প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

অভিভাবকের মানসিকতা শিশুর মানসিক বিকাশে কতটা সহায়ক?

মেজবাহ হোসেন: পেশা বা বৃত্তি নির্বাচন মানবজীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অনুষঙ্গ। বেঁচে থাকতে হলে জীবিকা নির্বাহ করতে হবে আর জীবিকা নির্বাহের জন্য প্রয়োজন অর্থের, যা আসে কর্ম বা পেশার মাধ্যমে। পশ্চিমা বিশ্বের উন্নত দেশগুলোয় ছেলেমেয়েদের প্রায় ১৬ বছর পর্যন্ত শুধু দেখার ও জানার সুযোগ দেয়া হয়। এতে শিশুরা পছন্দের বিষয় আর পেশা সঠিকভাবে নির্বাচন করতে শিখে। তারপর ১৮ বছর বয়সে বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে নিজের পছন্দের বিষয়ে পড়ালেখা করে নিজেকে ওই বিষয়ে অভিজ্ঞ ও পারদর্শী করে গড়ে তোলে। ব্যস, এভাবেই শারীরিক ও মানসিক চাপমুক্ত, আপন ছন্দে বিকশিত একটি সমৃদ্ধ জাতি গড়ে ওঠে। মূল ধারার বিষয়ের বাইরে সংগীত, নৃত্য, যন্ত্রসংগীত প্রভৃতিও ব্যাপক জনপ্রিয় সেখানে। বিপরীতে আমাদের সমাজের চিত্র সম্পূর্ণ আলাদা ও অযৌক্তিক। এখানে সন্তানদের বেড়ে তোলা হয় চাপিয়ে দেয়া সিদ্ধান্তে বা পরিবেশে। বড় হয়ে সে কী হবে, কেমন বিশ্ববিদ্যালয়ে- কোন বিষয়ে পড়বে, প্রেমের মতো খুব প্রাকৃতিক একটি বিষয়ে জড়াবে কি না, এমনকি কোন বয়সে ও কাকে বিয়ে করবে সেসব কিছুই নির্ধারণ করার সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ মা-বাবা। এ চাপিয়ে দেয়া সংস্কৃতির প্রথমটি হচ্ছে আমার সন্তানর বড় হয়ে কী হবে, চিকিৎসক নাকি প্রকৌশলী? টেনেটুনে ইন্টারমিডিয়েট বা বড়জোর বিএ পাস করা একজন অভিভাবক যিনি বর্তমান যুগ, সমাজ ব্যবস্থা, শিক্ষা ব্যবস্থা বা কোন পেশার কী প্রাপ্তি বা অপ্রাপ্তি, সুযোগ বা সংকট এসব বিষয়ে পর্যাপ্ত ও প্রয়োজনীয় জ্ঞান রাখেন না। তিনিও চোখ বন্ধ করে খুব দৃঢ়তার সঙ্গেই সন্তানের মাথায় এটি ঢুকিয়ে দিতে সমর্থ হন যে, তাকে বড় হতে হলে কেবল  চিকিৎসক বা প্রকৌশলীই হতে হবে; যদিও তার ছেলে অঙ্ক করতে বসলেই চোখে সরষে ফুল দেখে অথবা মেয়েটা খুব সামান্য তেলাপোকা দেখেই সংজ্ঞা হারানোর উপক্রম হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মা-বাবারা তাদের ব্যর্থতা বা অপ্রাপ্তিগুলোকে ছেলেমেয়েদের মাধ্যমে পূরণ করার যুদ্ধে নেমে এ কথা বেমালুম ভুলেই যায় তার সন্তান তার দ্বিতীয় জন্ম নয় বরং সে এক সম্পূর্ণ ভিন্ন সত্তা; যার স্বপ্ন, সাধ, আকাক্সক্ষা বা সক্ষমতা ভিন্ন হবে সেটিই স্বাভাবিক।

