শেষ পাতা

অবৈধ বাল্কহেডে বহির্নোঙর থেকে পণ্য পরিবহন

সাইফুল আলম, চট্টগ্রাম

নৌপথে স্বল্প দূরত্বে বালি পরিবহনের কাজে ব্যবহার করা নৌযান বাল্কহেডে এখন অন্যান্য পণ্যও পরিবহন করা হচ্ছে। নির্দিষ্ট নৌরুটে চলাচল করার কথা থাকলেও প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে এগুলো দেশের সব নৌপথে চলাচল করছে। বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙর থেকে কার্গো পরিবহনে ব্যবহার করা হচ্ছে এমন দুই শতাধিক বাল্কহেড। এতে একদিকে চট্টগ্রাম বন্দর চ্যানেল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে, অপরদিকে লাইটার জাহাজের ব্যবসা কমে যাচ্ছে।

বাংলাদেশ কার্গো ভেসেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিসিভোয়া) তথ্যমতে, দেশে বাল্কহেড আছে প্রায় তিন হাজার। আর দেশের দক্ষিণাঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে কোনো ধরনের কারিগরি নকশা ছাড়াই মিস্ত্রি ও ওয়েল্ডারের হাতে এসব বাল্কহেড নির্মাণ করা হচ্ছে। এদের অনেকের সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বা কারিগরি শিক্ষাও নেই। যেসব ডকইয়ার্ডে এসব নৌযান নির্মাণ করা হচ্ছে, সেগুলোর অনুমোদনের কাগজপত্রেও গোজামিল রয়েছে। এসব নৌযানের কোনো হুইল থাকে না। চট্টগ্রাম বন্দরের উপদেষ্টা কমিটির সর্বশেষ সভায় বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, একশ্রেণির আমদানিকারকদের পক্ষে এজেন্ট কিংবা পণ্য খালাসের দায়িত্বে থাকা প্রতিনিধিরা গোপনে লাইটার জাহাজের বিকল্প হিসেবে প্রায় দুই শতাধিক বাল্কহেড ব্যবহার করছে। পণ্যবোঝাই অবস্থায় এসব বাল্কহেড পানিতে প্রায় ডুবুডুবু করতে থাকে। গন্তব্যে যাওয়ার পথে মৌসুমি বায়ু কিংবা মাত্রাতিরিক্ত জোয়ারের কবলে পড়লে এগুলো ডুবে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। অসাবধানতাবশত অন্য জাহাজের সঙ্গে ধাক্কা লেগে দুর্ঘটনাও ঘটে অহরহ।

ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেলের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শিপ হ্যান্ডলিংয়ে জড়িত একটি চক্র অবৈধ বাল্কহেড দিয়েই বহির্নোঙরে মাদার ভ্যাসেল থেকে কয়লা, পাথরসহ বিভিন্ন পণ্য খালাস নিচ্ছে। অবৈধ এসব বাল্কহেড দিয়েই প্রতিদিন পণ্য দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে পাথর নিয়ে বাঁশখালী, মিরসরাই, কুতুবদিয়া, কক্সবাজারসহ বিভিন্ন গন্তব্যে যাতায়াত করছে এসব বাল্কহেড।

গত সপ্তাহে পাথর বোঝাইকালে কর্ণফুলী নদীর তীরে সদরঘাট থেকে এমভি আল-মোয়াজ, এমভি হাজী মুনির হোসেন-৩, এমভি হাজী মুনীর হোসেন-২ (এম-১৩৩৯৩), এমভি লুবনা-১৯ (এম-২০০০৩) ও এমভি মায়ের দোয়া (এম-২০০০০১৫) নামের পাঁচটি বাল্কহেট আটক করা হয়। এসব জাহাজের সার্ভে, রেজিস্ট্রেশন বাতিল করার জন্য নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক বরাবর চিঠি দেওয়া হয়।

জানা গেছে, কর্ণফুলী নদীকে ঘিরে বালি ব্যবসায়ীরা মুন্সীগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জসহ দক্ষিণাঞ্চলের কয়েকটি জেলা থেকে অবৈধ বাল্কহেড সংগ্রহ করে বালি বোঝাইয়ের পরিবর্তে অন্যান্য পণ্য পরিবহন করে আসছে।

২০টির বেশি লাইটার জাহাজ পরিচালনাকারী মিউচুয়াল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক পারভেজ আহমেদ শেয়ার বিজকে বলেন, কিছু অসাধু লোক এসব বাল্কহেডে পণ্য পরিবহন করে আমদানিকারকদের কাছ থেকে লাইটার জাহাজের সমপরিমাণ বিল আদায় করছে। অথচ বিমা না থাকায় এসব বাল্কহেড ডুবে গেলে কোনো ক্ষতিপূরণ পাওয়া যায় না। এতে লোকসানের পরিমাণ বাড়ে।

