প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

অফিসিয়াল পাসপোর্ট না পাওয়ায় ক্ষুব্ধ কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্মকর্তারা

নিজস্ব প্রতিবেদক: সরকারি চাকরিজীবী হয়েও অফিসিয়াল পাসপোর্ট না পাওয়ায়  ক্ষোভ দানা বাঁধছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্মকর্তাদের মধ্যে। এ সমস্যার দ্রুত সমাধানের লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিল গতকাল মঙ্গলবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকে এক মতবিনিময় সভা করে। কাউন্সিল সভাপতি এইচএম দেলোয়ার হোসাইনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ মতবিনিময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের উপ-মহাব্যবস্থাপক এবং যুগ্ম পরিচালক পর্যায়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

সূত্রে জানা গেছে, সভায় বাংলাদেশ ব্যাংকের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করা হয়। অফিসিয়াল পাসপোর্ট না পাওয়া,  কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আলাদা অর্ডার থাকার পরও সাধারণ ব্যাংক হিসেবে বিবেচনা করা, কর্মকর্তাদের শ্রান্তিবিনোদন ভাতা কমিয়ে দেওয়া, বুনিয়াদি প্রশিক্ষপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের প্রণোদনা বাতিল করাসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন কর্মকর্তারা।

জানা গেছে, বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার, ১৯৭২ (রাষ্ট্রপতির ১৯৭২ সালের আদেশ নম্বর ১২৭) বলে বাংলাদেশ ব্যাংককে শুধু ‘কেন্দ্রীয় ব্যাংক’ হিসেবেই সংজ্ঞায়িত করা যায়। দেশের অর্থনীতির স্থিতিশীলতার জন্য আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ হিসেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বকীয়তা ও স্বাতন্ত্র্যের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। এ কারণে অন্যান্য ব্যাংকের মতো করে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে একই কাতারে অন্তর্ভুক্ত করাটা যুক্তিযুক্ত নয় বলে মনে করেন কর্মকর্তারা।

বর্তমানে পাসপোর্ট অধিদফতর ও এনবিআরের ওয়েব পেইজে বাংলাদেশ ব্যাংককে শুধু ‘ব্যাংক’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আবার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান ও গবেষণা কোষ থেকে প্রকাশিত ‘সরকারি সংস্থাসমূহের নাম ও যোগাযোগের ঠিকানা ২০১৬’ শীর্ষক পুস্তকের ৩১ নং পৃষ্ঠায় বাংলাদেশ ব্যাংককে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের নিয়ন্ত্রণাধীন স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা হিসেবে দেখানো হয়েছে, যা বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার, ১৯৭২-এর পরিপন্থী।

এদিকে দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ ব্যাংক কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অফিসিয়াল পাসপোর্ট পেয়ে আসছিলেন। কিন্তু ২৪ মার্চ ২০১৬ তারিখে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বহিরাগমন শাখা-১ হতে একটি পরিপত্র জারি করা হয়। যেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান ও গবেষণা কোষ হতে প্রকাশিত ‘সরকারি সংস্থাসমূহের নাম ও যোগাযোগের ঠিকানা-২০১৬’ শীর্ষক পুস্তকে বলা হয়েছে: ‘যেসকল মন্ত্রণালয়/বিভাগ/অধিদপ্তর/পরিদপ্তর/অধস্তন অফিস এবং স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা/কর্পোরেশনের নাম ও যোগাযোগের ঠিকানা উল্লেখ রয়েছে, সে সকল দপ্তরে কর্মরত রাজস্ব খাতভুক্ত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনুকূলে সরকারি আদেশের ভিত্তিতে সরকারি কাজে বিনা ফিতে এবং চিকিৎসা, পবিত্র হজ্ব পালন, তীর্থস্থান ভ্রমণের ক্ষেত্রে সরকারি আদেশের ভিত্তিতে ফি গ্রহণসাপেক্ষে অফিসিয়াল পাসপোর্ট প্রদান করা হবে’। উল্লিখিত বইয়ের ৩১ নং পৃষ্ঠায় বাংলাদেশ ব্যাংককে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের নিয়ন্ত্রণাধীন স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা হিসেবে দেখানো হয়েছে (যা বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার, ১৯৭২ (রাষ্ট্রপতির ১৯৭২ সালের আদেশ নম্বর ১২৭)-এর পরিপন্থী)। কিন্তু তারপরও বাংলাদেশ ব্যাংক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অফিসিয়াল পাসপোর্ট প্রদান করা হচ্ছে না। যুক্তি হিসেবে বলা হচ্ছে যে, বাংলাদেশ ব্যাংক কর্মকর্তা-কর্মচারীরা রাজস্ব খাতভুক্ত নন।

