প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

অপব্যাবহারের সুযোগ না থাকায় কাম্য 

শফিকুল ইসলাম খোকন: আমাদের জীবনে আধুনিকতা ও উন্নয়নের ছোঁয়া লাগলেও বাল্যবিয়ের প্রবণতা কমেনি। তবে এটি সত্য, এখন সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে সচেতনতা বেড়েছে। বাল্যবিয়ে শুধু ব্যক্তির নয়, এটি পরিবার, সমাজ তথা রাষ্ট্রের জন্যও ক্ষতিকর। জৈবিক প্রয়োজনের বিষয়টি তো অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু এর একটি সামাজিক বন্ধন রয়েছে, যাকে সামাজিক বা পারিবারিকভাবে দাম্পত্য হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে থাকি বা বলি। আর সমাজ স্বীকৃত প্রক্রিয়ায় এ যাত্রা শুরু হয় বিয়ের মধ্য দিয়ে। পরিবারে সন্তান যৌবনপ্রাপ্ত হলেই তাদের বিয়ের প্রশ্ন ওঠে। এ সুযোগে ‘বাল্যবিয়ে’ নামক সামাজিক ব্যাধিও শুরু হয়ে যায়। আর আইন যতই কঠিন হোক, ফাঁকফোকর দিয়ে আইন লঙ্ঘন চলছে। আর সেই আইন যদি হয় ‘যদি’, ‘কিন্তু’, ‘তবে’, ‘বিশেষ প্রেক্ষাপট’ এসব শর্তযুক্ত, তাহলে তো কথাই নেই।

অনেক বছর পর হলেও ১৯২৯ সালের আইনে সংশোধনী এনে ২০১৪ সালে মন্ত্রিপরিষদে অনুমোদিত বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, ২০১৪ একটি ইতিবাচক উদ্যোগ। তবে মেয়েদের বিয়ের বয়স ১৬ এবং ছেলেদের বিয়ের বয়স ১৮ নির্ধারণের জন্য মন্ত্রিসভা যে পরামর্শ দিয়েছে, তা নিয়ে ভাবনার অবকাশ রয়েছে। আন্তর্জাতিক শিশু অধিকার সনদ অনুযায়ী ১৮ বছরের কম বয়সী সবাই শিশু। এমনকি বর্তমানে প্রচলিত আইনে ১৮ বছরের কম বয়সী মেয়ে ও ২১ বছরের কম বয়সী ছেলেদের বিয়েতে রাষ্ট্রীয় অনুমোদন নেই। শিক্ষা, সচেতনতা, সামাজিক নিরাপত্তার অভাব ও গোঁড়ামির কারণে বাংলাদেশের অনেক মেয়েশিশুর ১৮ বছরের আগেই বিয়ে হয়ে যায়। নারীর ক্ষমতায়ন এ সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। এটা নিশ্চিত করতে হলে তার শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও আর্থসামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। নিশ্চিত করতে হবে তার শারীরিক ও মানসিক বিকাশ। নারীর শারীরিক ও মানসিক বিকাশের পথ রুদ্ধ করে ক্ষমতায়নের পথ উক্ত করা যাবে না।

সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী ‘মেয়েদের বিয়ের ন্যূনতম বয়স ১৮-ই থাকছে। তবে মা-বাবা চাইলে ১৬ বছরেও বিয়ে হতে পারে।’ এমন ঘোষণার পর ২০১৬ সালে এসে তা বিশেষ প্রেক্ষাপট হিসেবে বিবেচনায় এনে আইনে রূপান্তর করায় এটি সমালোচিত হয়েছে। এ ঘোষণা থেকে বাল্যবিয়েতে আরও উদ্বুদ্ধ হবে মানুষ, এমনটি মনে করা হচ্ছে। এ বিশেষ ধারা কাজে লাগাবে সুযোগসন্ধানীরা। ২০১৩ সালের খসড়া আইনের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী ২০১৪ সালের ১৮ ডিসেম্বর যে অনুশাসন দিয়েছিলেন তাতে বলা হয়েছে, ‘বিয়ের বয়স ১৮, তবে পিতামাতা বা আদালতের সম্মতিতে ১৬ বছর সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হবে। সামাজিক সমস্যা কম হবে।’

