প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

অবৈধ অভিবাসন কি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য আসন্ন কোনো সমস্যা?

নোয়াহ স্মিথ: ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় বসলে এ ধরনের কিছু একটা ঘটবে, তা অনুমান করা যাচ্ছিল। তবে পরিস্থিতি যে এ পর্যায়ে উন্নীত হবে, সেটি বোঝা যায়নি আগে থেকে। কার্যত ট্রাম্প ওভাল অফিস গুছিয়ে নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে অভিবাসন-বিরোধী মনোভাব বর্তমানে যে স্তরে অবস্থান করছে, তা গত কয়েক দশকের মধ্যে তুঙ্গে। সামাজিক গণমাধ্যমগুলোয় কোনো রাখঢাক না রেখেই অবৈধ অভিবাসীদের ওপর রাগ ঝাড়ছেন একশ্রেণির মার্কিন; আরেক দল আবার অভিবাসীরা কী কাণ্ড করে না করে, সেই জল্পনায় ব্যাপকভাবে ভীত। এসব নতুন কিছু নয়। তবে বলতেই হবে, ট্রাম্পকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচনের আগে অভিবাসন-বিরোধী মনোভাব রিপাবলিকান পার্টির কেবল কয়েকটি বিচ্ছিন্ন উপদলের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। হালে তা ‘জনগুরুত্বপূর্ণ’ ইস্যু! আমি অবশ্য বেশি চিন্তিত একশ্রেণির পণ্ডিত ও বুদ্ধিজীবীদের নিয়ে, যারা অভিবাসনবিরোধী গণবিক্ষোভের বিপরীতে এমনভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছেন; যেন অভিবাসন আসলেই যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি জরুরি ও তাৎক্ষণিক সমস্যা এবং সেভাবেই সেটির সমাধান কাম্য। প্রকারান্তরে ক্ষোভ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে অভিবাসনের উপযুক্ত সমাধান বাতলে দিচ্ছেন তারা। আমি মনে করি, এটা ভুল পদ্ধতি।

নিঃসন্দেহে আমি চাই মার্কিন অভিবাসন ব্যবস্থার উন্নয়ন হোক, এটি একবিংশ শতাব্দীর উপযোগী হোক। সেক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট কিছু প্রস্তাবও রয়েছে আমার। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, মার্কিন অভিবাসন ব্যবস্থা হওয়া উচিত কানাডার মতোÑদক্ষতাভিত্তিক। উল্লেখ্য, আমাদের চালু অভিবাসন ব্যবস্থার আউটপুট কাক্সিক্ষত কার্যকারিতার অনেক নিচে। তাই বলে কেউ যদি এসব ত্রুটি ও দুর্বলতাকে তাৎক্ষণিক ও জরুরি সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করে নাটকীয় নীতিব্যবস্থা নিয়ে উদ্যোগী হয় বিনা দ্বিধায় দ্বিমত পোষণ করব। বলব, লাঠিকে সাপ ভাবছেন মধ্যপন্থীরা। কেননা চলতি প্রেক্ষাপটের ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ এটাই প্রস্তাব করে যে, বর্তমান পরিস্থিতি কোনোভাবেই জরুরি অবস্থা নয়।

যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধ অভিবাসন বন্ধ হয়েছে কমপক্ষে এক দশক আগে। এ-বিষয়ক বিস্তারিত তথ্য-উপাত্ত মিলবে পিউ রিসার্চ সেন্টারে। সংস্থাটির এক গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে সর্বোচ্চ অবৈধ অভিবাসন ঘটে ২০০৭ সালে। তার পর থেকে বছরওয়ারি অবৈধ অভিবাসন হয় শূন্য নয়তো নেতিবাচক। এদিকে এক ২০০৮ সালে সৃষ্ট মন্দায়ই আমেরিকা ছেড়ে যায় কমপক্ষে ১০ লাখ অবৈধ অভিবাসী। পরবর্তী সময়ে মন্দা সমাপান্তে প্রবৃদ্ধির ঝলক দেখা সত্ত্বেও বাড়েনি অবৈধ অভিবাসনের প্রবণতা। এর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক নানা কারণ আছে। তš§ধ্যে প্রথম অর্থনৈতিক কারণটি হলো, ২০০৮ সালের মন্দা মার্কিন জনগণকে যে শিক্ষা দিয়েছে, তা ভুলবার নয়। সেজন্যই মূলত মন্দা শেষে ‘বাবল ম্যানিয়া’র পুনঃআবির্ভাব ঘটেনি অর্থনীতিতে; ঘটলে অবৈধ অভিবাসন বৃদ্ধি অস্বাভাবিক হতো না। দ্বিতীয় কারণ, মেক্সিকান অভিবাসীদের দলে দলে আমেরিকা ত্যাগÑহোন তিনি বৈধ কাগজপত্রধারী বা অবৈধ। খেয়াল করা দরকার, পরিসংখ্যানগত দিক থেকে মেক্সিকোয় অপরাধ সংঘটনের মাত্রা বেশি; যেগুলোর বেশিরভাগই আবার মাদক সংশ্লিষ্ট সহিংসতা। ফলে নিরীহ অনেক মেক্সিকানই একসময় জান বাঁচাতে পাড়ি জমাতেন প্রতিবেশী যুক্তরাষ্ট্রে। বলা যাবে না, ওগুলো পুরোপুরি নির্মূল আজ। তবু গত কয়েক বছর মেক্সিকো যেভাবে অর্থনৈতিক উন্নয়ন করছে, তাতে নিজ জন্মভূমি ক্রমাগত আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে বহু মেক্সিকানের কাছে। আরেকটি বিষয়, মাথাপিছু জন্ম কমেছে সেখানে। এতে মেক্সিকো উপকৃত হচ্ছে পরোক্ষভাবে। হয়তো বৃহৎ পরিবারের একজন মেক্সিকান ছোটখাটো কাজ করেন কোনো এক মার্কিন শহরে; আগে যেটা হতো সামান্য পৈতৃক সম্পত্তি কোনোভাবেই টানত না জন্মভূমিতে। কিন্তু এখন জš§হার কমে মাথাপিছু জমির পরিমাণ বাড়ায় অনেকেই প্রলুব্ধ (জমি বা পারিবারিক ব্যবসা) হয়ে ছুটছেন নিজ দেশে। সবাই এজন্য মেক্সিকো ফিরছেন, সে কথা বলা যাবে না। বরং কেউ কেউ আছেন, যারা শুধু বৃদ্ধ বাবা-মায়ের দেখাশোনার জন্য ফিরছেন বাড়ি। তৃতীয় কারণ, যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো সীমান্তে নজরদারি বৃদ্ধি। বছরের পর বছর সরকারের কাছে অভিবাসন-বিরোধীদের কড়া দাবি ছিল, অবৈধ অভিবাসন প্রতিরোধে মেক্সিকো সীমান্তে যেন কড়া পাহারা বসানো হয়। সাবেক দুই প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ ও বারাক

ওবামা এ দায়িত্ব পালন করেছেন নিষ্ঠার সঙ্গে। ওবামার কথা বিশেষভাবে বলতে হয় এখানে। তার শাসনামলে যুক্তরাষ্ট্র থেকে মেক্সিকোয় অবৈধ অভিবাসীদের ফেরত পাঠানোর হার ত্বরান্বিত হয়। তার

পরও অবৈধ অভিবাসন নিয়ে কেন এত উম্মাদনা, আমার বুদ্ধিতে আসে না। হ্যাঁ, আপনি যদি ২০০০ সালে বসে থাকেন, তাহলে অবৈধ অভিবাসন নিয়ে মাতামাতির অধিকার আপনার আছে। কিন্তু আপনি যদি ২০১৭ সালে থাকেন এবং আপনার বয়স যদি ৪৫ বছর হয়, তাহলে বলব  আপনার বয়স যখন ৩৫ ছিল, তখনই নিট অবৈধ অভিবাসন থেমে গেছে যুক্তরাষ্ট্রে।

