তৃতা সবার মাঝে আগ্রহ সৃষ্টি করেছে।