এফ আই মাসউদ : দেশে জ্বালানি তেল নিয়ে সম্ভাব্য সংকটের আশঙ্কা ও বাজারে অস্থিরতার মধ্যেই সরকার জানিয়েছে, সারাদেশে জ্বালানি তেলের মজুত এখনও স্বস্তিদায়ক পর্যায়ে রয়েছে। একই সঙ্গে অবৈধ মজুত, গুজব ও অতিরিক্ত চাহিদা নিয়ন্ত্রণে জোরদার করা হয়েছে অভিযান ও নজরদারি। সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে একদিকে যেমন অভিযান অব্যাহত রয়েছে, অন্যদিকে ভবিষ্যৎ চাহিদা মোকাবিলায় বড় পরিসরে জ্বালানি আমদানির উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
সারা দেশে জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে এবং সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে বলে জানিয়েছে সরকার। বর্তমানে দেশে মোট জ্বালানি তেলের মজুত রয়েছে ১ লাখ ৯২ হাজার ৯১৯ টন। একই সঙ্গে অবৈধভাবে জ্বালানি তেল মজুতের বিরুদ্ধে চলমান অভিযানে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে বলে জানিয়েছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়।
মজুত পরিস্থিতি স্থিতিশীল: সচিবালয়ে মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে গতকাল মঙ্গলবার আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ও যুগ্ম সচিব মনির হোসেন চৌধুরী জানান, দেশে বর্তমানে ডিজেলের মজুত রয়েছে ১ লাখ ২৮ হাজার ৯৩৯ টন, অকটেন ৭ হাজার ৯৪০ টন, পেট্রোল ১১ হাজার ৪৩১ টন এবং জেট ফুয়েল ৪৪ হাজার ৬০৯ টন। সব মিলিয়ে মোট মজুত দাঁড়িয়েছে প্রায় ১.৯৩ লাখ টন। যুগ্ম সচিব বলেন, নিয়মিত আমদানির মাধ্যমে জ্বালানির সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা হচ্ছে। সামনে হজ মৌসুমকে সামনে রেখে জেট ফুয়েলের চাহিদা বিবেচনায় পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।
সরকারি অভিযানের চিত্র তুলে ধরে তিনি জানান, ৩০ মার্চ সারাদেশে মোট ৩৯১টি অভিযান পরিচালনা করা হয়। এসব অভিযানে ৮৭ হাজার ৭০০ লিটার জ্বালানি তেল উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে ডিজেল ৬৭ হাজার ৪০০ লিটার, অকটেন ৬৪৪ লিটার এবং পেট্রোল ১৩ হাজার ৮৫৬ লিটার। এসব অভিযানে ১৯১টি মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং ৯ লাখ ৩ হাজার ৫৭০ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে। পাশাপাশি তিনজনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছেÑসাতক্ষীরায় একজনকে দুই বছর, চাঁদপুরে একজনকে এক বছর এবং অন্য এক স্থানে একজনকে এক মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
চলমান অভিযানের সামগ্রিক হিসাব তুলে ধরে তিনি বলেন, এ পর্যন্ত ৩ হাজার ৫৫৯টি অভিযান পরিচালিত হয়েছে। এতে ১ হাজার ২৪৪টি মামলা দায়ের, ৮৪ লাখ ৫১ হাজার টাকা জরিমানা আদায় এবং ১৯ জনকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। একই সময়ে মোট ২ লাখ ৯৬ হাজার ৩০৫ লিটার জ্বালানি তেল উদ্ধার করা হয়েছে; যার মধ্যে ডিজেল ২ লাখ ৭৩ হাজার ৬৫ লিটার, অকটেন ২৮ হাজার ৯৩৮ লিটার এবং পেট্রোল ৬০ হাজার ২ লিটার।
এদিকে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও শৃঙ্খলা আনতে ফিলিং স্টেশনভিত্তিক ‘ট্যাগ অফিসার’ নিয়োগ দিয়েছে সরকার। ঢাকা বিভাগে ১৩ জেলায় ৪৭৯ জন এবং মহানগরে ১১৬ জন কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করছেন। চট্টগ্রাম বিভাগে ১১ জেলায় ৩৩০ জন এবং মহানগরে ৬২ জন কর্মকর্তা নিয়োজিত রয়েছেন। এছাড়া রাজশাহী, খুলনা, রংপুর, বরিশাল, ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগেও একইভাবে কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। সরকারের ধারণা, এসব কর্মকর্তার নিবিড় তদারকির ফলে জ্বালানি বিতরণ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা বাড়বে এবং অনিয়ম কমবে।
