দিনের খবর মত-বিশ্লেষণ

অর্থনীতিকে সচল রাখতে পর্যটনকে এগিয়ে নিতে হবে

বৈশ্বিক মহামারি করোনাভাইরাসে জর্জরিত প্রতিটি দেশ। থামছে না যেন মৃত্যুর মিছিল। লকডাউন আর কতকাল? দুই বেলা আহারের তাগিদে বেরিয়ে পড়ছেন  মানুষ কর্মস্থলে। কর্মহীনতায় ভুগছেন কোটি কোটি মানুষ। চাকরি হারিয়েছেন লক্ষাধিক মানুষ। জীবিকার তাগিদে যেন নতুন নতুন কর্মসংস্থান গড়ে ওঠে চলেছে। গার্মেন্টস, ফ্যাক্টরি, যানবাহন, ছোট-বড়, ক্ষুদ্র মাঝারি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান যেখানে অচলাবস্থা, সেখানে ক্ষতির পরিমাণ সব থেকে বেশি যেন ‘ভ্রমণ ও পর্যটন শিল্পে।  বিশ্বে পর্যটনশিল্পে এক অপার সম্ভাবনার নাম বাংলাদেশ। এ দেশের প্রাকৃতিক রূপবৈচিত্র্য পৃথিবীর অন্য দেশ থেকে অনন্য ও একক বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত। প্রাকৃতিক অপরুপ লীলাভূমির দেশ বাংলাদেশ।’ 

কভিড-১৯ এর কারণে পর্যটনশিল্পও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যেখানে যুক্ত রয়েছে প্রতিটি সেক্টর। যানবাহন থেকে শুরু করে খাবার-দাবার পর্যন্ত। সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে, কভিড-১৯ মোকাবিলায় পর্যটন শিল্পের যেন দুরবস্থা। পর্যটন স্থানগুলোতে কিছুদিন আগে যেমন ছিল না ভ্রমণপিপাসুদের আনাগোনা তেমনই থেমে গিয়েছিল অর্থনীতির উন্নয়নের ধারা। ছিল না মানুষের আয়-রোজগারের ব্যবস্থা। ট্যুর অপারেটর, ট্রাভেল এজেন্সি, হোটেল, মোটেল, রিসোর্ট, গেস্ট হাউজ, রেস্তোরাঁ, এয়ারলাইনস, ট্যুরিস্ট কোচ, ট্যুরিস্ট শিপ এজেন্সি, ট্যুরিস্ট গাইডিং এজেন্সি, স্ট্রিট ফুড, কমিউনিটি বেইজড ট্যুরিজমের হোম-স্টে সংশ্লিষ্ট বাংলাদেশের ৪০ লাখ মানুষ জড়িত। আজ তারা কর্মহীনতায় ভুগছে। ১ কোটি ৫০ লাখ মানুষের জীবিকা নির্ভর করে ভ্রমণ ও পর্যটন শিল্পের ওপর। 

ডাব্লিউটিটিসির রিপোর্ট অনুযায়ী, বৈশ্বিক মহামারিতে ৫০ মিলিয়ন চাকরি হ্রাস হবে। পর্যটনশিল্প বন্ধ থাকার কারণে। ধারণা করা হচ্ছে, এশিয়ার দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ইউএনটিসি অনুমান করেছে ২০২০ সালে আন্তর্জাতিক পর্যটকদের সংখ্যা ২০ শতাংশ থেকে ৩০ শতাংশ কমে যাবে। ক্ষতিগ্রস্ত হবে ৩০০ বিলিয়ন থেকে ৪৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।

বাংলাদেশ পর্যটকদের মন কেড়েছে বহুকাল আগে থেকে। ভ্রমণপিপাসুদের মনের খোরাক মেটায়। মানসিক অবসাদ দূর করে। অবসর সময়ে সুন্দর মনোরম পরিবেশ উপভোগ করতে ছুটে যায় শহরের যানজট থেকে দূরে। সাজেক ভ্যালি, বান্দরবান, কক্সবাজার,  কুয়াকাটা, সিলেট, সেন্টমার্টিন, সুন্দরবন  প্রভৃতি স্থানে পর্যটকদের সারা বছর আনাগোনা লেগে থাকে। নিকলীর হাওর বর্তমানে সবার মনোমুগ্ধকর ভ্রমণ স্থান হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু করোনাভাইরাসের কারণে পর্যটকদের আনাগোনা নেই। আর্থিক অসচ্ছলতা দেখা দিয়েছে সেখানকার মানুষের। কর্মহীনতায় ভুগছে। ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (টোয়াব) রিপোর্ট অনুযায়ী, বাংলাদেশে ক্ষতির পরিমাণ ৫ হাজার ৭০০ কোটি টাকা দেখানো হয়েছে। প্যাসিফিক এশিয়া ট্রাভেল অ্যাসোসিয়েশনের (পাটা) বাংলাদেশ চ্যাপ্টার অনুযায়ী জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ৯,৭০৫ কোটি টার্নওভার থাকবে।