ছাত্রজীবনে আমার সহপাঠী থেকে শুরু করে শিক্ষকতায় এসে আমার বেশ কিছু শিক্ষার্থীকে জানি যারা শুধু চিকিৎসক না হতে চাওয়ায় তাদের অভিভাবকরা তাদের চৌদ্দ পুরুষের জীবনে কার কী পাপ ছিল সেসব তন্নতন্ন করে খোঁজ করা, তাদের জীবন, সন্তানদের জš§ দেয়া ও এত এত কষ্ট করে সন্তানদের মানুষ করা সবই বিফল ও সৃষ্টিকর্তার অভিশাপ মনে করে কাঁদতে কাঁদতে মূর্ছা যাওয়ার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি করে ছেলে-মেয়েকে মেডিকেলে পড়তে বাধ্য করে তারপর দানাপানিতে হাত দিয়েছেন। এভাবে নিজের আকাক্সক্ষাকে ছেলেমেয়ের মাধ্যমে পূরণ করতে গিয়ে কোনো ব্যত্যয় ঘটলে আমাদের সমাজে মা-বাবা ছেলেমেয়েকেই সব থেকে বড় শত্রু হিসেবে পরিগণিত করতে দুইবার ভাবেন না। চিকিৎসা বা প্রকৌশল বিদ্যা পড়া শেষে সন্তান বিসিএস পরীক্ষা দেবে কি না বা কতটা সিরিয়াসলি দেবে সেই সিদ্ধান্ত ও বাবা-মায়ের। সবচেয়ে বড় এবং মেগা শো চলে আসে সন্তানের বিয়ের সময়। সন্তান নিজের পছন্দে বিয়ে করতে চাইলে বা বাবা-মায়ের পছন্দের পাত্র-পাত্রীকে বিয়ে করতে অস্বীকৃতি জানালে তারা খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে দেয়া, কথা বন্ধ করা, কৃত্রিম উপায়ে রক্তচাপ বাড়িয়ে ফেলা, ত্যাজ্য করা, সম্পর্ক শেষ করা এমনকি এক সপ্তাহ আগে কব্জি ডুবিয়ে গরুর মাংস খাওয়া মানুষটিও হঠাৎ বুকে ব্যথা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার মতো জীবন মানে জি বাংলা শো আমাদের চারপাশে অহরহ ঘটতে দেখা যায়। শিক্ষকতার কল্যাণে একজন অভিভাবকের (মা) সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ হয়েছিল; যিনি তার প্রাপ্তবয়স্ক ছেলেকে যেকোনো ফোন কলে তার সামনে লাউড স্পিকারে কথা বলতে রীতিমতো অভ্যস্তই করে ফেলেছেন শুধু এটি নিশ্চিত করার জন্য যে ছেলে বিশেষ কারো সঙ্গে বিশেষ কোনো আলাপ করে কি না? অতটুকু ভাবনা তার মাথায় নেই যে দ্বার বন্ধ করে ‘নেতিবাচক’ কর্মকাণ্ড হয়তো ঠেকানো যায় কিন্তু সত্য, শিক্ষা বা অভিজ্ঞতা অর্জনের পথও রুদ্ধ হয়ে যায়। আজকাল ছেলেমেয়েদের ওয়ান টাইম রকমের সম্পর্ক অবশ্যই সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় ও মারাত্মক ক্ষতিকর; তবে এভাবে সন্তানদের গৃহবন্দি বা নজরবন্দি করে বড় করাটাও কোনো গ্রহণযোগ্য উপায় নয়। এর ফলে সমাজের শিক্ষা, অভিজ্ঞতা, যেকোনো পরিস্থিতিতে নিজেকে কীভাবে খাপ খাইয়ে চলতে হয়, খারাপগুলোকে পাশ কাটিয়ে কীভাবে সঠিক পথে চলতে হয় সেই জ্ঞান সে কোনোভাবেই অর্জন করতে সক্ষম হবে না। হোম ট্রেইন্ড পোষা প্রাণীর আদলে একটি কাস্টমাইজড পরিবেশে সন্তানদের বড় করার ফলে জীবন যুদ্ধে টিকে থাকার জন্য পর্যাপ্ত শারীরিক ও মানসিক প্রতিরোধক্ষমতা তার থাকবে না, ফলে যেকোনো কঠিন পরিস্থিতিতে সে আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নিতে পারে; যা কখনই মঙ্গলজনক নয়।