জানা গেছে, যেসব কর্মচারীর বেতন সরকারি হিসাব থেকে প্রদান করা হয়, তাদেরকেই ‘রাজস্বভুক্ত’ কর্মচারী বলা হয়ে থাকে। বাংলাদেশ ব্যাংক বর্তমানে তার নিজস্ব আয় থেকে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা প্রদানের পর যা থাকে, তা সরকারি কোষাগারে জমা প্রদান করে। কিন্তু যদি তা না করে যা আয় হয়, তার সম্পূর্ণ অংশ সরকারি কোষাগারে জমা দিয়ে সরকারি হিসাব বা রাজস্ব হতে বেতন গ্রহণ করতো, তখনই তারা অফিসিয়াল পাসপোর্টের যোগ্য হতো। সাধারণ এ বিষয়টি নিয়ে কর্মকর্তাদের অফিসিয়াল পাসপোর্ট আটকে দেওয়ায় কর্মকর্তারা ক্ষোভ প্রকাশ করেন। বিশ্বের প্রায় সব দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারী অফিসিয়াল পাসপোর্ট পেয়ে থাকেন। পাশ্ববর্তী দেশ ভারতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ সব সরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারী অফিসিয়াল পাসপোর্ট পেয়ে থাকেন। বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার ১৯৭২ (বাংলাদেশ ব্যাংক (সংশোধিত) আইন ২০০৩)-এর আর্টিকেল ৭১(১) ও (৩) মোতাবেক  বাংলাদেশ ব্যাংকে চাকরিরত সবাই দেওয়ানি কার্যবিধি অনুযায়ী সরকারি অফিসার এবং দণ্ডবিধি অনুযায়ী সরকারি কর্মচারী। এত কিছুর পরও বাংলাদেশ ব্যাংক কর্মকর্তা/কর্মচারীদের অফিসিয়াল পাসপোর্ট প্রদান করা হচ্ছে না বলে জানা গেছে।

এছাড়া, বর্তমান গভর্নর দায়িত্ব দেওয়ার পরপরই বাংলাদেশ ব্যাংকের নবীন কর্মকর্তাদের বুনিয়াদি প্রশিক্ষণে ভালো ফল (৮০ শতাংশ নম্বর ও তদূর্ধ্ব)-এর ওপর বিশেষ ইনক্রিমেন্ট দেওয়া হতো। যা নতুন কর্মকর্তাদের জন্য প্রণোদনা হিসেবে কাজ করতো। এই বিশেষ ইনক্রিমেন্টটি বাংলাদেশ ব্যাংক স্টাফ রেগুলেশন অ্যাক্ট ২০০৩-এর আর্টিকেল ৮-এর (vi) ধারা বলে প্রদান করা হতো। যা বাতিল করা হয়েছে। আবার বিশ্বব্যাংকের ঋণ সহায়তা প্রকল্পের আওতায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক শক্তিশালীকরণ প্রকল্পের দুজন হিউম্যান রিসোর্স কনসালটেন্টের সুপারিশক্রমে প্রতি তিন বছরে একবার মূল বেতনের দেড়গুণ হারে শান্তিবিনোদন ভাতা প্রদান করা হতো।  যদিও সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এই ভাতা তাদের মূল বেতনের সমান পেয়ে থাকেন। কিন্তু বর্তমান গভর্নর দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র কিছুদিনের মধ্যেই এই ভাতা হ্রাস করে মূল বেতনের সমান করেছেন যা বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের সুপারিশের পরিপন্থী বলে মনে করা হচ্ছে। এর আগে বাংলাদেশ ব্যাংক কর্মকর্তারা নিজ উদ্যোগে উচ্চশিক্ষায় কোনো বৈদেশিক বৃত্তি পেলে পূর্ণ বেতনে প্রেষণ পেয়ে আসছিলেন। এ বিষয়ে সরকারি গেজেটও রয়েছে। কিন্তু বর্তমানে তা বাতিল করা হয়েছে। এখন নিজ উদ্যোগে প্রাপ্ত পূর্ণ বৃত্তির ক্ষেত্রেও প্রেষণ মঞ্জুর না করে অর্ধবেতন বা বিনাবেতন ছুটি মঞ্জুর করা হচ্ছে। যাতে করে কর্মকর্তারা উচ্চশিক্ষার প্রতি আগ্রহ হারাচ্ছেন বলে মনে করা হচ্ছে। পে-স্কেলের ধারা ২৮-এ উল্লেখ করা প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে প্রশিক্ষণ কাজে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের (৯ম ও তদূর্ধ্ব) বর্তমানে চলমান প্রেষণ অব্যাহত থাকবে। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বাংলাদেশ ব্যাংক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে প্রশিক্ষণ কাজে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের প্রেষণ ভাতা হিসেবে প্রদান করা সুবিধা কর্তন করা হয়েছে। এসব বিষয়ে দ্রুত সমাধানের জন্য তারা আলোচনা করেন।