প্রচ্ছদ প্রথম পাতা

অন্যের সম্পত্তি নিলামে তুলেছে যমুনা ব্যাংক!

মিথ্যা তথ্য দিয়ে ঋণ গ্রহণ

সাইফুল আলম, চট্টগ্রাম: চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ী অলক মজুমদার সাম্প্রতিক সময়ে ঋণখেলাপি হন যমুনা ব্যাংক খাতুনগঞ্জ শাখায়। তার কাছে সুদাসলে ব্যাংকের পাওনা প্রায় এক কোটি ১৬ লাখ টাকা। আর এ পাওনা আদায়ে বন্ধকিতে থাকা নগরীর পাথরঘাটার দুই দশমিক ৮১ শতাংশ জমিসহ দালান নিলামে বিক্রির বিজ্ঞপ্তি প্রচার করেছে ব্যাংকটি। অথচ তিনি এ সম্পত্তির একক মালিক নন। তার আরেক ভাই পুলক মজুমদারও যৌথ মালিকানায় আছেন। তাদের বাবার মৃত্যুর পর দুই ভাই এ সম্পত্তির সমান অংশীদারিত্ব পান এবং একই সঙ্গে বসবাস করে আসছেন।
অভিযোগে রয়েছে, ভাইয়ের মালিকানার তথ্য গোপন করে অবৈধভাবে অলক মজুমদার ভবনসহ জমি বন্ধক রেখে ঋণ গ্রহণ করেন। এখন নিলাম প্রক্রিয়া ও ব্যাংকে মিথ্যা তথ্য নিয়ে পাল্টাপাল্টি অভিযোগে দুই পক্ষের বিরোধ চরমে পৌঁছেছে।
যমুনা ব্যাংক খাতুনগঞ্জ শাখা সূত্রে জানা যায়, চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ রামজয় মহাজন লেনের বিএম ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী অলক মজুমদার ব্যবসার প্রয়োজনে ঋণ সুবিধা গ্রহণ করেন। আর ঋণের জামানত হিসেবে বন্ধক দেন নগরীর পাথরঘাটার দুই দশমিক ৮১ শতাংশ জমিসহ দালাল। এ ব্যবসায়ী ঋণের নিয়মিত পাওনা পরিশোধে একাধিকবার ব্যর্থ হন। ফলে নিয়ম অনুসারে ঋণটি খেলাপিতে পরিণত হয়। এ ব্যবসায়ীর কাছে গত ৩১ আগস্ট পর্যন্ত সুদাসলে ব্যাংকের পাওনা এক কোটি ১৫ লাখ ৮৮ হাজার টাকা। আর এ পাওনা আদায়ে সংশ্লিষ্ট শাখা ঋণের বিপরীতে বন্ধকিতে থাকা সম্পত্তি আগামী ২০ অক্টোবর নিলামে বিক্রির তারিখ নির্ধারণ করে। এতে আগ্রহী ক্রেতা বা প্রতিষ্ঠানকে অংশগ্রহণের জন্য বিজ্ঞপ্তি প্রচার করা হয় স্থানীয় একটি দৈনিকে।
অপরদিকে এ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের কয়েক দিন পর একই জমির আরেক অংশীদার পুলক মজুমদারের পক্ষে আইনজীবী সবুজ কান্তি নাথ পাল্টা অভিযোগ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে প্রচার করেন একই দৈনিকে। ওই বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ব্যবসায়ী অলক মজুমদার ঋণের জামানত হিসেবে বন্ধক দেন নগরীর পাথরঘাটার দুই দশমিক ৮১ শতাংশ পৈতৃক জমিসহ দালান। অথচ এ সম্পত্তির একক মালিক নন অলক মজুমদার। এতে তার আরেক ভাই পুলক মজুমদারের যৌথ অংশীদারিত্ব আছে। এ সম্পত্তির মূল মালিক ছিলেন তাদের বাবা মৃত নারায়ণ মজুমদার। তার মৃত্যুর পর অলক ও পুলক দুই ভাই এ সম্পত্তির সমান অংশীদারিত্ব পান এবং একই সঙ্গে বসবাস করছেন। কিন্তু ভাইয়ের মালিকানা গোপন করে ব্যবসায়ী অলক মজুমদার ভবনসহ জমির মালিকানা নিজের নামে দলিল বানিয়ে নেন, যা যমুনা ব্যাংকে বন্ধক রেখে ঋণ গ্রহণ করলে তা প্রকাশ পায়। এ অবৈধ মালিকানা বাতিল চেয়ে ২০১৬ সালে পুলক মজুমদার চট্টগ্রাম যুগ্ম জেলা জজ প্রথম আদালতে একটি মামলা (২৭৭/০৮) করেন। তখন আদালত স্থিতাবস্থা (স্টে) জারি করেন। পরে বন্ধকি সম্পত্তির বিষয়টি প্রকাশ পেলে সংশ্লিষ্ট শাখার ব্যবস্থাপকসহ ব্যাংককে বিবাদী করা হয়, যাতে বর্তমানে ভায়োলেশন মিস ১০/০৯ মামলাসহ আরেকটি মামলা বিচারাধীন আছে। আর বিচারাধীন সম্পত্তি নিলামে বিক্রির বিজ্ঞপ্তি প্রচার আইনসংগত নয়। এটা সরাসরি আইন ও আদালতের আদেশ লঙ্ঘন।
এ বিষয়ে আইনজীবী সবুজ কান্তি নাথ শেয়ার বিজকে বলেন, ‘আদালতের স্থিতাবস্থা আদেশ থাকাবস্থায় ব্যাংক কীভাবে নিলাম বিজ্ঞপ্তি প্রচার করে? এছাড়া আরও কয়েকটি মামলা চলমান আছে। এ অবস্থায় এ নিলাম কার্যক্রম পরিচালনা করা অবৈধ। আমার পর্যবেক্ষণ অনুসারে, ব্যাংক সর্বক্ষেত্রে আগ বাড়িয়ে কাজ করছে। দানপত্র কার্যকর হওয়ার তিন মাস আগে ব্যাংক ঋণপত্র অনুমোদন করে। আরও দেখা যায়, দানপত্রে সাক্ষী হিসেবে আছেন ব্যাংক কর্মকর্তারা! এটা রহস্যজনক। সাধারণত নিকটাত্মীয়রাই এসব ব্যাপারে সাক্ষী থাকেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘তাদের বাবা নারায়ণ মজুমদার পেশায় ব্যবসায়ী ছিলেন। তার শেষ সময়ে বড় ছেলে অলক ব্যবসা দেখাশোনা করতেন। তখন পুলক মজুমদার অন্য চাকরি করতেন। তখন তিনি মৌখিকভাবে আত্মীয়-স্বজনের উপস্থিতিতে দোতলা ও তিনতলার মালিকানা যথাক্রমে বড় ছেলে অলক এবং ছোট ছেলে পুলককে ভাগ করে দেন। এর মধ্যে তার (বাবা) জীবনের শেষ সময়ে অলক ব্যবসার প্রয়োজন বুঝিয়ে দানপত্র করিয়ে নেন। আর দোকানের মালিকও ছিলেন নারায়ণ মজুমদার। পরে দোকানটি বন্ধ হয়ে যায় শুনেছি। মনে হচ্ছে, ঋণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের ঘাপলা আছে।’
বন্ধকি সম্পত্তির জটিলতা নিয়ে যমুনা ব্যাংক লিমিটেড এসভিপি ও খাতুনগঞ্জ শাখা ব্যবস্থাপক মো. সহিদ উল্লাহ শেয়ার বিজকে বলেন, ‘অলক মজুমদার আমাদের একজন খেলাপি গ্রাহক। ব্যাংক নিয়ম অনুসারে খেলাপি ঋণের দায়ে বন্ধকি সম্পত্তি নিলামে তুলছে। আর আমাদের নেওয়া দলিলপত্র ঠিক আছে।’
জমি ও ভবনের মালিক দাবিদারের পক্ষে আইনজীবীর নোটিস প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটা তাদের পারিবারিক সমস্যা। আমাদের নয়।’

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..