মত-বিশ্লেষণ

অর্থনীতির স্বার্থে চীন ও ভারতের বন্ধুত্ব কেন জরুরি?প্যাট্রিক মেনডিস

২০১৭ সালে চীন ও ভুটান সীমান্তে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। ফলে ভারত ও চীনের সেনারা মুখোমুখি হয় ডোকলাহামা সীমান্তে। ৭০ দিন ধরে চলে তাদের সম্মুখ উত্তেজনা। সংকটটি চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মদির অনানুষ্ঠানিক সাক্ষাৎকে প্রাতিষ্ঠানিকীকরণে পরিণত করতে বাধ্য করে। কেননা এ রকম সম্মাননা অবস্থানের পুনরাবৃত্তি উভয়ের জন্যই এড়িয়ে যাওয়ার প্রয়োজন ছিল।

যাহোক, দুই পরমাণু শক্তিধর দেশ উহুনে এক ঘরোয়া বৈঠকে মিলিত হয়। এটি গত বছরের এপ্রিল মাসের কথা। এখানে শি বলেন, ‘আমাদের এই বৃহৎ দেশের মধ্যে গভীর সহযোগী সম্পর্ক পরিচালনা করার মধ্য দিয়ে একটি বিশ্বব্যাপী প্রভাববলয় সৃষ্টি হতে পারে।’ তিনি বৈঠকের ব্যাপারে আশা ব্যক্ত করে আরও বলেন, ‘চীন-ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রে উশার একটি নতুন অধ্যায়।’ তবুও ভারতীয় ও চীনা সৈন্যরা এখন আবারও পূর্ব লাদাখ সীমান্তে মুখোমুখি অবস্থান নিয়েছে এ বছরের সেপ্টেম্বরের ১১ তারিখে। ফলে এ অঞ্চলের অবিশ্বাস ও সন্দেহের পারদ আরও নিচে নেমে এলো।

পরিস্থিতির পেছন দিকে লাগাম দিতে ভারতীয় ও চীনা সেনা কর্মকর্তারা ১ অক্টোবর বুমলা সীমান্তে মিলিত হন। দিনটি ছিল চীনের জাতীয় দিবস উদ্যাপনের। অর্থাৎ চীনই এই বৈঠকের আতিথেয়তা গ্রহণ করেছিল। অবাক হওয়ার কিছু নেই যে চীন-ভারত সম্পর্ক ‘ফ্রেনিমিস’-এর মতো, অর্থাৎ মৌলিকভাবে তারা শত্রু হলেও বাহ্যিকভাবে বন্ধু। এই সাপে-নেউলে সম্পর্কটিই দেশ দুটির মধ্যকার যেকোনো সম্পর্ককে ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে।

এসব সাময়িক সম্মুখ বৈঠকের পরও বেইজিং ও নয়াদিল্লি স্বীকার করেছে, তাদের উভয় দেশেরই অভ্যন্তরীণ কিছু বাস্তব ও অত্যবশ্যকীয় ইস্যু রয়েছে। আর তা অবশ্যই অর্থনীতি ও অর্থনৈতিক উন্নয়নবিষয়ক। তারা উভয়েই নিজ নিজ স্বার্থে সজাগ। এভাবেই তারা একটি সম্পর্কের পাটাতনে ফিরতে চায়।

১১ ও ১২ অক্টোবর তাদের মধ্যে আবারও বৈঠক হয়। এই দ্বিতীয় ঘরোয়া বৈঠকটি ছিল মামাল্লাপুরামে। শি উহুন সম্মেলনের বলয় থেকে বেরিয়ে মদিকে বলে চীন ও ভারত উভয় দেশই বিশ্ব অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য দুটি গুরুত্বপূর্ণ ইঞ্জিন। তাই দেশ দুটির মধ্যে শক্তিশালী প্রতিবেশী ও বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। শি আরও বলেন, “দুটি দেশের ‘উন্নয়ন কৌশল’ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এগিয়ে নিতে হবে, যাতে একটি ‘প্রস্তুতকারী অংশীদারিত্ব’ প্রতিষ্ঠা করছেন।”

