অরণ্য আজাদ : রাজধানীর গুলিস্তান এলাকার গুলিস্তান শপিং কমপ্লেক্স, হল মার্কেট এবং মতিঝিল এলাকার বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে প্রতিদিন জমে উঠে ছেঁড়া এবং নতুন টাকা কেনা-বেচার বাজার। প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যার পর পর্যন্ত টাকা কেনা-বেচার এসব দোকানগুলো খোলা থাকে। রাস্তায় কিংবা ফুটপাতে ছোট ছোট টেবিল বসিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে ছেঁড়া টাকা কেনা এবং নতুন টাকা বেচার এসব দোকান। অনেকেই এ দোকানগুলোয় আসেন টাকা ভাংতি কিংবা বদল করতে। এছাড়া চিহ্নিত ছিনতাইকারী চক্রও ছিনতাই করা টাকা নিয়ে এসব দোকানে কেনা-বেচা করেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছে। গুলিস্তান শপিং কমপ্লেক্সের সামনে সারিবদ্ধভাবে বসানো হয়েছে কেনা-বেচার ২০ থেকে ৩০টি দোকান। এই ব্যবসা দিয়ে ঘর-সংসার চলে সবার। দুই টাকা থেকে শুরু করে ১০০ টাকা পর্যন্ত সবধরনের নোটের নতুন বান্ডেল পাওয়া যাচ্ছে গুলিস্তানের এই ‘টাকাওয়ালাদের’ কাছে। এছাড়া মতিঝিলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনের ফুটপাত এবং তার কাছাকাছি এলাকায় বসানো রয়েছে আরও ৩০ থেকে ৪০টি দোকান। সরেজমিনে গতকাল রাজধানীর গুলিস্তান ঘুরে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
এসব দোকানিদের সঙ্গে কথা বলে চমকপ্রদ তথ্য পাওয়া গেছে। তারা জানান, এ অঞ্চলে বেশকিছু ছিনতাইকারী সক্রিয় রয়েছে। যারা বিভিন্ন সময় ছিনিয়ে নিতে গিয়ে টাকা ছিঁড়ে ফেলে। পরে ছেঁড়া টাকা নিয়ে অনেকেই আসে টাকা বদল করতে।
গুলিস্তান শপিং কমপ্লেক্সের সামনের দোকানি ফয়সাল বলেন, তিনি দুই বছর ধরে এ দোকান দিয়ে বসেছেন। এর আগে তিনি অন্যের দোকানে কাজ করতেন এবং প্রায় ৫ বছর তিনি এ ব্যবসায় জড়িত রয়েছেন।
ফয়সাল জানান, পুরাতন টাকা নিয়ে নতুন টাকা পরিবর্তন করতে ১০০ টাকায় ৩ থেকে ৫ টাকা রাখেন। ছেঁড়া টাকা কেনা হয় নোটের এবং ছেঁড়ার ধরন দেখে। সাধারণত ৫০০ টাকায় ২৫ থেকে ৩০ টাকা করে রাখেন তারা।
ফয়সাল জানান, আমরা ছেঁড়া টাকা জমিয়ে রাখি। এ টাকাগুলো তারা জমা দেন বাংলাদেশ ব্যাংকে। আবার কোনো কোনো সময় ব্যাংকের লোকজনদের ১ থেকে ২ শতাংশ লাভ দিয়েও তারা ব্যাংক সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছে বিক্রি করে দিই এসব ছেঁড়া টাকা।
অপর এক দোকানি সাদ্দাম হোসেন বলেন, ছেড়া টাকায় শতকরা ১০ থেকে ২০ টাকা কমিশন নিয়ে থাকেন তারা। আর নতুন টাকা বিক্রির ক্ষেত্রে শতকরা ২ টাকা করে নেয়া হয়।