করোনাভাইরাস মোকাবিলায় যেখানে হিমশিম খাচ্ছে দেশ। তখন হানা দেয় আম্পানের মতো ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়। আম্পানেও যেন ক্ষতির পরিমাণ ভ্রমণ ও পর্যটন শিল্প খাতে অধিক। বন্যার ফলে দেখা দিয়েছে নতুন সমস্যা। ক্ষতির পরিমাণ যেন থামছে না। সাম্প্রতিক পর্যটন স্থানগুলো খুলে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কতটুকু প্রস্তুত আমরা?

দেশের অর্থনীতি সচল রাখতে পর্যটন শিল্পের বিকল্প নেই। ক্ষুদ্র থেকে বৃহত্তর সেক্টর যেন সক্রিয় হয়ে উঠবে। মানুষের আয়-রোজগারের ব্যবস্থার সৃষ্টি হবে। করোনাভাইরাস মহামারির কারণে দেশে পর্যটন খাতে ক্ষতি হয়েছে ৫ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। এ ছাড়া বেকার হয়ে পড়েছে এ খাতের সঙ্গে সম্পৃক্ত ৪০ লাখ মানুষ। তাদের ওপর নির্ভরশীল কমপক্ষে দেড় কোটি মানুষ কঠিন সময় পার করেছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ছোট-বড় সব ধরনের ব্যবসায়ী। নভেম্বর থেকে শুরু হবে প্রধান পর্যটন মৌসুম। সবাই নতুন মৌসুমের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এজন্য প্রয়োজন অভ্যন্তরীণ পর্যটন খাতে সরকারের সহযোগিতা। বিদেশি পর্যটকদের আকৃষ্টের জন্য নিশ্চিত করতে হবে তাদের নিরাপত্তা। পর্যটন এলাকায় অনেক সময় ছিনতাই,  চুরি-ডাকাতি এমন কি খুনের ঘটনাও ঘটে থাকে; যা ভ্রমণপিপাসুদের স্মৃতির পাতায় এক অন্ধকারাচ্ছন্ন অধ্যায় হয়ে রয়। পাশাপাশি, বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনা করে পর্যটকদের ভিসা জটিলা দূর করতে হবে। বর্তমানে মানুষের আনাগোনা কম রয়েছে পর্যটন এলাকায়। পর্যটকদের শতভাগ সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলো যেন কর্মী হ্রাস না করে, কর্মস্থলে কাজের সময় কমিয়ে কর্মী ভাগ করে নিয়ে ক্ষতির পরিমাণ হ্রাস করতে হবে।

গ্রামীণ সংস্কৃতিতে আমাদের জোর দিতে হবে। সেখানকার ঐতিহ্য, সংস্কৃতি তুলে ধরতে হবে দেশবাসীর কাছে। এতে করে সেখানকার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ হবে। বেকারত্বের অভিশাপ থেকে মুক্তি মিলবে অনেকের।

সরকার কর্তৃক বা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের এগিয়ে আসতে হবে ক্ষতি পুষিয়ে আনতে। ছোট-বড় সব খাতেই স্বল্প মুনাফায় লোনের ব্যবস্থা করতে হবে। সাহসিকতার সঙ্গে এবং সতর্কতার সঙ্গে সব স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। মাস্ক পরিধান বাধ্যতামূলক করতে হবে। স্বাস্থ্যবিধি না মানা হলে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। সর্বোপরি, আর্থিক সচ্ছলতা ফিরিয়ে আনতে ভ্রমণ ও পর্যটনশিল্পে জোর দিতে হবে, লক্ষাধিক মানুষের কর্মসংস্থান ফিরিয়ে আনতে অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে।

খায়রুজ্জামান খান

শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..