এই আলোচনায় বাণিজ্যই ছিল কেন্দ্রীয় বিষয়। ভারতের রয়েছে চীনের সঙ্গে ৫৩ দশমিক ছয় বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বাণিজ্য ঘাটতি। এটা দেশটির সমগ্র বাণিজ্যের তিন ভাগের এক ভাগ। ভারত এখন চীনের বিশাল বাজারে প্রবেশ করতে চায়। বিশেষত এটা চীনের জেনেরিক ফার্মাসিউটিক্যালস ও আইটি সেবা খাতের বাজার। একই সঙ্গে তারা চীনের শুল্কহীন বাধাকে প্রশমিত করতে চায়।

এই ঘাটতিটি গত বছরে ১০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে নেমে এসেছে। তবুও চীনের রফতানি হয়তো পথ পরিবর্তন করে হংকং বা ভিয়েতনামের দিকে যেতে পারে। চীন থেকে রফতানি কমে যাওয়ার মানে হলো একই পণ্যের রফতানি হংকং ও ভিয়েতনাম থেকে বেড়ে যাওয়া। আবার চীন চায় ভারত তাদের আঞ্চলিক বিস্তীর্ণ অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বে (আরসিইপি) যোগ দিক। তাছাড়া এটা এমন এক চুক্তি যেটা ভারতের পক্ষে এড়িয়ে যাওয়াও বেশ কঠিন ব্যাপার, কেননা তা মুক্তবাণিজ্যের জন্য এশিয়ার সবচেয়ে বড় ও গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি। কিন্তু ভারত আসিয়ান ও অন্যান্য আরসিইপি রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে লাগাতার মুক্তবাণিজ্য হারানোর পথে এগিয়ে চলেছে। তবে চীনের সঙ্গে ভারতের হালচাল এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে হাতি এখন ভারতের ঘরের মধ্যে। তারা এখন ভয় পাচ্ছে, আমদানি তাদের দেশের মধ্যে যেভাবে হামলে পড়বে, তাতে পরিস্থিতি আরও বেশি খারাপ হবে।

উপরন্তু এই অধিকতর বড় ভূরাজনৈতিক জটিলতার মধ্যে বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক ইস্যুগুলো পৃথক করাও অসম্ভব ব্যাপার। এরই ভেতর দিয়ে ভারত গত আগস্টে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ জম্মু ও কাশ্মীরের আংশিক স্বশাসন রদ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে তারা মূলত পাকিস্তানকে উত্ত্যক্ত করা শুরু করেছে। এমনকি এখানে তারা সমগ্র কাশ্মীরের অধিকার দাবি করে বসল। এই প্রভাবটা শেষ অবধি সম্ভবত চীন-পাকিস্তানের আঞ্চলিক ইকোনমিক করিডর নির্মাণের ওপর পড়তে যাচ্ছে।

চীনের বেল্ট ও রোড উদ্যোগের মধ্যে প্রকল্পটি চীনের পশ্চিম অঞ্চলের জিনজিয়ান থেকে পাকিস্তানের গাদার বন্দর পর্যন্ত সংযুক্ত করবে।

চিরাচরিত নিয়ম অনুযায়ী চীন কাশ্মীর দ্বন্দ্বে পাকিস্তানকেই সাহায্য করে। আবার ভারত সিনো-ইন্ডিয়ান সীমান্তের স্থিতিশীলতা নষ্ট করবে কি না, সে ব্যাপারে চীন খুব সতর্ক অবস্থান নিয়েছিল। এই সতর্কতার কারণেই চীন ঘোষণা দিয়েছিল কাশ্মীর সংকটটি ভারত-পাকিস্তানের দ্বিপক্ষীয় বিষয়। তবে এখন পর্যন্ত চীনের অর্থনৈতিক করিডর প্রকল্পটি কিছুটা ধিমে তালে চলছে। এর পেছনের কারণ দুটির একটি হলো ভারতের এই কাশ্মীর অভিযান এবং পাকিস্তানের ঋণ ইস্যু।