কথা হলো, চলমান বাস্তবতা এক জিনিস আর নাগরিক অনুভূতি ভিন্ন বস্তু এবং অনুভূতি সর্বদা বাস্তবতার অনুগামী নয়। সুতরাং সাধারণ মার্কিনরা যদি মনে করেন, অবৈধ অভিবাসীরা নানা ধরনের অপকর্ম ঘটাচ্ছে এবং সেগুলো প্রতিরোধে তাদের রাজপথে নামা দরকার, তাহলে তেমন অনুভূতির প্রতি দৃষ্টি দেওয়া দরকার। সেখানেও কিন্তু মিলছে না জোরালো যুক্তি। তার মানে একশ্রেণির পণ্ডিত ও বুদ্ধিজীবীদের ভাবনার অনুসরণ করছে না বাস্তবতা। এবার গ্যালাপের জরিপের সহায়তা নেওয়া যাক। সংস্থাটি কয়েক দশক ধরে চালিয়ে আসছে গবেষণাটি। সেটি হলো, ঠিক কত শতাংশ মার্কিন মনে করেন অভিবাসন হার হ্রাস করা উচিত। এক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, অভিবাসন-বিরোধী মনোভাব সবচেয়ে বেশি বেড়ে যায় নাইন-ইলেভেনের সন্ত্রাসী হামলা এবং ২০০৮ সালে সৃষ্ট বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের পর। অবশ্য এর পর থেকে প্রবণতাটি ক্রমহ্রাসমান। বর্তমানে অভিবাসন-বিরোধী নেতিবাচক মনোভাবের অধিকারী মার্কিনের সংখ্যা মোট জনসংখ্যার (আনুমানিক) এক-তৃতীয়াংশের একটু বেশি। ২০১৬ সালের জরিপ বলছে, সংখ্যাগুরু মার্কিনের মনোভাব হচ্ছে হয় অভিবাসন বর্তমান স্তরে থাকুক, নইলে একটু বাড়–ক। উল্লেখ্য, অভিবাসন হার বৃদ্ধির পক্ষে মত দিয়েছে ২১ শতাংশ নাগরিক এবং বর্তমান হারই বজায় রাখার পক্ষে ৩৮ শতাংশ মানুষ; যেখানে ৪১ শতাংশ মার্কিন বলেছেন, কোনো পরিবর্তনেরই দরকার নেই। আর শেষোক্ত এই ৪১ শতাংশের মত অভিবাসন নিষেধাজ্ঞা আরোপের জন্য যথেষ্ট যুক্তি বলে আমি মনে করি না।