তিনি আরও বলেন, ‘দুর্ঘটনায় পড়ে কোনো বাল্কহেড বন্দর চ্যানেলে ডুবে গেলে ফিডার জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এসব বাল্কহেড চলাচল বন্ধের বিষয়ে কর্তৃপক্ষের কঠোর পদক্ষেপ আশা করছি। তাছাড়া আদালতের নেতৃত্বে নিয়মিত অভিযান চালানো এবং ঝুঁকিপূর্ণ এই কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত স্টিভিডোর প্রতিষ্ঠান চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ কার্গো ভেসেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিসিভোয়া) সাধারণ সম্পাদক মো. নুরুল হক শেয়ার বিজকে বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙর থেকে বাল্কহেডের মাধ্যমে পণ্য পরিবহন করা হচ্ছে। অথচ নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাগুলো বাল্কহেডে পণ্য পরিবহনের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়ে রেখেছে, যা আমরা বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রচার করেছি। নিষেধাজ্ঞা মানা হচ্ছে না। এক্ষেত্রে দায়িত্বশীল সংস্থাগুলোর আরও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে। এসব বাল্কহেড যে এলাকার জন্য নিবন্ধিত, সেই এলাকায় চলাচল নিশ্চিত করতে হবে।

সন্দ্বীপ ও হাতিয়ায় কোর্স্টগার্ডের নজরদারি বাড়ানো হলে এসব বাল্কহেড এদিকে আসতে পারবে না বলে মনে করেন অ্যাসোসিয়েশনের ওই নেতা। তিনি বলেন, এমনিতে প্রায় ৪০০-র মতো লাইটার জাহাজ ভাড়ার জন্য কয়েক মাস অপেক্ষায় থাকে। বাল্কহেডের ব্যবহার বন্ধ করতে না পারলে জাহাজ মালিকরা পথে বসবে।

বাংলাদেশ শিপ হ্যান্ডলিং অ্যান্ড বার্থ অপারেটর অ্যাসোসিয়েশনের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, স্টিভিডোর কেবল মাদার ভ্যাসেল থেকে পণ্য খালাসের কাজ করে। এক্ষেত্রে ডব্লিউটিসি কিংবা পণ্যের এজেন্ট যে জাহাজের নাম দেয়, সেই জাহাজে তারা পণ্য বোঝাই করেন। আমদানিকারক কিংবা পণ্যের ক্যারিয়ার প্রতিষ্ঠান থেকে লাইটার কিংবা বাল্কহেড দেওয়া হয়। অ্যাসোসিয়েশনের সদস্যদের অনেকেই বাল্কহেড কাজে লাগানোর বিপক্ষে। আমদানিকারক ও ডব্লিউটিসির এজেন্টদের নিয়ন্ত্রণ করা গেলে বাল্কহেড ব্যবহার বন্ধ করা সম্ভব হবে।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব ওমর ফারুক এ প্রসঙ্গে শেয়ার বিজকে বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ এসব বাল্কহেডের অনুমোদন দেয় না। অনুমোদন দেয় ডিজি (শিপিং)। আর বাল্কহেডে পণ্য পরিবহন হয়, এটা আমার জানা নেই। এ বিষয় কোনো তথ্য আমার কাছে নেই।

এ বিষয়ে নৌ-পরিবহন অধিদফতরের মহাপরিচালক কমোডর সৈয়দ আরিফুল ইসলাম শেয়ার বিজকে বলেন, ‘বাল্কহেডে পণ্য পরিবহন নতুন কোনো ঘটনা নয়। আগে থেকেই বাল্কহেডের মাধ্যমে পণ্য পরিবহন হচ্ছে। এমনটাই শুনেছি এবং অভিযোগও পাচ্ছি। তবে বাল্কহেডে আমদানি ও রফতানিবাহী কার্গো পরিবহন পুরোপুরি অবৈধ। এই অপকর্মের সঙ্গে একশ্রেণির আমদানিকারকের এজেন্ট তথা শিপিং এজেন্ট, ফ্রেইট ফরওয়ার্ডারসরা জড়িত। এক্ষেত্রে আমদানিকারকদের সচেতন হতে হবে। তাহলে সহজে এসব পণ্য পরিবহন বন্ধ হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা শুধু অভিযুক্ত বাল্কহেডের রেজিস্ট্রেশন বাতিল করতে পারি, কিন্তু সক্ষমতা সংকটের কারণে অভিযান চালাতে পারছি না। এজন্য আমরা কোস্টগার্ড, নৌবাহিনীসহ আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে বলেছি আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য। আর যে পাঁচটি বাল্কহেডের অভিযোগ পেয়েছি, তাদের রেজিস্ট্রেশন বাতিল হবে।’

সর্বশেষ..