প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

অপমৃত্যুর নানা কারণ সঠিক পরিসংখ্যান জানা যায় কি?

 

তৌহিদুল ইসলাম চঞ্চল: উথাল-পাথাল নদীতে নৌকায় চড়েছেন ২০-২৫ জন। ঘরে ফিরতে হবে, হোক ঝড় কিংবা প্লাবন; নদী পাড়ি দিয়ে ঘরে পৌঁছাতে হবে। কেউ একটু ভয় পাচ্ছেন না, দু’একজন সাঁতারও জানেন না! তাতে কী? অটল বিশ্বাস আছে মাঝির প্রতি। তবে কি এ একই মাঝি বারবার সে বিশ্বাস রক্ষা করতে পারেন? শক্ত হাতে হাল ধরেও তো অনেক সময় নৌকা নিয়ে ডুবে যান। নিজে হয়তো জানে বেঁচে যান; কিন্তু যে মানুষগুলো তার ওপর বিশ্বাস করে নৌকায় চড়েছিল, তাদের কজন হয়তো প্রাণ হারায়। তাই বলে কি আর কেউ নৌকায় চড়ে না? তাই বলে কি আর কোনো মাঝি নৌকা চালান না? তবুও চড়ছে। কেন? ওই যে বিশ্বাস। বছরে কতজন নৌকাডুবিতে মারা যাচ্ছে, এ বিষয়ে কি কোনো পরিসংখ্যান আছে? থাকলে একটু দয়া করে জানাবেন।

দূরপাল্লার বাস ঢাকা থেকে ৩৪০ কিলোমিটার দূরে গন্তব্যে রওনা দিল রাত ৯টায়। শীতের রাত। ঘন কুয়াশার চাদরে আচ্ছাদিত চারপাশ। ১০ হাত সামনে কী আছে বোঝা দায়। এর মাঝেই চালক গাড়ি চালাচ্ছেন। তার পেছনে রয়েছে ৪০-৪৫ জন মানুষ, যাদের সবাই জানেন এ অবস্থায় গাড়ি চালানো কতটা ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু কেউ কেউ নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছেন, কেউবা গল্প করছেন, কেউ কানে হেডফোন লাগিয়ে গান শুনছেন; আবার কেউ অ্যানড্রয়েড ফোনে ফেসবুকে চ্যাটিং করছেন। কেন? একটুও কী চিন্তা-ভয় নেই? ওই যে বিশ্বাস! তবুও বাস নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে, প্রতি বছর সড়ক দুর্ঘটনায় কত মানুষের মৃত্যু ঘটছে। তাই বলে কি মানুষ বাসে চড়ছে না? দিব্বি চড়ছে। আর চালকদের মধ্যেও যে দু’একজন দুষ্ট নেই কে জানে। একদিন বাসে চড়ে বাড়ি যাচ্ছি। হুট করে চালক একটা দুর্ঘটনার প্রায় সন্নিকটে পৌঁছে কোনোরকম বাসটি নিয়ন্ত্রণে আনেন। পরে জানলাম তার ঘুম পেয়েছিল আর পেটভর্তি অ্যালকোহল ছিল! আমরা স্বীকার করি, একজন চালক কিন্তু কখনও স্বেচ্ছায় কোনো দুর্ঘটনা ঘটান না। তবে অসতর্ক হয়ে পড়েন মাঝেমধ্যে। আচ্ছা, সড়ক দুর্ঘটনায় ২০১৬ সালে ঠিক কতজন মৃত্যুবরণ করেছেন একটু জানেন কি? পরিসংখ্যান থাকলেও তা কি সঠিক? জানার দরকার আছে কি?

