প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

অভিন্ন নদীতে অভিন্ন অধিকার

মো. আতিকুর রহমান : প্রতি বছর সেপ্টেম্বর মাসের শেষ রোববার উদযাপিত হয় বিশ্ব নদী দিবস। ১৯৮০ সাল থেকে প্রতি বছর সেপ্টেম্বর মাসের শেষ রোববার বিশ্ব নদী দিবস হিসেবে পালন করতে শুরু করে ব্রিটিশ কলম্বিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি। এরপর ২০০৫ সাল থেকে জাতিসংঘের বিভিন্ন সহযোগী সংস্থা দিবসটি পালন করছে। প্রকৃতপক্ষে জাতিসংঘ ২০০৫-২০১৫ সালকে ‘জীবনের জন্য পানি’ দশক হিসেবে চিহ্নিত করে এবং তার অংশ হিসেবে জাতিসংঘ বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্ব নদী দিবস পালনে অগ্রণী ভূমিকা নেয়। প্রসঙ্গত আমাদের একুশে ফেব্রুয়ারিও এভাবে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে পরিণত হয়েছে।

দিবসটি আমাদের মতো নদীমাতৃক দেশের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কেননা প্রাকৃতিকভাবে ‘নদীমাতৃক’ হলেও সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে আমরা নিজেদের নদীবৈরী জনগোষ্ঠী হিসেবে ইতোমধ্যে প্রমাণ করেছি। দুর্ভাগ্যজনকভাবে এ দেশের বুক চিরে বয়ে যাওয়া নদীগুলো আঞ্চলিক রাজনীতি এবং বহুজাতিক পুঁজির সর্বনাশা সম্প্রসারণেরও শিকার হয়েছে। বাংলাদেশের সব নদীর উৎস ভারতের পাহাড়-পর্বত। পর্বত-পাহাড় থেকে বয়ে আসা পানি নদী দিয়ে বঙ্গোপসাগরে গিয়ে মিশে সমুদ্রের লবণাক্ত পানিকে ঠেলে সমুদ্রের দিকে নিয়ে আমাদের জীব-বৈচিত্র্যকে রক্ষা করে আসছে হাজার বছর ধরে। নদীমাতৃক আমাদের এই দেশ মায়ের কোলে যেমন শিশুর অবস্থান, তেমনি নদীর কোলে বাংলাদেশের অবস্থান। প্রকৃতিগতভাবেই নদীর ধর্ম হলো নদী বহমান। কোনো সীমারেখা দিয়ে নদীকে আটকানো যায় না। নদীর কোনো দেশ নেই, নদীর কোনো সীমানা নেই। কিন্তু বিভিন্ন সময় সাম্রাজ্যবাদী শক্তি এবং পরাশক্তিগুলো আন্তর্জাতিক নদী আইন অমান্য করে নদীর প্রাকৃতিক বহমানতাকে বাধাগ্রস্ত করছে। নদী নিঃস্বার্থভাবে মানুষের উপকার করলেও মানুষই নদীকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

ভারত, নেপাল, চীন (তিব্বত) ও বাংলাদেশের আড়াই হাজার কিলোমিটার নিয়ে বিস্তৃত গঙ্গা ৫০ কোটি মানুষের জীবিকার উৎস। পৃথিবীর জনসংখ্যার ৮ ভাগের ১ ভাগ এই নদীর ওপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশের জনসংখ্যার ৪১ শতাংশ গঙ্গার পানির ওপর নির্ভরশীল। গঙ্গা নদী থেকে বাংলাদেশের মোট প্রবাহিত মিঠা পানির ১৮ শতাংশ আসে। ব্রহ্মপুত্র থেকে দেশের ভূপৃষ্ঠের পানি প্রবাহের ৬৭ শতাংশ এবং মেঘনার মাধ্যমে ১৫ ভাগ আসে। ভাটির দেশ বাংলাদেশের উজানে ৫৪টি নদীর উৎস হচ্ছে ভারত। বর্তমানে ভারত থেকে বাংলাদেশে আগত প্রত্যেকটি আন্তর্জাতিক নদীতে হয় বাঁধ নির্মাণ করে জলবিদ্যুৎ প্রকল্প গড়ে তুলছে অথবা কৃত্রিম খাল খনন করে পানি সরিয়ে নিচ্ছে। ফলে শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশের নদ-নদীগুলোয় পরিমাণমতো পানি থাকে না। আবার বর্ষা মৌসুমে অতিরিক্ত পানিতে বানে ভাসে এদেশের মানুষ। ভারত ইতোমধ্যে দৃশ্যমান নদ-নদীগুলোর ওপর প্রায় ১৩ হাজার ৬০০টি বাঁধ বেঁধে ফেলেছে। আরও ১ হাজার বাঁধের নির্মাণে কাজ চলছে পুরোদমে।

গঙ্গা পরিস্থিতি: ভারত অনেক আগ থেকেই গঙ্গায় বৃহদাকার ৩টি খাল প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। এর মধ্যে আপারগঙ্গা ক্যানাল প্রজেক্ট, মধ্যগঙ্গা ক্যানাল প্রজেক্ট এবং নিন্মগঙ্গা ক্যানাল প্রজেক্ট। এ ধরনের প্রকল্পের হাজার হাজার কিলোমিটার খালের মাধ্যমে প্রদেশের ২৫ লাখ একর জমিতে সেচ দেয়া হচ্ছে। উৎসমুখে গঙ্গার অন্যতম প্রদায়ক নদী ভাগীরথীর ওপর ভারত তেহরী বাঁধ নির্মাণ করেছে। গঙ্গার আরেক উৎস কর্ণালী নদীর ওপর ভারতের অর্থ সহায়তা ও প্রয়োজনে নেপালে ১টি বড় আকারের বাঁধ ও পানি বিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপন করা হয়েছে। গঙ্গার উৎস রামগঙ্গা, ঘাগরা, কোশি ও গন্ডক নদীতে বহুমুখী প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে।

