সারা বাংলা

অবৈধভাবে পারশে মাছের রেণু শিকারের প্রস্তুতি

প্রতিনিধি, সাতক্ষীরা: সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জে বন সংলগ্ন নদ-নদী থেকে চলতি মৌসুমে পারশে মাছের রেণু আহরণের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে উপকূলীয় এলাকার একশ্রেণির অসাধু জেলে। এ মাছের রেণু সংগ্রহকালে নেট জালে পড়ে অবাধে নষ্ঠ হচ্ছে শত শত প্রজাতির বিভিন্ন মাছের রেণু। এতে করে এ অঞ্চলের বিচিত্র প্রজাতির মাছ হুমকির মধ্যে পড়ছে।

পরিবেশবাদীরা আশঙ্কা করছেন, এভাবে অবাধে পারশে মাছের পোনা বা রেণু নেট জাল দিয়ে আহরণ করলে এক সময় আমাদের বিভিন্ন প্রজাতির মাছ হারাতে হবে।

সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, যে কোনো ধরনের প্রাকৃতিক উৎস থেকে মাছের রেণু বা পোনা সংগ্রহের ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় তথা সরকারের স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। দেশীয় ও সামুদ্রিক যাবতীয় মাছের বংশবিস্তারের বাধা দূরীকরণে এমন পদক্ষেপ। যাতে পরিণত আকৃতি লাভের পর প্রজনন সক্ষমতার সুযোগে নদ-নদীগুলোয় মাছের পরিমাণ ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেতে থাকে। এ পরিপ্রেক্ষিতে প্রাকৃতিক উৎস থেকে মাছের রেণু সংগ্রহে সরকারি নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে বঙ্গোপসাগর তীরবর্তী নদ-নদীতে জাল ব্যবহার করতে জেলেদের নিরুৎসাহিত করা হয়। কিছু জেলে এ নিষেধাজ্ঞা মানছেন ঠিকই; কিন্তু তারা বড় মাছ ধরার অন্তরালে জালদড়া দিয়ে সুন্দরবন বা সুন্দরবন সংলগ্ন নদ-নদী থেকে ভাঙ্গাল, পায়রা, পারশে, ভেটকি, লুচো, বাগদা-হরিণাসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছের রেণু শিকার শুরু করেছেন। মূলত লোকালয়ে গড়ে ওঠা চিংড়ি ঘেরে পারশে মাছের এই রেণু চড়া দামে বিক্রি হওয়ায় অধিক মুনাফা অর্জনের সুযোগে দিন দিন রেণু শিকারী জেলের সংখ্যাও বেড়ে চলেছে। অল্প সময়ে অধিক মুনাফা লাভের আশায় তারা নিষেধাজ্ঞার তোয়াক্কা করছেন না।

এমনকি তারা বন বিভাগের সঙ্গে গোপন আঁতাতের মাধ্যমে এই রেণু চালানের জন্য কপোতাক্ষ, খোলপেটুয়া ও শিবসা নদী ব্যবহার করছেন। তারপর তালা উপজেলার পাটকেলঘাটা, শ্যামনগরের কাশিমাড়ি ও আশাশুনি উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় পৌঁছান।

তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, জেলার শ্যামনগর উপজেলার কাশিমাড়ী ঘাট এলাকায় প্রায় প্রতিদিন ১২-১৩টি ট্রলারের মাধ্যমে কয়েক কোটি পারশে রেণু কেনাবেচা হয়। এসব অসাধু জেলে পায়রা, ভাঙ্গান, বাগদা-হরিণা কিংবা পাঙ্গাশ ও টেংরা মাছের রেণু লোকালয় সংলগ্ন পার্শ্ববর্তী নদ-নদী থেকে সংগ্রহ করেন। কিন্তু পারশে মাছের রেণুর জন্যই মূলত সুন্দরবনের গভীরে যান। আবার যথাসময়ে রেণু নিয়ে লোকালয়ে ফেরার জন্যই তারা ইঞ্জিনচালিত নৌকা ব্যবহার করেন।

স্থানীয় রেণু আহরণকারী ও পরিবহনের সঙ্গে জড়িত কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পারশে মাছের কোটি কোটি রেণু পোনা দলবদ্ধভাবে চলাচল করে। এ সময় ব্যবহার-নিষিদ্ধ বিশেষ আকৃতির ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ছিদ্রজাল ব্যবহার করেন ওইসব জেলে। শিকার করা রেণুর ঝাঁক থেকে তারা পারশে মাছের রেণু বেছে নিয়ে বাকি অন্য মাছের রেণু নদীর চরে বালিতে ফেলে দেন; ফলে কোটি কোটি বিভিন্ন প্রজাতির রেণু নষ্ট হয়।

কয়েকজন ঘের মালিকের সঙ্গে আলাপকালে তারা জানান, অল্প সময়ের মধ্যে দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ার পাশাপাশি বাজারমূল্য বেশি হওয়ায় তারা চিংড়ি ঘেরে পারশে মাছের রেণু ছাড়েন। পারশে রেণু পোনার অতিরিক্ত চাহিদার বিপরীতে জোগান নিশ্চিত করতে কিছু জেলে ইঞ্জিনচালিত নৌকা নিয়ে সুন্দরবনের গভীর থেকে পারশে মাছের রেণু শিকার করেন।

শ্যামনগর উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা ফারুক হোসেন জানান, প্রাকৃতিক উৎস থেকে যে কোনো মাছের রেণু সংগ্রহ নিষিদ্ধ। পারশে রেণু পোনা শিকার করতে গিয়ে অসাধু জেলেরা অন্য প্রজাতির কোটি কোটি রেণু ধ্বংস করছেন। তিনি বন বিভাগকে আরও দায়িত্বশীল হয়ে সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকা থেকে পারশে  মাছের রেণু শিকার বন্ধ করতে পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান। এ ধরনের রেণু শিকারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ১৯৫০ সালের একটি আইনে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে বলে তিনি জানান।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..