প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

অযোগ্য ঠিকাদার-পরামর্শকে নির্মাণ হচ্ছে কর্ণফুলী টানেল!

 

display-1

ইসমাইল আলী: চট্টগ্রাম শহরের সঙ্গে জেলার দক্ষিণাংশের দূরত্ব কমাতে কর্ণফুলী নদীর তলদেশে নির্মাণ করা হবে দেশের প্রথম টানেল। চীনের অর্থায়নে জিটুজি ভিত্তিতে এটি নির্মাণ করবে চায়না কমিউনিকেশন কনস্ট্রাকশন কোম্পানি (সিসিসিসি) লিমিটেড। যদিও প্রতিষ্ঠানটি বিশ্বব্যাংকের কালো তালিকাভুক্ত। এ কারণে পদ্মা সেতু প্রকল্প থেকেও বাদ পড়েছিল সিসিসিসি। আবার টানেলের পরামর্শক হিসেবে কাজ করছে হংকংয়ের ওভিই অরূপ অ্যান্ড পার্টনারস। যদিও দরপত্রের শর্তের কারণেই প্রতিষ্ঠানটি অযোগ্য।

কর্ণফুলী টানেল নির্মাণে যৌথভাবে সম্ভাব্যতাও যাচাই করে সিসিসিসি ও অরূপ। আবার টানেলের নকশাও প্রণয়ন করছে সিসিসিসি নিজেই। ফলে টানেল নির্মাণের পুরো প্রক্রিয়া নিয়েই রয়েছে রহস্য।

তথ্যমতে, কর্ণফুলী টানেলের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে ২০১১ সালে নিয়োগ করা হয় পরামর্শক। যদিও সে বছরই সিসিসিসিকে কালো তালিকাভুক্ত করে বিশ্বব্যাংক। ফিলিপাইনের সড়ক প্রকল্পে দুর্নীতির দায়ে সিসিসিসি ছাড়াও আরও পাঁচ প্রতিষ্ঠান ও এক ব্যক্তিকে কালো তালিকাভুক্ত করা হয়। আট বছরের জন্য এ কালো তালিকাভুক্তি ২০০৯ সালের ১২ জানুয়ারি থেকে কার্যকর করে বিশ্বব্যাংক।

যাচাই-বাছাই শেষে কর্ণফুলী নদীর মোহনায় কাফকো-পতেঙ্গা পয়েন্টে টানেলটি নির্মাণের সুপারিশ করে সিসিসিসি ও অরূপ। এটি নদীর পশ্চিম পাশে সি বিচের নেভাল গেট পয়েন্ট থেকে নদীর ১৫০ ফুট নিচ দিয়ে অপর পাশে গিয়ে উঠবে। ২০১৩ সালে এর চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়। সে সময়ই জিটুজি ভিত্তিতে চীনের অর্থায়নে টানেলটি নির্মাণে আগ্রহ প্রকাশ করে সিসিসিসি। এর ভিত্তিতে ২০১৪ সালে চূড়ান্ত প্রস্তাব দেয় প্রতিষ্ঠানটি। আর ২০১৫ সালের জুনে সিসিসিসির চূড়ান্ত চুক্তি সই করা হয়।

সূত্র জানায়, ২০১০ সালে পদ্মা সেতু নির্মাণে দরপত্র আহ্বান করা হবে ২০টি প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়। এর মধ্যে ১০টি প্রতিষ্ঠানকে প্রাথমিকভাবে বাছাই করা হয়। আর পাঁচটি প্রতিষ্ঠানকে চূড়ান্ত বাছাই করা হয়। এর মধ্যে ছিল সিসিসিসি। তবে বিশ্বব্যাংকের কালো তালিকাভুক্তির কারণে প্রতিষ্ঠানকে পদ্মা সেতু প্রকল্পের জন্য অযোগ্য ঘোষণা করা হয়। ফলে ২০১৩ সালে পদ্মা সেতু নির্মাণে চূড়ান্ত প্রস্তাব জমা দিতে পারেনি সিসিসিসি।

এদিকে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস (পিপিআর) অনুযায়ী সম্ভাব্যতা যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান কোনো প্রকল্পে ঠিকাদার হিসেবে কাজ করতে পারে না। এরপরও সিসিসিসিকে ঠিকাদার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। যদিও টানেল নির্মাণে ব্যয় অনেক বেশি প্রস্তাব করে সিসিসিসি। সম্ভাব্যতা যাচাই শেষে টানেলটি নির্মাণে ব্যয় ধরা হয় পাঁচ হাজার ৬০০ কোটি ৪০ লাখ টাকা। অথচ পরে একই প্রতিষ্ঠান ব্যয় বাড়িয়ে প্রস্তাব করে আট হাজার ৪৪৬ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। এ মূল্যেই টানেল নির্মাণে সিসিসিসির সঙ্গে বাণিজ্যিক চুক্তি সই করে সেতু বিভাগ।