আসলে চীনকে যদি ভারতের সঙ্গে এই সম্পর্ক গড়ে তুলতেই হয়, তবে যথেষ্ট সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। এমনকি কেবল ভারতই নয়, শ্রীলঙ্কার সঙ্গেও তাদের সতর্কতার সঙ্গে চুক্তি করতে হবে। উল্লেখ্য, এরই মধ্যে আফ্রিকার ৩৭টি দেশ ও আফ্রিকান ইউনিয়ন চীনের বেল্ট ও রোড প্রকল্পে চুক্তি সই করেছে। তাই চীন এখন মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। ফলে চীনের জন্য এখন বঙ্গোপসাগরে ও ভারত সাগরে একটি উম্মুক্ত ও নিরাপদ সমুদ্রপথ অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। এদিকে নয়াদিল্লি যুক্তরাষ্ট্র-চীন উত্তেজনায় সুযোগ নিতে পারে। ভারত এই সুযোগে চীনের প্রস্তুতকারীদের পটানোর চেষ্টা করবে, যাতে তারা তাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান চীন থেকে ভারত সরিয়ে নেয়। এক্ষেত্রে ফার্মাসিউটিক্যালস, কেমিক্যালস ও ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মতো প্রধান প্রধান খাতের দিকেই ভারত নজর দেবে।

ইন্ডিয়া ব্র্যান্ড ইক্যুইটি ফাউন্ডেশনের তথ্যানুসারে, ভারতের ওষুধশিল্প খাত এরই মধ্যে বিভিন্ন ধরনের টিকায় বিশ্বচাহিদার অর্ধেকাংশ, যুক্তরাষ্ট্রের জেনেরিক চাহিদার ৪০ শতাংশ এবং ব্রিটেনের সব ধরনের ওষুধের চাহিদার ২৫ শতাংশ সরবরাহ করছে।

ফক্সকন হলো পৃথিবীর সবচেয়ে বড় চুক্তিভিত্তিক ইলেকট্রনিক্স প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান। তারা অ্যাপল পণ্যও প্রস্তুত করে থাকে। প্রতিষ্ঠানটি এরই মধ্যে কিছু কারখানা ভারতে স্থানান্তর করেছে। তারা মূলত প্রস্তুতকৃত পণ্যের সরবরাহ বলয়ে বৈচিত্র্য আনার জন্যেই স্থানান্তর করেছে। তারা চীনের উৎপাদনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমাতে চেয়েছে। এই তথ্যটি আইএইচএস মার্কিটের এশিয়া-প্যাসিফিক চিফ ইকোনমিস্ট রাজিভ বিশ্বাসের বক্তব্য থেকে নেওয়া হয়েছে। তিনি আরও বলেন, ভারতের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো তাদের ভূমি আইন, শ্রমবিধি এবং উপযুক্ত সড়ক ও বন্দর ব্যবস্থাপনা। একই সঙ্গে ভারতকে জ্বালানি প্রাপ্যের নিশ্চয়তা সৃষ্টি করতে হবে। 

ফাইভ-জি আসার পরই ভারত চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মাঝে একটি চিরেচ্যাপ্টা অবসস্থায় পড়ে গেছে। চীন ভারতকে সাফ জানিয়ে দিয়েছে, ভারতের ফাইভ-জি মোবাইল অবকাঠামো ব্যবসায় নিলামে অংশ নিতে তারা যদি হুয়াওয়েকে বাধা দেয়, তবে তারাও ভারতের যেসব কোম্পানি চীনে ব্যবসা করে সেসব কোম্পানিকে নিষেধাজ্ঞা দেবে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে কড়া ভাষায় শাসিয়েছে, যদি ভারত হুয়াওয়ের ফাইভ-জি প্রযুক্তি গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নেয়, তবে ইন্টেলিজেন্স ভাগাভাগির ক্ষেত্রে ভারত কঠিন পরিস্থিতির শিকার হতে পারে। কিন্তু ইন্টেলিজেন্স ভাগাভাগির ইনট্যানজিবলসের বিরুদ্ধে এ বছর ১০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে দৃশ্যত ভারত হয়তো চূড়ান্ত পর্যায়ে তিতা বড়ি খেতে বাধ্য হবে এবং ঘুরেফিরে হুয়াওয়ের কাছেই যাবে।

খণ্ডকালীন অধ্যাপক, গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স, ন্যাশনাল চেংচি ইউনিভার্সিটি, তাইওয়ান; সিনিয়র ফেলো, তাইওয়ান সেন্টার ফর সিকিউরিটি স্টাডিজ, তাইপে

সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট থেকে

ভাষান্তর: মিজানুর রহমান শেলী

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন
ট্যাগ »

সর্বশেষ..