বিদ্যমান আইনে বাল্যবিয়ের শাস্তি হিসেবে বলা হয়েছে, অনধিক ছয় মাস কারাদণ্ড বা ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবে। বাল্যবিয়ে সম্পর্কে কেউ মিথ্যা অভিযোগ করলে তার বিরুদ্ধে অনধিক ছয় মাস কারাদণ্ড বা ৩০ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। বাল্যবিয়েতে ছেলেমেয়ের শাস্তি অনধিক ১৫ দিনের আটকাদেশ বা অনধিক পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করা হবে। প্রাপ্তবয়স্ক কোনো নারী বা পুরুষ বাল্যবিয়ে করলে তার জন্য অনধিক দুই বছর কারাদণ্ড বা এক লাখ টাকা অর্থদণ্ড হবে। বাল্যবিয়ের ক্ষেত্রে পিতা-মাতাসহ সহযোগীরা সর্বনিম্ন ছয় মাস থেকে অনধিক দুই বছর কারাদণ্ড বা অনধিক ৫০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবে। বাল্যবিয়ের নিবন্ধনের জন্য নিবন্ধকের শাস্তি ও লাইসেন্স বাতিল হবে। কাজি বা নিবন্ধকের অনধিক দুই বছর কারাদণ্ড বা ৫০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড হবে।

বাস্তবতার দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাবো, মেয়ে বা ছেলের বয়স ১৬ বা ১৮-এর কাছাকাছি হলেই অনেক পিতা-মাতা আদালতে গিয়ে সন্তানদের বিয়ে দেওয়ার জন্য মিথ্যার আশ্রয় নেবেন। এখানে বিদ্যমান আইনের চেয়ে মা-বাবার ইচ্ছাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ফলে আইনের শাসন কতটুকু বাস্তবে রূপ নেবে, সেটিও প্রশ্নবিদ্ধ। প্রথম কথা, ১৮-এর নিচে কত বছর বয়সে বিয়ে হতে পারবে, আইনের খসড়াটিতে তা নির্দিষ্ট করে বলা নেই। দ্বিতীয় কথা, আদালতের নির্দেশ কিংবা বাবা-মায়ের সম্মতি যে সুযোগেই হোক, ১৮ বছরের নিচে মেয়েদের বিয়ের বিধান থাকলে তার অপব্যবহার হওয়ার সুযোগ থাকবে। সর্বশেষ ২০১৬ সালের ২২ নভেম্বর ছেলেদের ২১ এবং মেয়েদের জন্য ১৮ বছর বয়সের সীমারেখা রাখলেও ‘বিশেষ প্রেক্ষাপটে’ আদালতের নির্দেশনা মেনে অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের সর্বোত্তম স্বার্থে বিয়ে দেওয়ার বিধান রেখে ‘বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, ২০১৬’-এর চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। আমাদের দেশে কঠোর আইনের ফাঁক গলেও অনেক আসামি বেরিয়ে যায়। সেখানে আইনেই যদি বিশেষ ধারা করে ১৮ বছরের কম বয়সী মেয়ের বিয়ের ক্ষেত্রে বিবেচ্য বিষয় বা বিশেষ প্রেক্ষাপটের মতো ফাঁক রাখা হয়, তাহলে কীভাবে এ আইন দ্বারা পরিস্থিতির উন্নতি নিশ্চিত করা যাবে? আমাদের এটিও বুঝতে হবে ‘যদি’, ‘তবে’, ‘কিন্তু’ ‘বিশেষ’ এসব শর্ত যুক্ত করে মেয়েদের বিয়ের ন্যূনতম বয়স যে ১৬ করা হয়েছে, এটি যেমন আত্মঘাতী, তেমনি আন্তর্জাতিক শিশু অধিকার সনদের অনুচ্ছেদ ১-এর পরিপন্থী। বয়সের ক্ষেত্রে ওই সনদের সঙ্গে তা সাংঘর্ষিক। এ রকম সাংঘর্ষিক বা দুর্বল আইন থাকলে এর অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি হবে। এ কারণে মেয়েদের বিয়ের বয়স শর্তহীনভাবে ১৮ বছরই রাখতে হবে।

রাষ্ট্র ও সমাজকে সুচারুভাবে চালাতে আইন দরকার। আইনের পাশাপাশি নাগরিকদের দায়বদ্ধতা থেকে সমন্বিত উদ্যোগে আইনগুলো বাস্তবায়ন করা দরকার। এটি সরকারের একার পক্ষে সমাধান করা সম্ভব নয়। জনসচেতনতা, সামাজিক প্রতিরোধ ও গণঐক্যের মাধ্যমেই আইনের যথাযথ পরিপালন করতে হবে। শুধু আইনের দিকে তাকিয়ে নয়, নিজেদের দায়বদ্ধতা থেকে উদ্যোগী হয়ে কাজ করতে হবে আমাদের সবাইকে। তাহলে প্রজন্ম যেমন হুমকি থেকে রেহাই পাবে, তেমনি দেশ ও জাতি রক্ষা পাবে। আইনও বাস্তবায়ন হবে।

 

সাংবাদিক ও গবেষক

msi.khokonpÑgmail.com