একজন ভালো চিকিৎসক তিনি, যিনি সঠিক রোগ নির্ণয় করতে পারেন। এভাবে অনেক মানুষের সুস্থ হয়ে ওঠার পেছনে অবদান রাখেন। অতঃপর প্রায় ১০-১২ বছর, কেউ কেউ চার-পাঁচ বছরে একটু সুনাম-খ্যাতি অর্জন করেন। কেন এ খ্যাতি, কারণ তিনি সঠিক রোগ নির্ণয় করেন; সঙ্গে সঠিক পথ্যও দেন। মানুষের আস্থা অর্জন করেন। এখানেও যে বিশ্বাস! মানুষ চিকিৎসকের কাছে যায় কেন? নিশ্চয়ই আরোগ্য লাভ করতে। আর কোন চিকিৎসকের চিকিৎসা নেওয়া হবে, তা নির্ভর করে ওই চিকিৎসক কতটা বিশ্বাস অর্জন করতে পেরেছেন। তাই বলে কি কোনো চিকিৎসকের সব রোগী আরোগ্য লাভ করেন? না। যার ওপারের ডাক আসে, সে চলে যায়Ñএটাই নিয়তি। কিন্তু যদি সেই মৃত্যু হয় ভুল চিকিৎসায়, সেক্ষেত্রে আমার কিছু কথা আছে। আমার এক নিকটাত্মীয়ের ৮-১০ বছর বয়সী ছেলের শ্বাসকষ্টে মুমূর্ষু অবস্থা। অনেক চিকিৎসায়ও কোনো উপকার হচ্ছে না। ভূরিভূরি টেস্ট চলছে আর প্যাথলজি মালিকের ভুঁড়ি বাড়ছে, কিন্তু ছেলে আর ভালো হয় না। পরে অনেক দূরে মেডিক্যাল কলেজের এক অধ্যাপককে দেখানো হলো। নেহাত ভালো মানুষ, কোনো টেস্ট দিলেন না আর পথ্য হিসেবে লিখলেন একটি কৃমির ওষুধ! ব্যস, শিশুটি দিব্বি সুস্থ। ওই চিকিৎসকের ওপর ভরসা করা যায়Ñকী বলেন? তো যা বলছিলাম, রোগ নির্ণয়ের দক্ষতা ভালো চিকিৎসক হওয়ার জন্য অত্যাবশ্যকীয়। আর আপনি যদি ১০ হাজার টাকার টেস্ট দেন, সেক্ষেত্রে রোগ যেখানেই লুকিয়ে থাকুক না কেন, তাকে ধরা দিতেই হবে! সেক্ষেত্রে ক্রেডিট কার? আবার অনেক চিকিৎসক, যারা এত বেশি টেস্ট করতে  দেন না। সহজেই রোগ নির্ণয় করতে পারেন। কিন্তু আমাদের এও চিন্তা করতে হবে, মাঝেমধ্যে ঝড়ের বেগে কিছু রোগ আসছে, যেগুলোর নাম অজানা। সে ক্ষেত্রে চিকিৎসকের কী দোষ! তিনি তো টেস্ট দেবেনই! কী করবেন সেসব ক্ষেত্রে। কিন্তু ভুল চিকিৎসায় রোগীর মৃত্যু হলে তা মেনে নেওয়া যায় না। গত বছর কত লোক ভুল চিকিৎসায় মারা গেছে, এর কোনো পরিসংখ্যান আছে কি? যদি থাকে, তা কি নির্ভুল? আরেকটি পরিসংখ্যান জানা দরকার, ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলো গত বছর কতগুলো ফ্রিজ, টিভি, গাড়ি, ফ্ল্যাট কিনেছে নামে কিংবা বেনামে, তার সঠিক হিসাব কি কারও কাছে পাওয়া যাবে? ডায়াগনস্টিক সেন্টার, প্যাথলজি সেন্টারগুলোর আয় কত আর তাদের কত খরচ বা লাভ কত হচ্ছে? কোন পেশার মানুষ কত আয় করছে, আর সে নির্দিষ্ট পেশাজীবী থেকে দেশের রাজস্ব খাতে কত টাকা আসছে? কোন পেশার মানুষ সবচেয়ে বেশি ব্যাংকঋণ নিচ্ছে (ব্যবসায়ী ব্যতিরেকে), কীজন্য নিচ্ছে? তাদের আয়-ব্যয়ের সঠিক হিসাব কত? দাখিল করা রিটার্নের সত্যতা কতটুকু? এসব কোনোটারই উত্তর জানা নেই।

ভুল চিকিৎসায় মারা যাওয়া মানে অপমৃত্যু। তাই এ-সংক্রান্ত সঠিক পরিসংখ্যান দরকার আছে। সৃষ্টিকর্তার দেওয়া জীবন, তিনি জš§-মৃত্যু নির্ধারণ করবেন, এতে কারো হাত নেই। কিন্তু অসতর্কতায় মৃত্যু তথা অপমৃত্যুর সঠিক সংখ্যা, এর কারণ, যারা এ অপকর্মের পেছনে দায়ী, তাদের দক্ষতা, যোগ্যতা, তারা দোষী কিংবা দোষী ননÑএসব বিষয়ে খোলাসা করাটা বাঞ্ছনীয় নয় কি? মাটির মানুষ ঠিকই কিন্তু মাটির পুতুল তো নয় যে ভাঙলে (মারা গেলে) কারও কিছু যায় আসে না! একটা মানুষের সঙ্গে তার পরিবারের আশা-ভালোবাসা, সাধ-আহ্লাদ কত কিছু জড়িয়ে থাকে। মানুষ মরলেই কি সব শেষ? আশ্চর্য! তার কাছ থেকে হয়তো পরিবার, সমাজ, তথা রাষ্ট্রের কিছু পাওয়ার ছিল। ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর টেকনিশিয়ানদের কমপিটেন্সি সম্পর্কে কি কোনো গাইডলাইন আছে? যদি থেকেই থাকে, তা কি মেনে চলা হচ্ছে? পৃথিবীতে কতজন ‘নাই’ হয়ে যায়, তার খবর কে রাখে! কিন্তু একটা সঠিক নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে পারলে হয়তো এ ধরনের অপমৃত্যুর সংখ্যা কমতো। আমরা আবার সংখ্যায় বিশ্বাসী কি না, তাই জীবন থেকে সংখ্যাটা অনেক বড়। একজনের মৃত্যু মানে একটি সংখ্যা বৃদ্ধি। সেটা তো কমতো? তাহলে কী মানুষ আর চিকিৎসকের শরণাপন্ন হবে না? অবশ্যই হবে; কারণ সব চিকিৎসক এক নন, আর আমি বিশ্বাস নিয়ে বলছিÑএকজন চিকিৎসক মনে-প্রাণে চান তার রোগী সুস্থ হয়ে উঠুক। তারা কখনই স্বেচ্ছায় এমন কিছু করেন না, যা একজন রোগীকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়। চিকিৎসা একটি মহান পেশা। সব পেশার মানুষ বিদায়কালে বলতে পারেনÑ‘আবার আসবেন’। কিন্তু একজন চিকিৎসক কখনও রোগীকে বলেন না বা বলতে পারেন নাÑ ‘আবার আসবেন’ অবশ্য ব্যবস্থাপত্রে পরবর্তী সাক্ষাতের তারিখ লেখা থাকে। সেটি রোগের ধরন অনুসারে আর রোগীকে সুস্থ করার প্রয়োজনে।

চালকের ভুলে কত মানুষ মারা গেল তার পরিসংখ্যান আছে। চিকিৎসকদের ভুলেও অনেক মানুষ মারা যায়। কিন্তু সেটির পরিসংখ্যান নেই।

 

মানবসম্পদ প্রশিক্ষক

chanchalÑcolumnist.com