অন্যদিকে, দেশের জ্বালানি চাহিদা পূরণ এবং সম্ভাব্য বৈশ্বিক সরবরাহ বিঘ্ন মোকাবিলায় মোট ২ লাখ ৬০ হাজার টন জ্বালানি তেল আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এর মধ্যে ১ লাখ টন অপরিশোধিত তেল এবং ১ লাখ ৬০ হাজার টন ডিজেল রয়েছে।
সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে এ প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে আগাম প্রস্তুতি হিসেবে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
জানা গেছে, আন্তর্জাতিক বাজার থেকে সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে অপরিশোধিত তেল সংগ্রহ করা হবে। পাশাপাশি ইন্দোনেশিয়া ও কাজাখস্তান থেকে ডিজেল আমদানির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। তবে হংকংসহ কয়েকটি উৎস থেকে তেল আমদানির কিছু প্রস্তাব বৈঠক থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে।
দাম অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত: সরকার জানিয়েছে, এপ্রিল মাসে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হচ্ছে না। সংশোধিত স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ নির্দেশিকা অনুযায়ী ডিজেলপ্রতি লিটার ১০০ টাকা, অকটেন ১২০ টাকা, পেট্রোল ১১৬ টাকা এবং কেরোসিন ১১২ টাকা অপরিবর্তিত থাকবে। এই দাম ১ এপ্রিল থেকে কার্যকর হবে।
এদিকে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম ডিলার্স, ডিস্ট্রিবিউটার্স, এজেন্ট অ্যান্ড পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন ফিলিং স্টেশনগুলোতে নিরাপত্তা জোরদার, সরবরাহে সামঞ্জস্য আনা এবং শৃঙ্খলা বজায় রাখাসহ আট দফা দাবি জানিয়েছে।
সংগঠনটির আহ্বায়ক সৈয়দ সাজ্জাদুল করিম কাবুল বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে পেট্রোল পাম্পগুলোয় অস্থিরতা তৈরি হয়েছে এবং কোথাও কোথাও হামলার ঘটনাও ঘটছে। তিনি বলেন, সরকার নির্ধারিত দামে জ্বালানি সরবরাহ অব্যাহত থাকলেও অতিরিক্ত চাহিদা পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে।
তিনি সাধারণ মানুষকে ‘প্যানিক বায়িং’ থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, প্রয়োজনের অতিরিক্ত জ্বালানি সংগ্রহ করলে সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ সৃষ্টি হয় এবং অন্যরা বঞ্চিত হতে পারেন।
পাম্প মালিকদের পক্ষ থেকে বলা হয়, জ্বালানি নিয়ে গুজব ও আতঙ্ক পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিত্তিহীন তথ্যের কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে অস্থিরতা বাড়ছে।
সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো বারবার আশ্বস্ত করেছে, দেশে জ্বালানির কোনো স্থায়ী সংকট নেই। তাই সবাইকে ধৈর্য ধরার পাশাপাশি সরকারি নির্দেশনা মেনে চলার আহ্বান জানানো হয়েছে।
সংগঠনটির নেতারা বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা একটি সাময়িক পরিস্থিতি। এ অবস্থায় সবাই যদি দায়িত্বশীল আচরণ করেন, তাহলে সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হবে।
সামগ্রিকভাবে সরকার একদিকে জ্বালানির পর্যাপ্ত মজুত নিশ্চিত করছে, অন্যদিকে অবৈধ মজুত ও বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি ঠেকাতে কঠোর নজরদারি চালাচ্ছে। পাশাপাশি ভবিষ্যৎ চাহিদা মোকাবিলায় আমদানি বৃদ্ধি এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় প্রযুক্তিনির্ভর তদারকি জোরদার করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব উদ্যোগ কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে জ্বালানি খাতে স্থিতিশীলতা বজায় থাকবে এবং সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলা সহজ হবে।
প্রিন্ট করুন











Discussion about this post