তুখোড় মেধাবী একটি তরুণ কীভাবে মায়ের একের পর এক অন্যায্য ও বাহুল্য আবদার মেটাতে গিয়ে জীবনের প্রতি বিরক্ত ও বীতশ্রদ্ধ হয়ে নিজের ভবিষ্যৎকে নষ্ট করে দেয় এমন একটি চমৎকার গল্প নিয়ে ভারত-বাংলার একটি সিনেমা আছে (ইচ্ছে); আমার দেখা হাতেগোনা সিনেমাগুলোর মধ্যে যেটি খুবই বাস্তব ও শিক্ষণীয় একটি বলে মনে হয়েছে। সমাজের প্রচলিত রীতি বা ভ্রান্ত অনুশাসনের বাইরে গিয়ে এমন অসাধারণ ও ইউনিক গল্প নিয়ে মুভি বানানোর সুনিপুণ দক্ষতার জন্য ভারতীয় পরিচালক, প্রযোজকদের খ্যাতি কারও অজানা নয়। বিপরীতে আমাদের মিডিয়াপাড়ায় এমন একটি মুভি বানানো তো দূরের কথা; আমাদের বুদ্ধিজীবীদের কাছেও সমাজের এসব অসঙ্গতিগুলোকে সামাজিক সমস্যা বলে মনে হয় কি না তা নিয়েও সন্দেহ আছে।