এদিকে পিউ রিসার্চ আরেক জরিপ চালায়। এর বিষয়বস্তু কাদের ধারণা, অভিবাসীদের কারণে শক্তিশালী হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এক্ষেত্রে ২০১৬ সালে এ যাবৎকালে সর্বোচ্চ ৫৯ শতাংশ আমেরিকান মত দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র শক্তিশালীকরণে ইতিবাচক অবদান রাখছেন অভিবাসীরা। একই বিষয়বস্তু নিয়ে একই সংস্থা আরেকটি জরিপ চালায় ১৯৯৪ সালে। সেখানে দেখা যায়, ৬৬ শতাংশ নাগরিক মনে করেন অভিবাসীরা মার্কিন সমাজের জন্য বোঝা। অথচ ২০১৬ সালের জরিপে এই সংখ্যাটিই কমে নেমেছে ৩৩ শতাংশে। মজার বিষয়, এ জরিপে উঠে আসা রিপাবলিকান পার্টির মনোভাবে পরিবর্তন। অভিবাসীদের নিয়ে এদের অ্যালার্জি পুরোনো। তবে গত শতকের নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝিতে যতজন রিপাবলিকান মনে করতেন, অভিবাসীরা মার্কিন অর্থনীতিতে ইতিবাচক অবদান রাখছে, ২০১৬ সালের জরিপে তাদের সংখ্যা বেড়েছে ৫ শতাংশের মতো। ফলে যে যতই গলা ফাটাক, আমি বলব অভিবাসন-বিরোধী মনোভাব আছে; কিন্তু অভিবাসন-বিরোধী গণজোয়ার নেই আমেরিকায়। আমরা সবাই দেখছি, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার সমর্থক, ভোটারদের জন্য অনেক ইস্যু আছে; যেমন, অর্থনীতি, পররাষ্ট্রনীতি, সন্ত্রাসবাদ প্রভৃতি। কেবল অভিবাসী তাড়ানোর ম্যান্ডেট নিয়ে তিনি নির্বাচনে জেতেননি নিশ্চয়ই! সুতরাং কট্টর ট্রাম্প সমর্থকদের কারও কারও মধ্যে পরিলক্ষিত ওই ক্ষোভকে সংখ্যালঘু রিপাবলিকানের অন্ধ আবেগের প্রকাশ হিসেবেই দেখছি আমি। উপরন্তু ইতিহাসে এর নজির বিরল নয়। বরং নিকট ইতিহাসে ১৯৯০’র দশকে ক্যালিফোর্নিয়ায়ই রয়েছে প্রায় একই রকম ঘটনা। ওই সময় রাজ্যটিতে হুট করে একগাদা অবৈধ অভিবাসী এসে পড়ে এবং তার প্রতিক্রিয়ায় সেখানকার অধিবাসীরা ১৯৯০ সালে অভিবাসন-বিরোধী নেতা পিট উইলসনকে নির্বাচিত করে গভর্নর হিসেবে। তিনি ১৯৯৪ সালে কার্যকর করেন ১৮৭ নম্বর ধারা; যার বলে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় সাধারণ নাগরিক থেকে পৃথক করা হয় অভিবাসীদের। অথচ এর এক দশক পর জনগণের অভিবাসন-বিরোধী অনুভূতি ভোঁতা হয়ে পড়ে এবং একই সময়ে আদালতের রায়ে ধীরে ধীরে অকেজো হয়ে পড়ে ১৮৭ ধারা। আর এখন তো ক্যালিফোর্নিয়ার শ্বেতাঙ্গ ভোটাররা বাম রাজনীতির প্রতি ঝুঁকছেন।

তাই বলি যেসব পণ্ডিত ও চিন্তাবিদ এখনও অভিবাসন বিরোধিতার সমাধানকে ক্ষোভ নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির সঙ্গে গুলিয়ে ফেলছেন, আরেকবার ভাবুন। চলতি আন্দোলন ও বিক্ষোভ কার্যত একটি সংক্ষুব্ধ সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর রাগত চিৎকার এবং চিৎকারটি দিনকে দিন ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর। তদুপরি সংক্ষুব্ধরা যখন উপলব্ধি করবেন, আসলেই বন্ধ হয়েছে অবৈধ অভিবাসন তখন আরও কমবে উম্মাদনা। এখন আমার কথা হলো, এই ক্ষীয়মান উম্মাদনা কমাতে গিয়ে মান্ধাতার আমলের অভিবাসন নিয়মকানুন ফিরিয়ে আনার দরকার কী! কেননা আমার বিশ্বাস, অবৈধ অভিবাসীদের কীর্তিকলাপে মার্কিন সমাজের যতটা না ক্ষতি হবে, তার চেয়ে মার্কিন নাগরিকরা ফাঁপরে পড়বেন যুক্তরাষ্ট্র পুলিশি রাষ্ট্র হয়ে উঠলে। আর এখান থেকে দেখলে আমার মনে হয়, ডেমোক্র্যাটরা অভিবাসন-বিরোধীদের অতিপ্রতিক্রিয়ায় যে নিঃস্পৃহ ও স্থিতাবস্থার প্রতি স্থির মনোভাব দেখিয়েছিল, সেটি অদূরদর্শী ছিল না। বরং একটি কল্পিত সংকটের বিপরীতে সাড়াটি ছিল যথেষ্ট যৌক্তিক।

 

অধ্যাপক, ফাইন্যান্স; ইউনিভার্সিটি অব মিশিগান

ব্লুমবার্গ থেকে ভাষান্তর জায়েদ ইবনে আবুল ফজল