ব্রহ্মপুত্র পরিস্থিতি : ব্রহ্মপুত্রের অন্যতম উৎস ও প্রদায়ক রাঙ্গা নদীর ওপর ভারত বাঁধ নির্মাণ করেছে। ব্রহ্মপুত্রে পানির প্রবাহ  হ্রাস পাওয়া এর অন্যতম কারণ। আসামে ব্রহ্মপুত্রের অন্যতম উৎস পাগলাদিয়ায় একটি বিশাল বাঁধ নির্মাণ করেছে ভারত। যার ফলে বাংলাদেশের ব্রহ্মপুত্র-যমুনা অংশে পানির সংকট হচ্ছে। এছাড়া ব্রহ্মপুত্রের লাংপি, রাইডাক, কপিলি প্রভৃতি নদীর ওপর বাঁধ ও রিজার্ভার নির্মাণ করেছে।

তিস্তা-মহানন্দার পরিস্থিতি : পশ্চিমবঙ্গের শিলিগুড়ি থেকে ২৫ কিলোমিটার দূরে গাজলডোবা নামক স্থানে তিস্তা নদীর ওপর যথারীতি একটি ব্যারাজ নির্মাণ করেছে, যা বৃহৎ একটি সেচ প্রকল্প হিসেবে কাজ করছে। বাংলাদেশের তেঁতুলিয়া সীমান্তের পশ্চিম-উত্তর কোণে মহানন্দা নদীর ওপর বিশাল একটি বাঁধ নির্মাণ করেছে ভারত।

সাত হাজার কিলোমিটার লম্বা পৃথিবীর দীর্ঘতম নদী নীল নদ তিন মিলিয়ন বর্গকিলোমিটার অববাহিকা তৈরি করেছে। যেখানে ১৫০ মিলিয়ন মানুষের বাস। বুরুন্ডি, কঙ্গো, মিসর, ইনিত্রিয়া, কেনিয়া, ইথিওপিয়া, রুয়ান্ডা, সুদান, তানজানিয়া, উগান্ডার মতো ১০টি রাষ্ট্র এই নদীর পানি ব্যবহার করে। আর আমাদের মাত্র ২টি রাষ্ট্র ৫৪টি অভিন্ন নদীর বিষয়ে কোনো কার্যকর সিদ্ধান্ত নিতে পারছি না।

পৃথিবীর অনেক বড় নদীই একাধিক দেশের অভ্যন্তর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। নদীর পানি বণ্টন নিয়ে দ্বিপক্ষীয়-বহুপক্ষীয় বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য ১৯৬৬ সালে হেলসিংকীতে গৃহীত হয়েছে আন্তর্জাতিক আইন বা নীতিমালা। নীতিমালার ৪ ও ৫ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, প্রতিটি অববাহিকাভুক্ত দেশ, অভিন্ন নদী ব্যবহারের ক্ষেত্রে অন্য দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রয়োজন অবশ্যই বিবেচনা করবে। একই কথা বলা হয়েছে ১৯৯৭-এ গৃহীত জাতিসংঘের নদী কনভেনশনের(UN Convention on the Law of Nevigational Uses of International Water Courses) ১২ নম্বর অনুচ্ছেদে। কিন্তু বাংলাদেশে প্রবাহিত নদীগুলোর উজানে ভারত সরকার নিজস্ব বাণিজ্যিক প্রয়োজনে বাঁধ নির্মাণের ক্ষেত্রে এসব নীতিমালা কোনোভাবেই গ্রাহ্য করছে না।

প্রত্যেক দেশ তাদের ভৌগোলিক অবস্থান, জনগণের আশা-আকাক্সক্ষা এবং নিজ স্বার্থের দিকে লক্ষ্য রেখে পানি আইনগুলো তৈরি করে; এ কারণে অভিন্ন নদ-নদী এবং পানির উৎসগুলোর পানি ব্যবস্থা নিয়ে বিভিন্ন দেশের মধ্যে সমঝোতা অনেক ক্ষেত্রেই বাধার সম্মুখীন হয়। বর্তমানে কিছু আন্তর্জাতিক আইন রয়েছে, সেগুলো আন্তঃসীমান্ত পানি বিরোধ মেটাতে পারছে না। কেননা প্রত্যেক দেশই নিজের স্বার্থ রক্ষার ক্ষেত্রে এতটাই দৃঢ় প্রতিজ্ঞ যে, এ কাজ করতে গিয়ে তারা অন্যের অধিকার খর্ব করলেও সে ব্যাপারে তাদের কোনো মাথাব্যথা থাকে না। তাই এ ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট আন্তর্জাতিক আইন থাকা জরুরি।

পানি যেহেতু নির্দিষ্ট কোনো দেশের ভৌগোলিক অঞ্চলের একক সম্পদ নয় তাই এর ব্যবহারের অধিকার, গতিপথের আশপাশের এলাকায় বসবাসকারী প্রতিটি মানুষেরই রয়েছে। ভাটির দেশ হিসেবে আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস কেবল গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা নয়, উজান ভাটির সব অভিন্ন নদী জীবনের রক্তাক্ত আখ্যান বিবেচনা করবে, নিশ্চিত করবে অভিন্ন জলধারার ন্যায্য সুরা।

মুক্ত লেখক

সাকরাইল, গড়পাড়া, মানিকগঞ্জ

[email protected]