টানেল নির্মাণ তদারকিতে মূল পরামর্শক হিসেবে কাজ করবে অস্ট্রেলিয়ার স্ম্যাক ইন্টারন্যাশনাল ও ডেনমার্কের সিওডব্লিউআই। এদের সহযোগী হিসেবে থাকছে ওভিই অরূপ অ্যান্ড পার্টনারস এবং বাংলাদেশের তিন প্রতিষ্ঠান এসিই কনসালট্যান্ট, ডেভেলপমেন্ট কনসালট্যান্ট ও স্ট্র্যাটেজিক কনসালটিং কোম্পানি লিমিটেড। ২৯১ কোটি টাকার এ চুক্তির মেয়াদ ৬০ মাস।

যদিও পরামর্শক হিসেবে দ্বিতীয় সর্বনিম্ন দরদাতা ছিল এ প্রতিষ্ঠানগুলো। এছাড়া পরামর্শক নিয়োগে মানা হয়নি দরপত্রের শর্ত ও পিপিআর। রিকোয়েস্ট ফর প্রোপোজালের (আরএফকিউ) ৯ অনুচ্ছেদে কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট অংশে শর্ত ছিল, কোনো প্রতিষ্ঠান প্রকল্পটিতে প্রাথমিকভাবে পণ্য বা সেবা সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এর পরামর্শক হিসেবে কাজ করতে পারবে না। আবার কোনো পরামর্শককে পণ্য বা সেবা সরবরাহে ভাড়া (হায়ার) করা হলে ওই প্রতিষ্ঠানও পরামর্শক হিসেবে কাজ করতে পারবে না।

পিপিআরেও একই ধরনের শর্ত রয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার কথা বিবেচনায় দরপত্র ও পিপিআরের শর্ত লঙ্ঘন করেই অরূপ অ্যান্ড পার্টনারসকে সহযোগী হিসেবে নেওয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে দরপত্রে অংশ নেওয়া প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠান আপত্তি তুললেও তা মানা হয়নি।

এ প্রসঙ্গে কর্ণফুলী টানেলের প্রকল্প পরিচালক ইফতেখার কবির শেয়ার বিজকে বলেন, ‘টানেলের সম্ভাব্যতা যাচাই করেছিল সিসিসিসি ও অরূপ। তারা কীভাবে এ প্রকল্পের ঠিকাদার ও পরামর্শক হলো তা সেতু বিভাগের প্রধান প্রকৌশলী বলতে পারবেন। কারণ তার দায়িত্বকালেই এসব নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। আর আমি দায়িত্ব নিয়েছি কয়েক দিন আগে, তাই এ বিষয়ে কোনো ধারণা নেই।’

জানতে চাইলে সেতু বিভাগের প্রধান প্রকৌশলী কবির আহমেদ বলেন, সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের অনুমোদনের ভিত্তিতে জিটুজি ভিত্তিতে টানেলের ঠিকাদার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। পরামর্শক নিয়োগও আইএমইডির মতামত নেওয়া হয়েছে। এছাড়া পরামশর্ক নিয়োগ প্রস্তাব ক্রয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে অনুমোদন করা হয়েছে। তাই এক্ষেত্রেও কোনো সমস্যা থাকার কথা নয়।

সূত্র জানায়, গত বছর জুনে প্রকল্পটির নির্মাণচুক্তি সই হলেও এখনও অর্থায়ন প্রক্রিয়া ঝুলে আছে। গত অক্টোবরে চীনের প্রেসিডেন্টের ঢাকা সফরের সময় প্রকল্পটির ঋণচুক্তিও সই হয়। তবে এ চুক্তি এখনও কার্যকর হয়নি। এতে টানেলের নির্মাণপ্রক্রিয়া শুরু করা যাচ্ছে না।

টানেলটি নির্মাণে চায়না এক্সিম ব্যাংক ২০ বছর মেয়াদি ঋণ দেবে, যার গ্রেস পিরিয়ড থাকবে পাঁচ বছর। আর লন্ডন আন্তব্যাংক অফার রেটের (লাইবর) সঙ্গে ২ শতাংশ যোগ করে যে হার পাওয়া যায়, তা হবে ঋণের সুদহার। এছাড়া ১ শতাংশ ম্যানেজমেন্ট ফি ও ২ শতাংশ কমিটমেন্ট ফি পরিশোধ করতে হয়। সব মিলিয়ে সাড়ে তিন থেকে চার শতাংশ হারে সুদ দিতে হবে, যা কঠিন শর্তের ঋণ। এর পরও ঋণ কার্যকর না হওয়ায় কাজ শুরুতে বিলম্বের কারণে প্রকল্প ব্যয় বেড়ে যেতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।