আজকাল শহুরে অনেক মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত পরিবারের মা-বাবারা সন্তানদের পাশ্চাত্য ধাঁচে নাচ গান শেখাতে ভীষণ ব্যস্ত শুধু নিজের পরিবারকে ধর্মনিরপেক্ষ বা মননশীল প্রমাণের জন্য। এই নাচ গান শেখার ব্যাপারে সন্তানদের আগ্রহ থেকে বাবা মায়ের আবদারই যেন বেশি। ইংলিশ মিডিয়াম/ ভার্সন বা নামকরা কোন স্কুলে পড়া, সারাদিন ৩-৪টি কোচিং বা স্যারের বাসায় পড়তে যাওয়া, সাপ্তাহিক, পাক্ষিক ও মাসিক কুইজ/টেস্ট সামলে নাচ-গানের টিউশন নেয়ার সময় বা অবসর কোথায় শিশু-কিশোর সন্তনের। বরং তারা চায় সমবয়সী কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে একটু খেলাধুলা করতে বা হইচই করে আড্ডা দিতে, যা তাকে পরের দিন পুনরায় জীবন যুদ্ধে নামার জন্য শক্তি জোগাবে। কিন্তু  ‘ভাই/ভাবি, আপনার বাচ্চাটা কত্ত সুন্দর নাচে/গায়- আমার বাবুটা যদি একটু ওরকম হতো!’ শুধু এইটুকু শোনার লোভে সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে ওদের মনের কথা বোঝার ফুসরত পায় না আমাদের অভিভাবকেরা। এমনকি যে মা তার ছেলে/মেয়েকে বাসার বাইরে যেতে দেন না শুধু পড়ার ক্ষতি হবে বলে; স্কুলের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতার পর তিনিও সন্তানকে কথা শোনান যে অমুকের ছেলে/মেয়ে কতগুলো পুরস্কার পেল আর তুই একটিও পাইলি না; আমি কি ভাত-মাছ কারও থেকে কম খাওয়াই? এই যে পরস্পরবিরোধী দুটি লজিক শিশুটি তখন খণ্ডাতে না পারলেও তার মনোজগতে যে লজিকাল ড্যামেজ তৈরি হয়; তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এই অতি রকম ভালো চাওয়া বা আমার সন্তান শুধুই ভালো করবে এমন মানসিকতা ততটাই ক্ষতিকর যেমনটা ক্ষতি করে অসুস্থ হওয়ার আগেই ওষুধ সেবন করা যাতে সে কোনো দিনই অসুস্থ না হয় বা প্রয়োজনের থেকে একটু বেশি পাওয়ারের একটি চশমা ব্যবহার করা; এরকম বেশি ভালো কখনই ভালো নয়, এগুলো শুধুই ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে। শৈশব, কৈশোর, যৌবন বা বার্ধক্য জীবনের প্রতিটি ধাপই অনেক গুরুত্বপূর্ণ এবং এর প্রতিটি ধাপ আমাদের পরবর্তী ধাপের জন্য উপযুক্ত করে গড়ে তোলে। যে বাচ্চাটির শৈশব ও কৈশোর স্বাধীনভাবে বিকশিত হতে না দিয়ে আপনি রিমোট কন্ট্রোলের মতো করে পরিচালনা করেছেন হঠাৎ করেই যৌবনে পা দিয়ে সেই ছেলে-মেয়েটি তার সব দায়-দায়িত্ব, কর্তব্য সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে পালন করবে সেটি প্রত্যাশা করেন কীভাবে? যার ফলে আমাদের অনেক ছেলেমেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীন পরিবেশে যাওয়ার পর আর নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না; জড়িয়ে পরে ধূমপানে, মাদকে, বস্তা পচা রাজনীতির মোড়কে মারামারি, হানাহানি, চাঁদাবাজিতে এমনকি খুনোখুনি করতেও কোনো দ্বিধা করে না। কী লাভ যদি আপনার সন্তান বুয়েটে যেয়েও খুনি হয় বা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েও মাদকাসক্ত হয়? সব দোষ কি শুধুই আদর্শহীন ছাত্র রাজনীতির যেখানে পছন্দটা ছিল তার একান্তই নিজের? আদরের সন্তানের কোমল, নরম, সত্য ও সুন্দর মনটাকে যান্ত্রিক করে গড়ে তুলে যৌবনের যন্ত্র মানবটার কাছে বিবেক আর মানবিক গুণাবলি আসা না করে বরং বাচ্চাকে নিয়ে বিকালে একটু ঘুরতে বের হন, শুধু বুয়েট বা মেডিকেলে পড়া কোনো ভাইয়াকে না দেখিয়ে রাস্তার পাশে বসে সিগারেট খাওয়া বখাটে কিশোরদেরকেও চিনতে শেখান, বৃদ্ধাশ্রমের বারান্দায় অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকা বুড়ো মানুষগুলোকে নিয়েও তাকে বলুন; চিপস, আইসক্রিম বা দশ টাকার ঝালমুড়ি খেতেখেতে অবচেতন মনেই জীবনের সব থেকে দামি আর প্রয়োজনীয় শিক্ষাটা সে আপনার হাত ধরেই অর্জন করবে।  

একটি সুন্দর সমাজ গঠনের জন্য রাজনৈতিক ও সামাজিক সংস্কার অবশ্যই প্রয়োজন, তবে সর্বাগ্রে আমাদের পারিবারিকভাবে চর্চিত রীতিনীতি ও অনুশাসনের পুনর্গঠন দরকার। অন্যথায়, একটি দুর্বল ও ভঙ্গুর মানসিকতাসম্পন্ন যুব সমাজ ছাড়া আর কিছুই পাব না; যাদের থাকবে না পর্যাপ্ত বাস্তব জ্ঞান, যেকোনো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার কৌশল বা মানসিক শক্তি।

শিক্ষক, রসায়ন বিভাগ, হাবিপ্রবি

(বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে অধ্যয়নরত)

[email protected]