ব্যবসায়ীরা জানান, ছেঁড়া টাকা নিয়ে অনেকেই বেকায়দায় পড়েন। যারা এই ছেঁড়া টাকা চালাতে পারে না তাদের কাছ থেকে টাকার নির্ধারিত দামের চেয়ে কম মূল্যে নোটগুলো কিনে নেন। এছাড়া নতুন নোটের বান্ডেলও তারা বিক্রি করেন। এক্ষেত্রে ১০০ টাকা একটি বান্ডেলে বাড়তি ১০০ টাকা। ২০ টাকার ১০০টি নতুন নোট নিতে ৮০ থেকে ১০০ টাকা, ৫০ টাকার ১০০টি নতুন নোট নিতে ১০০ টাকা, ১০০ টাকার ১০০টি নতুন নোট বিক্রি হয় ৭০ থেকে ৮০ টাকা বেশিতে।
ব্যবসায়ী জানান, প্রতিদিন দুইশ থেকে এক হাজার টাকা পর্যন্ত আয় হয়। কখনও কখনও আবার মোটেও হয় না। তবে কোনো কাস্টমার আসলে তাকে কেউ ফিরে যেতে দেন না। খুব কম লাভ হলেও টাকার নোট বিক্রি করেন তারা।
ব্যবসায়ীরা আরও জানান, উৎসব মৌসুমে তাদের টাকা বেচা-বিক্রির ব্যবসা জমে ওঠে। বিশেষ করে দুই ঈদে এর চাহিদা থাকে বেশি। সে সময় একজন ব্যবসায়ী টাকা বিক্রি করে কমপক্ষে এক লাখ টাকা আয় করেন। বছরের অন্যসব দিনে যে টাকা আয় হয় তার অর্ধেক আয় হয় দুই ঈদের সময়ে।
তবে সম্প্রতি সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে ফুটপাতে হকার বসার বিষয়ে কড়াকড়ির কারণে পথে বসার উপক্রম হয়ে পড়েছে এই টাকা ব্যবসায়ীদের। একটু ফাঁকা পেলে বসলেই পুলিশ ও সিটি করপোরেশনের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা স্বেচ্ছাসেবকরা তাড়া ?করেন। তখন টাকায় ব্যাগ নিয়ে পালাতে হয় তাদের। মাঝে মধ্যে দেখা দেয় ছিনতাই চক্র। তারা হঠাৎ করেই টাকার বান্ডেল নিয়ে দৌড় দেয়।
দীর্ঘ ১৩ বছর ধরে রাজধানীর গুলিস্তানের পাতাল মার্কেটের সামনে টাকার ব্যবসা করেন নোয়াখালীর সোনাইমুড়ি উপজেলার নুর হোসেন। তিনি জানান, প্রতিদিন ৫ থেকে ১০ হাজার টাকার নতুন বান্ডেল নিয়ে আসেন। কোনো সময় সব টাকাই বিক্রি হয়ে যায়। আবার কখনও হয় না। গড়ে ৭০০ থেকে ৮০০ টাকার মতো থাকে। এ দিয়েই তিন সদস্যের সংসার চলে যায়। তিনি জানান, প্রতিদিন যে আয় হয় তার থেকে আবার ২০০ টাকা লাইনম্যানকে দিতে হয়। তারা পুলিশ ও ফুটপাতের জায়গা বিক্রি করে এ টাকা নেয়। টাকা না দিলে ফুটপাতে বসতে দেয়া হয় না।
টাকা বদলের একজন ক্রেতা মোহাম্মদ লিটু জানান, তিনি ছেড়া টাকা পরিবর্তন করতে নয়, টাকা ভাংতি করতে এখানে আসেন। প্রতিদিনই নিজের জন্য এসব দোকান থেকে টাকা ভাংতি করেন তিনি। তবে অনেক সময় পুরাতন টাকা বদলে নতুন টাকা নিয়ে যান বাচ্চাদের জন্য। কারণ নতুন টাকা পেলে বাচ্চারা অনেক খুশি হয়।
প্রিন্ট করুন







Discussion about this post